সবার ফেবারিট ফ্রান্স আসলে কতটা শক্তিশালী

বিশ্বকাপের অন্যতম ফেবারিট ফ্রান্স। ছবি: রয়টার্স

২৭ বছর বয়সী কিলিয়ান এমবাপ্পের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অর্জন কী? কেউ বলবেন, ২০১৮ সালের বিশ্বকাপ জেতা। কারণ, ক্লাব পর্যায়ে চ্যাম্পিয়নস লিগ তিনি এখনো জিততে পারেননি—এই কথার সঙ্গে হয়তো তোমরাও একমত হবে। তবে তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় আক্ষেপ কী হতে পারে? পিএসজির হয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগ জিততে না পারা, নাকি রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে এখনো বড় কোনো শিরোপা উঁচিয়ে ধরতে না পারা? এসব তো আছেই। তবে হয়তো এমবাপ্পের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় আক্ষেপ ২০২২ বিশ্বকাপের ফাইনালে হ্যাটট্রিক করেও শিরোপা না জেতা।

বিশ্বকাপের ইতিহাসে ফাইনালের মঞ্চে হ্যাটট্রিক করেছেন মাত্র দুজন ফুটবলার। ১৯৬৬ সালে ওয়েস্ট জার্মানির বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করে ইংল্যান্ডকে বিশ্বকাপ জিতিয়েছিলেন জিওফ্রে হার্স্ট। আর ২০২২ বিশ্বকাপে হ্যাটট্রিক করেও শিরোপাটা জেতা হয়নি এমবাপ্পের। বিশ্বকাপের ইতিহাসে হ্যাটট্রিক করে শিরোপা জিততে না পারা প্রথম ফুটবলার তিনি।

তাই বিশ্বকাপ জেতার আনন্দ আর ফাইনাল হারার আক্ষেপ মিলিয়ে এক মিশ্র অনুভূতি নিয়ে এমবাপ্পে যাচ্ছেন এবারের বিশ্বকাপে। লক্ষ্য অবশ্য সব সময় একটাই; দেশের হয়ে বিশ্বকাপটা জেতা। যদিও এবারের দলটা একেবারেই নতুন। ২০১৮ বিশ্বকাপ জেতা সেই দলের অধিকাংশ খেলোয়াড়ই নেই এবার। এমনকি গতবারের বিশ্বকাপের দল থেকেও অনেকে বাদ পড়েছেন। তবে এবারের দলের সবচেয়ে বড় চমক হচ্ছে, ফরাসি দলে কিলিয়ান এমবাপ্পে আর একক নায়ক নন। ফ্রান্সের সবচেয়ে বড় সুপারস্টার ফুটবলার হলেও দলে তাঁর একচ্ছত্র আধিপত্যের মাত্রাটা এবার কিছুটা হলেও কমেছে।

আরও পড়ুন

গোলবারের নিচে বহু বছর পর এবার নতুন গোলরক্ষক। হুগো লরিসের দীর্ঘ ক্যারিয়ার শেষে এবার ফ্রান্সের গোলবার সামলাবেন এসি মিলানের মাইক মেনিয়ঁ। ক্লাবের হয়ে এই মৌসুমটা খুব একটা ভালো যায়নি তাঁর, এসি মিলানও আগামী মৌসুমের চ্যাম্পিয়নস লিগের টিকিট হাতছাড়া করেছে। তবে ব্যক্তিগতভাবে মেনিয়ঁর পারফরম্যান্স পুরোটা সময় ভরসা করার মতোই ছিল। তা ছাড়া তিনি ছাড়া ফরাসি দলে প্রথম গোলরক্ষকের ভূমিকায় খেলার মতো নির্ভরযোগ্য আর কেউ নেই।

এমবাপ্পে
ছবি: এএফপি

রক্ষণভাগে লেফটব্যাক পজিশনে খেলার জন্য ডাক পেয়েছেন অ্যাস্টন ভিলার লুকাস দিনিয়ে। দুর্দান্ত একটা মৌসুম কাটিয়েছেন তিনি। অ্যাস্টন ভিলা প্রিমিয়ার লিগে চতুর্থ হওয়ার পাশাপাশি জিতেছে ইউরোপা লিগের ফাইনাল। আর এই পুরো সাফল্যে বেশ বড় মাপের কৃতিত্ব পাবেন দিনিয়ে। মোট ৪৪টি ম্যাচ খেলেছেন, করেছেন ৭টি অ্যাসিস্ট। অ্যাস্টন ভিলার বাঁ পাশে রীতিমতো দাপিয়ে বেড়ানো দিনিয়ে খুব সম্ভবত বিশ্বকাপের একাদশেও নিয়মিত মুখ হতে চলেছেন। কোচ দেশমও চাইবেন, তিনি যেন অ্যাস্টন ভিলার সেই ফর্মটাই বিশ্বকাপের মঞ্চে টেনে আনতে পারেন।

লুকাস এবং থিও হার্নান্দেজও আছেন এবার। দিদিয়ের দেশমের অত্যন্ত প্রিয় ফুটবলার তাঁরা। যদিও এই মৌসুমে খুব একটা ভালো ফর্মে ছিলেন না, তবু অভিজ্ঞতার কারণেই হয়তো তাঁদের ডেকেছেন দেশম। মূল একাদশেও হয়তো থাকবেন না কেউ। বদলি খেলোয়াড়ের ভূমিকাতেই তাঁদের এবারের ফ্রান্স দলে থাকা।

সেন্টারব্যাক পজিশনে আছেন দায়োত উপামেকানো, উইলিয়াম সালিবা ও ইব্রাহিমা কোনাতে। ঘুরেফিরে মূলত এঁরাই এবার ফ্রান্স দলের রক্ষণের মূল দায়িত্বে থাকবেন। তবে চতুর্থ ডিফেন্ডার হিসেবে ক্রিস্টাল প্যালেসের ম্যাক্সেন্স ল্যাক্রোয়াকে ডেকে সবাইকে চমকে দিয়েছেন ফরাসি কোচ। বিশ্বকাপে এবার ম্যাচের সংখ্যা বেড়েছে, অন্যদিকে উপামেকানো এবং সালিবা দুজনেরই নিয়মিত চোটে পড়ার ইতিহাস রয়েছে। খুব সম্ভবত চোট হানা দিলেও যেন নিশ্চিন্ত থাকা যায়, সে জন্যই ল্যাক্রোয়াকে স্কোয়াডে রেখেছেন দেশম।

আরও পড়ুন

মধ্যমাঠে মাত্র পাঁচজন খেলোয়াড় ডাক পেয়েছেন। ফ্রান্স সাধারণত ৪-২-৩-১ ছকে খেলে বলেই মধ্যমাঠে খেলোয়াড়ের সংখ্যা কম। আছেন কান্তে, চুয়ামেনি ও রাবিও। তবে এখানে মানু কোনে আর ওয়ারেন জাইর-এমেরির নাম দুটি দেখে কিছুটা চমকে যাওয়ারই কথা। ওয়ারেন জাইর-এমেরি পিএসজির নিয়মিত মুখ। তাঁদের কোচ লুইস এনরিকে জাইর-এমেরিকে মধ্যমাঠ ছাড়াও রাইটব্যাক পজিশনে খেলিয়ে থাকেন। জাইর-এমেরিও কোনো পজিশনেই কোচকে হতাশ করেননি। দেশম চাইলে এনরিকের সেই টোটকা কাজে লাগাতে পারেন। চেলসির মালো গুস্তো আর বার্সেলোনার কুন্দের গড়পড়তা ফর্মের কারণে জাইর-এমেরি খেলতেই পারেন ফ্রান্সের রাইটব্যাক পজিশনে।

ফ্রান্স ফুটবল দল
এএফপি

দুজন ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার দিয়ে গঠন করা ফরাসি মাঝমাঠে কান্তের থাকার সম্ভাবনা শতভাগ। তবে চুয়ামেনিকে পেছনে ফেলে কান্তের সঙ্গে মানু কোনে জুটি বাঁধলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। কারণ, ডাবল পিভট পজিশনে মাঝমাঠ দখলে রাখতে দেশম যে ধরনের খেলোয়াড় চান, মানু কোনে ঠিক সেই ঘরানার। তবে কৌশলগত পরিবর্তনের জন্য রাবিও আর চুয়ামেনি তো থাকছেনই।

ফ্রান্স যে জায়গাটিতে বিশ্বকাপের অন্যান্য দলের চেয়ে পরিষ্কার ব্যবধানে এগিয়ে থাকবে, তা হলো তাদের শক্তিশালী আক্রমণভাগ। তাদের আক্রমণভাগ এতটাই তারকাবহুল যে মূল একাদশ ঠিক করতে স্বয়ং কোচই হিমশিম খেতে যাচ্ছেন।

যেমন ধরা যাক রায়ান চেরকির কথা। ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে দুর্দান্ত ফর্মে আছেন এই ফরাসি উদীয়মান তারকা। ‘নাম্বার টেন’ ভূমিকায় তিনি অপ্রতিরোধ্য। কিন্তু মূল একাদশে হয়তো তাঁর জায়গা হবে না। কারণ, সেখানে খেলবেন মাইকেল অলিসে। বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে যিনি করেছেন ২২টি গোল এবং ২৬টি অ্যাসিস্ট। গতি, ড্রিবলিং এবং ফিনিশিং—সব দিকেই তিনি পারদর্শী। অলিসের মতো খেলোয়াড়কে দলে জায়গা দেওয়ার জন্য রায়ান চেরকিকে হয়তো শুরুর একাদশে বিসর্জন দিতেই হবে।

আরও পড়ুন

অলিসে সাধারণত মাঠের ডান পাশে রাইট উইঙ্গার হিসেবে খেলেন। রায়ান চেরকিকে নাম্বার টেন ভূমিকায় রেখে অলিসেকে মাঠের ডান পাশে খেলানো যেত, কিন্তু সেখানে রয়েছেন উসমান দেম্বেলে। বার্সেলোনা থেকে পিএসজিতে আসার পর পুরোদমে নিজের খোলস থেকে বেরিয়ে এসেছেন তিনি, জিতেছেন ব্যালন ডি’অরও। গত বিশ্বকাপ ফাইনালে তাঁরই এক ভুলে আর্জেন্টিনা প্রথম পেনাল্টি পেয়েছিল। সেই ম্যাচটা হয়তো দেম্বেলে আজীবন ভুলেই যেতে চাইবেন, আর তাই এবারের বিশ্বকাপ তাঁর জন্য সেই প্রায়শ্চিত্ত করার মোক্ষম সুযোগ।

‘নাম্বার নাইন’ বা মূল স্ট্রাইকারের ভূমিকায় যে কিলিয়ান এমবাপ্পে থাকবেন, সেটা না বললেও চলে। তবে বাঁ পাশের উইং পজিশন নিয়ে বারকোলা আর দুয়ের মধ্যে লড়াইটা বেশ ভালোই জমবে।

এ ছাড়া মার্কাস থুরাম, জঁ-ফিলিপ মাতেতা এবং মাঘনেস আকলিউশকে ডেকেছেন দিদিয়ের দেশম। বিশ্বকাপে ফ্রান্সের এই জমাট আক্রমণভাগকে হয়তো তিনি বেশ আনন্দের সঙ্গেই ব্যবহার করবেন। ৯০ মিনিটের ম্যাচে খেলোয়াড় রোটেশন করার মতো দারুণ সুযোগ থাকবে তাঁর হাতে। ম্যাচের শেষ ৩০ বা ৪০ মিনিটে দুয়ে বা রায়ান চেরকির মতো খেলোয়াড়েরা এসে এক নিমিষেই ঘুরিয়ে দিতে পারেন খেলার ভাগ্য। কিলিয়ান এমবাপ্পে যে ফ্রান্স দলে আর একক সুপারস্টার নন—এ কথা কেন বলেছি, সেটা কি এখন ধরতে পারছ?

কৌশলগত দিক থেকে দিদিয়ের দেশম কখনোই অতশত চিন্তা করেন না। শেষ দুটি বিশ্বকাপ যদি দেখে থাকো, তাহলে হয়তো জানবে যে দেশমের পরিকল্পনায় কোনো জটিল প্যাঁচ নেই। তিনি সহজ-সরল ফুটবল খেলাতেই পছন্দ করেন। বল দখল, কাউন্টার অ্যাটাক, প্রতিপক্ষকে কড়া মার্ক এবং প্রথাগত ডিফেন্ডিং—তাঁর কৌশলের সবকিছুই বেশ স্বচ্ছ। এ জন্য দলটিও হয় ঠিক তাঁর মনমতো। কারণ, প্রয়োজন নেই এমন কোনো খেলোয়াড়কে তিনি দলে ডাকেন না। ফলে তিনি যে দলটা নিয়ে বিশ্বকাপে যাচ্ছেন, তা হয়তো খাতা–কলমে ফ্রান্সের সেরা দল নয়, কিন্তু দেশম ঠিক যে রকম দল চান, এটি হুবহু তেমন।

ফ্রান্সের এই বিধ্বংসী আক্রমণভাগ এবং জমাট রক্ষণভাগ দেখে ফুটবলবোদ্ধাদের অনেকেই মনে করছেন, এবারের বিশ্বকাপে ফ্রান্সই সবচেয়ে বড় ফেবারিট।

তোমার কী ধারণা?

আরও পড়ুন