জিলাপির মোড়কে খাঁটি সোনা, মহামূল্যবান এই ধাতুটি কেন এত নরম ও নমনীয়

ফাইল ছবি

তোমার সামনে প্লেটে রাখা আছে গরম ও রসালো একটুকরো জিলাপি। কিন্তু জিলাপিটির গায়ের রং সাধারণ নয়, এটি মোড়ানো আছে রীতিমতো খাঁটি সোনার একটি চকচকে পাতলা আবরণ দিয়ে! হ্যাঁ, অবাক হলেও সত্যি যে বিশ্বের অনেক বিলাসবহুল রেস্তোরাঁয় মিষ্টি বা খাবারের ওপর খাওয়ার যোগ্য গোল্ডলিফ ব্যবহার করা হয়।

কিন্তু সোনা তো একটা ধাতু! লোহা বা তামার মতো একটি ধাতুকে কীভাবে পিটিয়ে কাগজের চেয়েও পাতলা মোড়ক বানিয়ে জিলাপির গায়ে জড়িয়ে দেওয়া সম্ভব? সোনার এই অবিশ্বাস্য নমনীয়তার পেছনের বিজ্ঞানটা আসলে কী?

সোনা কেন এত নরম, তা জানার আগে একটি ছোট্ট ভুল ভাঙিয়ে নেওয়া দরকার। বিজ্ঞানের ভাষায় নরম এবং নমনীয় হওয়ার মধ্যে বিশাল পার্থক্য আছে। ইংল্যান্ডের দ্য ওপেন ইউনিভার্সিটির রসায়নবিদ মাইক বুলিভ্যান্টের মতে, ‘সোনা হলো পৃথিবীর সবচেয়ে নমনীয় বা ঘাতসহ মৌল।’ নমনীয়তা হলো কোনো বস্তুকে না ভেঙে পিটিয়ে কতটা পাতলা আকার দেওয়া যায়, তার পরিমাপ। অন্য ধাতুগুলোকে বেশি পেটালে একসময় ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। কিন্তু মাত্র ২৮ গ্রাম সোনাকে পিটিয়ে অনায়াসে ১৬.৪ ফুট লম্বা ও চওড়া একটি বিশাল পাত তৈরি করা সম্ভব!

ভার্জিনিয়ার জেফারসন ল্যাবের তথ্যমতে, সোনার পাত বা গোল্ডলিফকে পিটিয়ে এতই পাতলা করা যায় যে, এর পুরুত্ব হতে পারে ১ ইঞ্চির ৫ মিলিয়ন ভাগের ১ ভাগ, মানে ০.০০০১২৭ মিলিমিটার। অর্থাৎ, এটি মানুষের একটি সাধারণ চুলের চেয়েও প্রায় ৪০০ গুণ বেশি পাতলা হতে পারে!

আরও পড়ুন

অন্যদিকে, কাঠিন্য মাপার মোহস স্কেল অনুযায়ী, সবচেয়ে নরম ধাতু হলো সিজিয়াম। এটি তুমি চাইলে মাখন কাটার ছুরি দিয়েই অনায়াসে কেটে ফেলতে পারবে! আর আমেরিকান কেমিক্যাল সোসাইটির রসায়নবিদ মার্ক জোন্সের মতে, ‘কক্ষ তাপমাত্রায় তরল থাকা পারদ হলো সবচেয়ে নরম ধাতু।’ অর্থাৎ, সোনা সবচেয়ে নরম নয়, কিন্তু এটি সবচেয়ে বেশি নমনীয়।

ধাতুগুলো সাধারণত একটি বিশাল ক্রিস্টাল হিসেবে থাকে না, বরং এরা অসংখ্য ছোট ছোট ক্রিস্টালের টুকরো দিয়ে তৈরি হয়। একে বলে গ্রেইন।

সোনার এই জাদুকরি নমনীয়তার রহস্য লুকিয়ে আছে এর পরমাণুর গঠন এবং এদের মধ্যকার বন্ধনের ভেতরে। ইসরায়েলের বার-ইলান ইনস্টিটিউট অব ন্যানোটেকনোলজির পরিচালক ড্রর ফিক্সলার জানান, ‘সোনার পরমাণুগুলো একটি বিশেষ জ্যামিতিক কাঠামোতে সাজানো থাকে। একে বলা হয় ফেস-সেন্টারড কিউবিক ক্রিস্টাল স্ট্রাকচার।’

এই অদ্ভুত সুন্দর কাঠামোতে প্রতিটি পরমাণু তার চারপাশে ঠিক ১২টি প্রতিবেশী পরমাণু দিয়ে ঘেরা থাকে। পরমাণুগুলোর এই নিখুঁত সজ্জার কারণেই সোনার পুরো কাঠামোটি না ভেঙেই খুব সহজে এর আকার পরিবর্তন করা যায়।

এর পাশাপাশি, সোনা যেহেতু একটি ধাতু, তাই এর পরমাণুগুলো ধাতব বন্ধন দিয়ে যুক্ত থাকে। ফলে প্রতিটি পরমাণুর বাইরের কক্ষপথের ইলেকট্রনগুলো নির্দিষ্ট কোনো জায়গায় আটকে না থেকে পুরো ধাতুর ভেতর স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়াতে পারে। ইলেকট্রনের এই ভাসমান মেঘের কারণে সোনার পরমাণুগুলো খুব সহজেই একে অপরের ওপর দিয়ে পিছলে যেতে পারে। এ কারণেই সোনাকে এত সহজে বাঁকানো বা পিটিয়ে চ্যাপটা করা যায়।

আরও পড়ুন

কিন্তু শুধু পরমাণুর গঠন দিয়েই কি সব ব্যাখ্যা করা যায়? তামা ও রুপার পরমাণুর গঠনও কিন্তু একেবারে সোনার মতোই! তাদের বন্ধনও এক। তাহলে তামা বা রুপাকে পেটালে সোনার মতো এত পাতলা করা যায় না কেন? তার মানে, পর্দার আড়ালে নিশ্চয়ই অন্য কোনো রহস্য লুকিয়ে আছে!

সোনা হলো এমন এক অভিজাত ধাতু, যা সচরাচর অন্য কোনো মৌলের সঙ্গে রাসায়নিক বিক্রিয়া করে না। মানে সোনার গ্রেইনগুলোর ওপর কখনো কোনো অক্সাইডের স্তর পড়ে না!

রহস্যটা হলো সোনার আভিজাত্য। ধাতুগুলো সাধারণত একটি বিশাল ক্রিস্টাল হিসেবে থাকে না, বরং এরা অসংখ্য ছোট ছোট ক্রিস্টালের টুকরো দিয়ে তৈরি হয়। একে বলে গ্রেইন। তামা বা রুপা যখন বাতাসের অক্সিজেনের সংস্পর্শে আসে, তখন তাদের এই গ্রেইনগুলোর ওপরে অক্সাইডের একটি স্তর পড়ে যায়। একে আমরা মরিচা পড়া বা কালচে হয়ে যাওয়া বলি। তামা বা রুপাকে যখন হাতুড়ি দিয়ে পেটানো হয়, তখন এই অক্সাইডের স্তরগুলোর কারণেই তাদের গ্রেইনগুলো ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়।

কিন্তু সোনা হলো এমন এক অভিজাত ধাতু, যা সচরাচর অন্য কোনো মৌলের সঙ্গে রাসায়নিক বিক্রিয়া করে না। মানে সোনার গ্রেইনগুলোর ওপর কখনো কোনো অক্সাইডের স্তর পড়ে না! আর এই অক্সাইড না থাকার কারণেই সোনাকে পেটালে এর ভেতরের গ্রেইনগুলো টুকরো হয়ে না গিয়ে একে অপরের সঙ্গে মিলেমিশে আরও পাতলা হতে থাকে।

ঠিক এ কারণেই খাঁটি সোনাকে পিটিয়ে এমন কাগজের মতো পাতলা মোড়ক বানানো যায়, যা দিয়ে তুমি চাইলে জিলাপি বা বিরিয়ানিকেও রাজকীয় রূপ দিতে পারবে!

সূত্র: লাইভ সায়েন্স

আরও পড়ুন