পচনশীল পরিবেশবান্ধব নতুন বেলুন ‘বায়োলুন’

বায়োলুন তৈরি করতে গিয়ে তাঁদের শত শত পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতে হয়

লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজের গবেষকেরা বিশ্বের প্রথম সম্পূর্ণ জৈব বিয়োজনযোগ্য পার্টি বেলুন তৈরি করার কথা জানিয়েছেন। এই গবেষকেরা জানান, আমরা জন্মদিন কিংবা বিশেষ অনুষ্ঠানে যেসব সাধারণ বেলুন ব্যবহার করি, তা মাটিতে পচতে বছরের পর বছর সময় লেগে যায়। এটা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর রাসায়নিক ছড়ায়। তবে বিজ্ঞানীদের নতুন আবিষ্কৃত এই বেলুন পরিবেশের কোনো ক্ষতি না করেই মাত্র ৯ মাসের মধ্যে মাটির সঙ্গে পুরোপুরি মিশে যাবে।

যুক্তরাজ্যের এক পিএইচডি শিক্ষার্থী বন্য প্রাণীদের একটি বড় সমস্যার সমাধান বের করেন। সাধারণ বেলুন উৎসবের পর আবর্জনা হয়ে নদী, সমুদ্র বা সৈকতে গিয়ে পড়ে। এই ফেলে দেওয়া বেলুন সামুদ্রিক প্রাণী ও পাখিদের জন্য মারাত্মক বিপজ্জনক ও প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে।

অস্ট্রেলিয়ার তাসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৯ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, সামুদ্রিক পাখিদের জন্য বেলুন হলো সবচেয়ে বিপজ্জনক প্লাস্টিক বর্জ্য। শক্ত প্লাস্টিকের টুকরা খাওয়ার চেয়ে বেলুন গিলে ফেলা পাখিদের জন্য ৩২ গুণ বেশি প্রাণঘাতী হতে পারে। এই সমস্যার সমাধান করতেই উদ্ভাবন করা হয়েছে ‘বায়োলুন’। নতুন এই বেলুন তৈরিতে এমন উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে, যা মাত্র ৯ মাসের মধ্যে প্রাকৃতিকভাবে মাটির সঙ্গে পচে মিশে যায়।

গবেষকেরা আশা করছেন, ২০২৮ সালের মধ্যেই বায়োলুন বাজারে বিক্রি শুরু করা সম্ভব হবে। সবচেয়ে সুবিধার বিষয় হলো, পরিবেশের ক্ষতি না করলেও এই বেলুন সাধারণ বেলুনের মতোই খুব সহজে ফোলানো যায়।

আরও পড়ুন
গবেষকেরা আশা করছেন, ২০২৮ সালের মধ্যেই বায়োলুন বাজারে বিক্রি শুরু করা সম্ভব হবে
ছবি: বিবিসি

বায়োলুন শতভাগ পচনশীল বেলুন

ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের ২৯ বছর বয়সী পিএইচডি শিক্ষার্থী ও ‘বায়োলুন’-এর সহনির্মাতা জুলিয়ানা কামিং। তিনি জানান, ‘বায়োলুন তৈরি করতে গিয়ে তাঁদের শত শত পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতে হয়। অনেক ব্যর্থতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। গবেষণাগারে একটি ফ্লাস্কে রাখা বিশেষ হলুদ তরল জমাট বেঁধে সাধারণ বেলুনের মতোই নরম ও স্থিতিস্থাপক উপাদানে পরিণত হয়। সাধারণ বেলুন বহুকাল টিকে থাকলেও এই বেলুন মাত্র ৯ মাসের মধ্যেই মাটির সঙ্গে পুরোপুরি পচে মিশে যায়।’

ইভেন্ট উদ্যোক্তা শার্লট মেলিয়া এই পরিবেশবান্ধব বেলুন তৈরির উদ্যোগ নেন। তিনি দীর্ঘ ১০ বছর ধরে পার্টির কাজ করছেন এবং পরিবেশ সচেতন হওয়ার চেষ্টা করছেন। তিনি জানান, তারা প্রতি সপ্তাহে হাজার হাজার বেলুন সাজাতেন, যেগুলো মাত্র কয়েক ঘণ্টা পর ফাটিয়ে ময়লায় ফেলা হতো। বাজারের বেলুনের প্যাকেটে পচনশীল লেখা থাকলেও তিনি বুঝতে পারেন এগুলো আসলে সহজে পচে না।

এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান করতে শার্লট মেলিয়া ও তাঁর এক সহযোগী গবেষক জুলিয়ানা কামিং-এর পিএইচডি গবেষণায় প্রায় ৩০ হাজার পাউন্ড (প্রায় ৩৫ হাজার ইউরো) অর্থ সহায়তা দেন। এই সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতার ফলেই অবশেষে তৈরি সম্ভব হয় শতভাগ পচনশীল ‘বায়োলুন’।

আরও পড়ুন
শক্ত প্লাস্টিকের টুকরা খাওয়ার চেয়ে বেলুন গিলে ফেলা পাখিদের জন্য ৩২ গুণ বেশি প্রাণঘাতী হতে পারে
ছবি: বিবিসি

বেলুনের রাসায়নিক ক্ষতি ও বায়োলুনের আবিষ্কার

ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের রাসায়নিক প্রকৌশল বিভাগের হিসেবে, পৃথিবীতে প্রতিবছর প্রায় ২০ থেকে ২৫ বিলিয়ন বেলুন বিক্রি হয়। কিন্তু বেশির ভাগ মানুষই জানেন না যে সাধারণ বেলুন পরিবেশের কত ক্ষতি করে। বিজ্ঞাপনে পচনশীল বলা হলেও এগুলো সহজে মাটিতে মেশে না। বরং সামুদ্রিক প্রাণী ও পাখিদের জন্য বড় বিপদ ডেকে আনে।

বায়োলুনের সহনির্মাতা জুলিয়ানা কামিং তিন বছর ধরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে তাঁর বিশেষ ফর্মুলা তৈরি করেছেন। ১৮২৪ সালে বেলুন আবিষ্কারের পর থেকেই আমাজন অঞ্চলের রাবার গাছের রস দিয়ে বেলুন তৈরি হয়ে আসছে।

সাধারণ বেলুন তৈরির সময় তরল ল্যাটেক্সকে শক্ত রাবারে রূপান্তর করতে সালফার ও নানা ধরনের রাসায়নিক উপাদান মেশানো হয়। এই রাসায়নিক প্রক্রিয়াই বেলুনকে মাটিতে মিশতে বাধা দেয় এবং পরবর্তী সময়ে পরিবেশে বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ ছড়িয়ে দেয়।

সূত্র: ইউরো নিউজ ও বিবিসি
আরও পড়ুন