সুপার এল নিনোর প্রভাবে সবচেয়ে শুষ্ক মরুভূমিও এখন রঙিন ফুলের বাগান

শুষ্ক মরুভূমি এখন রঙিন ফুলের বাগানফিজিক্স ডট অর্গ

আতাকামা মরুভূমি পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন ও সবচেয়ে শুষ্ক অঞ্চলগুলোর একটি। কিন্তু সম্প্রতি এটি ঘন সবুজ ঘাস ও রঙিন বন্য ফুলে ঢেকে গেছে। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, এমনটা হওয়ার পেছনে সুপার এল নিনোর কারণে হওয়া অস্বাভাবিক আবহাওয়া কাজ করেছে।

মেরু অঞ্চলের বাইরে চিলির আতাকামা হলো পৃথিবীর সবচেয়ে শুষ্ক মরুভূমি। এটি আন্দিজ পর্বতমালা ও উপকূলীয় পাহাড়ের মাঝখানে অবস্থিত। দুটি বড় পাহাড় থাকার কারণে এখানে দ্বৈত বৃষ্টিচ্ছায় অঞ্চল তৈরি হয়েছে। মানে, দুটি বড় পাহাড়ের মধ্যে অবস্থান করার কারণে কোনো দিক থেকেই সেখানে বৃষ্টিবাহী মেঘ ঢুকতে পারে না। ফলে আমাজন রেইন ফরেস্ট ও প্রশান্ত মহাসাগর কোনো দিক থেকেই মেঘ বা জলীয় বাষ্প এর ভেতরে ঢুকতে পারে না।

এখানে সারা বছরে গড়ে মাত্র ১৫ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়। তবে মরুভূমির ভেতরের একেবারে শুষ্ক অংশে বছরের মোট বৃষ্টির পরিমাণ মাত্র ১ থেকে ৩ মিলিমিটার। এমনকি অনেক সময় এর চেয়ে কম হয়।

আরও পড়ুন

শুষ্ক অঞ্চলে বৃষ্টির খবর

এ বছর পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে রেকর্ড ভাঙা এল নিনো দেখা দিয়েছে। এর প্রভাবে আতাকামা অঞ্চলে প্রচুর বৃষ্টি হয়েছে। কোনো কোনো এলাকায় এই মৌসুমে ১৮০ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে।

দক্ষিণ আমেরিকার অন্যান্য জায়গায় এই প্রবল বৃষ্টি সমস্যা তৈরি করেছে। তবে আতাকামা মরুভূমির জন্য এটি একটি বড় সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। বৃষ্টির কারণে বছরের পর বছর মরু বালুর নিচে থাকা লাখ লাখ বীজ থেকে নতুন গাছ জন্মেছে।

আরও পড়ুন

মরুভূমিজুড়ে ফুল ফোটা ইতিমধ্যেই পুরোদমে শুরু হয়ে গেছে। চিলি কর্তৃপক্ষের ধারণা, অক্টোবরের মধ্যে এই রঙিন ফুল প্রায় ১৫ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

চিলির বন জাতীয় করপোরেশন ‘কোনাফ’–এর আতাকামা অঞ্চলপ্রধান গ্যাব্রিয়েলা লোপেজ জানান, মরুভূমিতে ফুল ফোটা কিন্তু কেবল বৃষ্টির ওপর নির্ভর করে না। মাটির পানি শোষণের ক্ষমতা, তাপমাত্রা ও সূর্যের আলোর উপস্থিতিও এ ক্ষেত্রে অনেক বড় ভূমিকা রাখে।

আঞ্চলিক প্রতিনিধি সোফিয়া সিদ বলেন, ‘আতাকামা এখন রঙিন ফুলে সেজে উঠছে। আমরা চাই, চিলির মানুষ আমাদের এই রূপ দেখুক। এ সুযোগে পর্যটনশিল্প ও স্থানীয় ব্যবসার উন্নতি হবে, যা আঞ্চলিক অর্থনীতিকে শক্তিশালী করবে। পাশাপাশি এটি এমন এক প্রাকৃতিক সম্পদ, যা রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব।’

আরও পড়ুন
এই মরুভূমিতে ১ হাজার ৮৯৩ জাতের গাছপালা রয়েছে
ছবি: ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক

অপূর্ব সব ফুল

ইউসি চিলির তথ্য অনুযায়ী, এই মরুভূমিতে ১ হাজার ৮৯৩ জাতের গাছপালা রয়েছে। এগুলোর অনেক প্রজাতি পৃথিবীর আর কোথাও পাওয়া যায় না। কিছু উদ্ভিদের বীজ প্রায় ১০ বছর পর্যন্ত মাটির নিচে টিকে থাকতে পারে। সামান্য বৃষ্টি পেলেই সেগুলো আবার বেঁচে ওঠে।

মরুভূমির এসব গাছের শুকনা আবহাওয়া বা খরা সহ্য করার বিশেষ ক্ষমতা রয়েছে। শরীরে ভেজা ভাব ধরে রাখতে মোমের মতো শক্ত আবরণ, রোদ প্রতিফলিত করার জন্য পাতলা রোম, ছোট ছোট পাতা ও বিশেষ ধরনের শিকড়।

এখানকার ফুলগুলো উজ্জ্বল গোলাপি, বেগুনি, গাঢ় হলুদ আর হালকা নীল রঙের হয়। রঙিন রূপ নিয়ে এরা খুব কম সময়ের জন্য ফুটে থাকে। মরুভূমিতে ফুলের স্থায়িত্ব যেমন কম, তেমনি পরাগায়ন ঘটায়, এমন পোকামাকড়ের সংখ্যাও কম। তাই উজ্জ্বল রঙের কারণে খুব সহজেই পোকামাকড় আকৃষ্ট হয়, যা গাছের বংশবৃদ্ধিতে সাহায্য করে।

আরও পড়ুন

গত ৪০ বছরে আতাকামা মরুভূমিতে প্রায় ১৫ বার এমন ফুল ফোটার ঘটনা ঘটেছে। পরিবেশ অনুকূলে থাকলে সাধারণ ৩ থেকে ১০ বছরের ব্যবধানে এ ঘটনা ঘটে।

তবে সবচেয়ে শেষের ঘটনাটি ঘটেছিল গত বছর, অর্থাৎ ২০২৫ সালে। এর আগে ২০২২ সালেও ফুল ফুটেছিল, যা বেশ অস্বাভাবিক ছিল। কারণ, তখন লা নিনা আবহাওয়া চলছিল। তারও আগে ২০১৭ ও ২০১৫ সালে বড় বড় অঞ্চলে ফুল ফুটতে দেখা যায়।

আতাকামা মরুভূমিতে এভাবে ফুল ফোটার দৃশ্য সত্যিই অবাক করার মতো। আর পরপর দুই বছর এমন দৃশ্য দেখতে পাওয়াটা দারুণ এক অভিজ্ঞতা।

সূত্র: আইএফএল সায়েন্স

আরও পড়ুন