পিকলবল খেলে ১৩ বছরের কিশোরীর বিশ্বভ্রমণ
ভিয়েতনামে পৌঁছানোর পর এলসি হেন্ডারশট ভেবেছিল কঠিন কাজটা বুঝি এবার শেষ হলো। সে আর তার বাবা ইউটা থেকে গাড়ি চালিয়ে প্রথমে লাস ভেগাসে যান। সেখান থেকে বিমানে সান ফ্রান্সিসকো পৌঁছান। কিন্তু মাঝের পরের ফ্লাইটটি মিস করায় তাদের সেখানে এক রাত থাকতে হয়। এরপর প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ি দিয়ে দীর্ঘ ১১ ঘণ্টার বিমানে তাঁরা জাপানে পৌঁছান। সেখান থেকে আবার পাঁচ ঘণ্টার বিমানযাত্রায় শেষে তাঁরা ভিয়েতনামের রাজধানী হ্যানয়ে আসেন।
১৩ বছরের এলসি খেলার জন্য এত দূরের ভ্রমণ আগেও করেছে। কিন্তু এবার তাকে যেতে হয়েছে ভ্রমণ ভিসার কঠিন সব নিয়মকানুনের মধ্য দিয়ে। ভিয়েতনামের নোই বাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামার পর তার বাবা কেড ভিসার আবেদন করেন। মেয়ে যখন পিকলবল খেলার জন্য সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়ায়, তখন বাবাকে একসঙ্গে ম্যানেজার, এজেন্ট, ট্রাভেল প্ল্যানার ও অভিভাবকের দায়িত্ব সামলাতে হয়। তাই কেড আগে থেকেই এ বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে রেখেছিলেন।
কিন্তু তাঁর সেই প্রস্তুতি হয়ে গেল এলোমেলো। ভিয়েতনামে পর্যটকেরা তখন আর ওই নিয়মে ভিসা পাচ্ছিলেন না। ফলে তাঁদের আবার জাপানে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হলো। মনে হচ্ছিল, টুর্নামেন্টে খেলতে এলসি পৃথিবীর অর্ধেক পথ পার করে এসেছেন। শেষ পর্যন্ত সেটাই হয়তো খেলতে পারবেন না।
ইউটার ম্যাপলটন শহরের বাড়িতে এলসির মা মেগান বসে ছিলেন। পরিবারের খেলার সুবিধার্থে সেখানে তাঁরা দুটি পিকলবল কোর্ট তৈরি করেছিলেন। সেখান থেকে মা মেগানকে ভীষণ অসহায় মনে হচ্ছিল। তিনি ভাবছিলেন, মাঝেমধ্যে সবকিছু এত কঠিন হয়ে যায় কেন?
চাইলে এলসি এই ঝামেলা ছেড়ে সুন্দরভাবে ম্যাপলটনের বাড়িতে ফিরে আসতে পারত। ৭ থেকে ১৭ বছর বয়সী তার চার ভাই–বোনের সঙ্গে ছুটি কাটাতে পারত। কিন্তু যার ভেতরের প্রতিভা এত অসাধারণ, তাকে কি আর চারদেয়ালের মধ্যে আটকে রাখা যায়?
পিকলবল খেলার নতুন প্রজন্মের অন্যতম বড় মুখ এলসি। ছোট হলেও আন্তর্জাতিক সার্কিটে তার ভক্ত–অনুরাগীর সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। পেশাদার পিকলবল–দুনিয়ায় সে এখন বেশ চেনা নাম। সে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে, পিকলবল খেলাই তার আসল কাজ, এটাই তার আসল পরিচয়।
তাই এখন এলসি জাপানে। ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে এক মহাদেশ থেকে অন্য মহাদেশ ঘুরে আসা এই দুঃস্বপ্নের গল্প জানায়।
সেদিন ইনস্টাগ্রামে দেওয়া একটি ভিডিওতে এলসি এভাবেই কথা শুরু করেছিল। সে তার সব ভিডিওই এই হাসিখুশি ও প্রাণবন্ত কথা দিয়ে শুরু করে। যদিও টানা ভ্রমণের ক্লান্তি আর ঘুমের অভাবে তার সাধারণ প্রাণচাঞ্চল্য কিছুটা কম ছিল। সে জানায়, ভিসা আসলে কী জিনিস, সে সম্পর্কে আমার কোনো ধারণাই নেই। তবে এটুকু বুঝি যে ওটা আমাদের খুব জরুরিভাবে দরকার ছিল।
১০ বছর বয়সে পিকলবল খেলা শুরু করার পরই বিশ্বসেরা অ্যানা লি ওয়াটার্সের সাক্ষাৎকার দেখে এলসির বাবা কেডের মনে হয়েছিল, এই খেলাই হবে মেয়ের ভবিষ্যৎ। বড় ভাইদের সঙ্গে টেক্কা দেওয়া ও টুর্নামেন্টে বয়সে বড়দের হারিয়ে প্রতিভার প্রমাণ দেয় এলসি। মাত্র ১২ বছর বয়সে সে পেশাদার খেলোয়াড় হওয়ার প্রস্তাব পায়।
১২ বছর বয়সে ১৬-অনূর্ধ্ব জুনিয়র টুর্নামেন্ট জেতে এলসি। সে নিয়মিত ভোরবেলা উঠে নিজের নাশতা বানিয়ে খেলা শুরু করে। ২০১৯ সালে ওয়াটার্স যখন ১২ বছর বয়সে খেলা শুরু করেন, তখন খেলাটি অগোছালো ছিল এবং প্রতিপক্ষ ছিলেন শখের খেলোয়াড়েরা। তবে সম্প্রতি মে মাসে অ্যাপোলো স্পোর্টস ক্যাপিটাল ২২৫ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করায় পিকলবল এখন এক বিশাল পেশাদার খেলা। যেখানে ছোটবেলা থেকে খেলা প্রতিভাদের প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।
বাঁহাতি খেলোয়াড় এলসি। উচ্চতা দেড় বছরে ৬ ইঞ্চি বেড়ে ৫ ফুট ৮ ইঞ্চি হওয়ায় সে শরীরের সঙ্গে খেলার কৌশল মানিয়ে নিয়েছে। জেন আলফা প্রজন্মের কেলি গুডনো ও সাবেক স্কেটবোর্ডার তাম সুমাবুকুরোর মতো কিশোরেরাও এখন লাখ ডলারের স্পনসরশিপ নিয়ে পেশাদার সার্কিটে উঠে আসছে।
পিকলবল খেলোয়াড়দের মূল আয় আসে স্পনসরদের কাছ থেকে। এলসি ‘প্যাডলটেক’ নামের ব্র্যান্ডের সঙ্গে বহু বছরের চুক্তি করেছে। যারা তার যাতায়াত ও ভ্রমণের সব খরচ বহন করবে।
পিকলবলে পারিশ্রমিকের ২০ শতাংশ অর্থ এবং ৮০ শতাংশ আসে পুরস্কার ও ফি থেকে। শীর্ষ ২০ জন খেলোয়াড় ভালো আয় করেন এবং অ্যানা লি ওয়াটার্সের মতো ১ নম্বর তারকা স্পনসরশিপ থেকে কোটি কোটি টাকা আয় করেন। র্যাঙ্কিংয়ের ২ নম্বর খেলোয়াড় ২৬ বছর বয়সী অ্যানা ব্রাইট বিশ্বাস করেন, এলসি ভবিষ্যতে তাঁর চেয়েও ভালো খেলোয়াড় হয়ে উঠবে।
ভিয়েতনামের ভিসা বিপর্যয়ে বিমানবন্দর থেকে ফেরত আসতে হলেও এলসির বাবা কেডের বুদ্ধিতে জরুরি ভিসার ব্যবস্থা হয়। জাপানে এক রাত কাটিয়ে বিমানে পাঁচ ঘণ্টা ঘুমিয়েই হ্যানয়ে পৌঁছে সরাসরি টুর্নামেন্টের কোর্টে নেমে পড়ে ১২ বছরের এলসি।
এলসির ঘন ঘন ভ্রমণের চাপ সামলানোই পরিবারটির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। হেন্ডারশট দম্পতি নিজেদের ঘরকুনো ভাবলেও তাঁদের ক্যালেন্ডারে ২০২৬ সালের বারো মাসের সফরের লম্বা তালিকা রয়েছে। এতে ফ্লোরিডা, অ্যারিজোনা, নিউইয়র্ক, শিকাগো থেকে শুরু করে চীনের শেনজেন শহরও রয়েছে। কিছু জায়গায় বছরে দুবারও যেতে হয়।
বাবা কেডের মার্কেটিং ব্যবসাকে এআই এজেন্সিতে রূপান্তর করার পর পরিবারকে বেশি সময় দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এখন পরিবার দুই ভাগে বিভক্ত। কেড ও এলসি থাকেন ভ্রমণে। আর মা মেগান চার সন্তানকে নিয়ে থাকেন বাড়িতে। খেলাধুলার ফাঁকে পড়াশোনা চালাতে এলসি এখন একটি অনলাইন চার্টার স্কুলে পড়ে।
বাড়ির ১৫ বছর বয়সী বড় ভাইয়ের আগে এলসিকে একটি আইফোন দেওয়া হয়। মা–বাবা এটিকে পিকলবল ফোন বলেন। এর উদ্দেশ্য ভ্রমণে থাকা এলসির সঙ্গে মায়ের ভিডিও কল ও খবরাখবর নেওয়া।
এলসির সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট তার বাবা চালান। এলসি নিজে ভিডিও ধারণ ও ক্যাপশন লিখলেও তাকে কোনো ইন্টারনেটে ব্রাউজ করার সুযোগ দেওয়া হয় না। সে কেবল ১৫ মিনিট সময়ে পোস্ট বা কমেন্টের উত্তর দিতে পারে। খেলায় নিজের প্রভাব ধরে রাখতে সে এটি করে।
অন্যতম শীর্ষ খেলোয়াড় অ্যানা ব্রাইট মনে করেন, শুধু খেলা নয়, কনটেন্ট তৈরির মাধ্যমে পিকলবলকে নতুন প্রজন্মের কাছে পরিচিত করা দরকার। এলসির ফলোয়ার ১০ হাজারের কাছাকাছি। যা দিন দিন বাড়ছে।
সতীর্থদের সঙ্গে এলসির সম্পর্ক বেশ মজার। অনুশীলনে সতীর্থদের বাজে কথা বা গালি দেওয়ার জন্য সে শাস্তির ব্যবস্থা রাখে। কাউকে দিয়ে বাড়তি অনুশীলন করায়। আবার কারও কাছ থেকে দুই ডলার করে জরিমানা নেয়।
নতুন দল ‘শিকাগো স্লাইস’-এ যোগ দিয়ে চাপের মুখেও দুর্দান্ত খেলেছে সে। আড়াই হাজার দর্শকের সামনে ড্রিমব্রেকার রাউন্ডে টানা পয়েন্ট জিতে দলকে জয় এনে দেয় ১৩ বছরের এই কিশোরী।