বিগ ব্যাং কেন হয়েছিল

বিগ ব্যাং হচ্ছে মহাপ্রসারণছবি: মিডজার্নির সাহায্যে তৈরি

আমাদের চারপাশের চেনা পৃথিবীতে সবকিছুই একটা নির্দিষ্ট নিয়মে চলে। এই নিয়মের নাম কজ অ্যান্ড ইফেক্ট। বাংলায় একে কার্যকারণ বলতে পারো। তুমি যদি সজোরে ফুটবলে লাথি মারো, তবেই ফুটবলটা দূরে গিয়ে পড়বে। তোমার হাত থেকে যদি কাচের গ্লাস ফসকে যায়, তবেই সেটা মাটিতে পড়ে ভেঙে টুকরা টুকরা হবে। এখানে লাথি মারা বা হাত থেকে পড়ে যাওয়াটা হলো কারণ, আর ফুটবল দূরে যাওয়া বা গ্লাস ভেঙে যাওয়াটা হলো তার ফলাফল। কোনো কারণ ছাড়া এমনি এমনি একটা ফুটবল কখনো উড়ে যেতে পারে না, টেবিলের ওপর রাখা গ্লাসও একা একা ভেঙে যায় না। এই সহজ নিয়মটা আমাদের মস্তিষ্কে এত গভীরভাবে গেঁথে আছে যে আমরা পৃথিবীর যেকোনো ঘটনা দেখলেই তার পেছনের কারণটা খুঁজতে শুরু করি। ঠিক মানুষের এই স্বভাব থেকেই মহাকাশবিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় ও চমকপ্রদ প্রশ্নটার জন্ম হয়—বিগ ব্যাং বা মহাবিস্ফোরণের কারণ কী ছিল? কী কারণে পুরো মহাবিশ্বের সৃষ্টি হলো?

সাধারণত আমরা যখন কোনো বিস্ফোরণের কথা শুনি, তখন চোখের সামনে ভেসে ওঠে কোনো বোমা হামলার দৃশ্য। কিন্তু বিগ ব্যাং মোটেও এমন কোনো সাধারণ বিস্ফোরণ ছিল না। বিজ্ঞানীদের মতে, বিগ ব্যাং হলো ঠিক সেই নির্দিষ্ট জাদুকরি মুহূর্ত, যখন এই মহাবিশ্বের স্থান এবং সময়ের জন্ম হয়েছিল। বিজ্ঞানীরা এই দুটিকে একসঙ্গে বলেন স্পেস-টাইম। অর্থাৎ বিগ ব্যাংয়ের আগে মহাবিশ্বে কোনো বিশাল ফাঁকা জায়গা বলে কিছু ছিল না। এমনকি তখন সময় বলেও কিছুর অস্তিত্ব ছিল না!

আরও পড়ুন

আর ঠিক এই জায়গাতেই বিজ্ঞানীদের উত্তরটা শুনলে আমাদের মাথা ঘুরে যায়। বিজ্ঞানীরা বলেন, বিগ ব্যাং কেন হলো বা এর কারণ কী; এই প্রশ্নটার কোনো বৈজ্ঞানিক অর্থ নেই! প্রশ্নটা একেবারেই অর্থহীন। কারণটা একটু গভীরভাবে চিন্তা করলেই বুঝতে পারবে। কোনো একটা ‘কারণ’ ঘটার জন্য তো আগে একটা জায়গা এবং একটু সময় দরকার, তাই না? একটা কারণ ঘটবে, ঠিক এরপর তার ফলাফল হিসেবে মহাবিস্ফোরণ হবে। কিন্তু বিগ ব্যাংয়ের আগে তো সময় ও স্থান বলতে সত্যিই কিছু ছিল না! যেখানে কোনো মহাবিশ্বই ছিল না, কোনো সময় ছিল না, সেখানে এই ‘কারণ’ নামক জিনিসটা থাকবে কোথায়? আর সময় না থাকলে সে ঘটবেই বা কখন? তাই বিগ ব্যাংয়ের পেছনে কোনো কারণ থাকাটা আক্ষরিক অর্থেই অসম্ভব।

বিগ ব্যাং থেকে মহাবিশ্বের বিস্তৃতি

কথাটা শুনে তোমার মনে হতে পারে, এটা বিজ্ঞানীদের একটা চালাকি! উত্তর জানা নেই বলে তাঁরা এমন একটা গোলমেলে যুক্তি দিয়ে পার পেয়ে যেতে চাইছেন। কিন্তু সত্যিটা হলো, এটা কোনো চালাকি নয়। বিগ ব্যাংয়ের যে আসলেই কোনো কারণ ছিল না, এর পেছনে আধুনিক বিজ্ঞানের আরও বেশ কিছু শক্ত যুক্তি আছে। আর সেই অকাট্য যুক্তিগুলো এসেছে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে রহস্যময় শাখা কোয়ান্টাম ফিজিকস থেকে।

আমাদের এই বিশাল পৃথিবীতে সবকিছু কার্যকারণের নিয়মে চললেও, পদার্থের ভেতরের অতিপারমাণবিক জগতেও যে একই নিয়ম খাটবে, এমন কোনো কথা নেই। কোয়ান্টাম ফিজিকস আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, এই মহাবিশ্বে এমন অনেক ঘটনা ঘটে, যার পেছনে সত্যিই কোনো কারণ নেই! একদম শূন্য থেকে, কোনো কারণ ছাড়াই, সম্পূর্ণ এলোমেলোভাবে বা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অনেক কিছু ঘটতে পারে। কোয়ান্টাম স্তরে কণাগুলো কারণ ছাড়াই হঠাৎ তৈরি হয় আবার হঠাৎ মিলিয়ে যায়।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞানীরা নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে প্রমাণ পেয়েছেন, মহাবিশ্বের এই খামখেয়ালি বা কারণ ছাড়া আচরণের ব্যাপারটা পুরোপুরি সত্যি। এমন নয় যে আমাদের বিজ্ঞানীদের কাছে ভালো কোনো প্রযুক্তি বা অণুবীক্ষণ যন্ত্র নেই বলে আমরা সঠিকভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারছি না। বরং কোনো কারণ ছাড়া সম্পূর্ণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঘটনা ঘটাটাই হলো এই মহাবিশ্বের একটা মৌলিক বৈশিষ্ট্য। এটা বিজ্ঞানের কোনো সীমাবদ্ধতা নয়, এটাই খোদ প্রকৃতির অদ্ভুত নিয়ম।

তাই পুরো বিষয়টি দাঁড়াচ্ছে এমন, হয়তো বিগ ব্যাংয়ের পেছনে এমন কোনো রহস্যময় কারণ থাকতেও পারে, যা এখনো আমাদের অজানা রয়ে গেছে। কিন্তু আধুনিক মহাকাশবিদ্যা বিগ ব্যাংয়ের পেছনে কোনো কারণ থাকার কথা সংজ্ঞায়িত করে না। এমনকি মহাবিশ্বের জন্ম কীভাবে হলো, তা নিখুঁতভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য বিজ্ঞানীদের এমন কোনো কারণেরও প্রয়োজন পড়ে না। আমাদের এই বিশাল, সুন্দর মহাবিশ্বের শুরুটা হয়েছিল সম্পূর্ণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে, কোনো কারণ ছাড়াই!

সূত্র: বিবিসি সায়েন্স ফোকাস
আরও পড়ুন