১৯৬২ বিশ্বকাপ যতটা না পরিচিত ফুটবলের জন্য, এর চেয়ে বেশি সমালোচিত ফুটবলের বাইরের ইতিহাসের জন্য। ফুটবল ইতিহাসে এমন সহিংস বিশ্বকাপের দেখা মেলেনি কখনো। আর তার সূচনা হয়েছিল বিশ্বকাপ মাঠে গড়ানোর আগেই।
বিশ্বকাপ আয়োজন নিয়ে যখন সবার কাছ থেকে আবেদন চাচ্ছে ফিফা, তখনই অদ্ভুত এক দাবি করে বসে দক্ষিণ আমেরিকান ফুটবল ফেডারেশন কনমেবল। দাবিটা হলো, যদি ১৯৬২ বিশ্বকাপ আমেরিকায় আয়োজন করা না হয় তবে আমেরিকান কোনো দলই অংশ নেবে না সেখানে। অদ্ভুত এ দাবিতে স্তম্ভিত হয়ে যায় ফিফা। বিশ্বজয়ী দলকে ছাড়া বিশ্বকাপ শুরু করার মতো অবস্থা তখনো হয়নি ফিফার। তাদের দাবি মেনে ১৯৬২ বিশ্বকাপ আয়োজন করা হয় দক্ষিণ আমেরিকান দেশ চিলিতে।
বিশ্বকাপের আগেই হানা দেয় চিলিতে বিপর্যয়। ১৯৬০ সালের ভূমিকম্পে একপ্রকার ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় চিলি। তখন বিশ্বকাপ প্রজেক্ট সরিয়ে আনার চেষ্টা করে ফিফা। কিন্তু চিলির প্রেসিডেন্ট অনুরোধ করেন ফিফাকে, এই বিশ্বকাপ ছাড়া তাদের জন্য আর কিছুই বাকি নেই। শেষ পর্যন্ত ১৯৬২ সালে মাত্র চার ভেন্যুতেই বিশ্বকাপ আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেয় চিলি। আর সেখান থেকেই শুরু বিতর্কের।
ইউরোপের বাইরে বিশ্বকাপ নিয়ে সব সময় নারাজ থাকে ইউরোপবাসী। তার ওপরে যোগ হয়েছিল কনমেবলের জোরজবরদস্তি করে নিজেদের কাছে বিশ্বকাপ আয়োজনের স্বত্ব নিয়ে নেওয়া। বল মাঠে গড়ানোর আগে থেকেই শুরু হয় সমালোচনা; চিলির জনগণ থেকে শুরু করে বিশ্বকাপ আয়োজন—সবকিছুকে একেবারে ধুয়ে দেয় ইউরোপীয় সংবাদমাধ্যমগুলো। ফলে ম্যাচ শুরুর আগেই যুদ্ধের আভাস তৈরি হয়েছিল ইউরোপ আর দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোর মধ্যে।
ফুটবলে তখনো কার্ড প্রথার সূচনা হয়নি, রেফারিরা চাইলে মৌখিকভাবে খেলোয়াড়দের মাঠ থেকে সাময়িক সময়ের জন্য বহিষ্কার করতে পারতেন। মাঠে নিজেদের আধিপত্য দেখানোর জন্য সেটারই পূর্ণ সুবিধা নিয়েছে প্রতিটি দল। বিশ্বকাপের প্রথম দুই দিনে মোট চারজন খেলোয়াড়কে মাঠ থেকে বহিষ্কার করেছেন রেফারিরা। পা ভেঙেছে তিনজনের। ভাঙা গোড়ালি ও চিড় ধরা বুকের পাঁজর নিয়ে মাঠ ছেড়েছেন অনেকে। এর মধ্যে ছিলেন আগের বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড় পেলেও। আর্জেন্টিনা-বুলগেরিয়া ম্যাচে রেফারি মোট বাঁশি বাজিয়েছেন ৬৯ বার, প্রতি ৭৮ সেকেন্ডে একটি ফাউল হয়েছে মাঠে।
কিন্তু সবকিছু ছাড়িয়ে গিয়েছিল চিলি-ইতালি ম্যাচে। বিশ্বকাপের শুরু থেকে চিলিকে নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছিল ইতালির পত্রপত্রিকায়। মাঠের বাইরের কার্যক্রম নিয়ে আগে থেকেই উত্তপ্ত হয়ে ছিল পরিবেশ। ২ জুন সান্তিয়াগোর স্তাদিও নাসিওনালে মুখোমুখি হয় চিলি আর ইতালি। ইতিহাসের যার পরিচিতি ‘ব্যাটল অব সান্তিয়াগো’ নামে।
রেফারি বাঁশি বাজানোর পর থেকেই ফুটবল মাঠ পরিণত হয় রণক্ষেত্রে। ১২ সেকেন্ডের মাথায় প্রথম ফাউলের বাঁশি বাজান রেফারি। সেখান থেকে শুরু—১২ মিনিটের মাথায় ইতালিয়ান খেলোয়াড় জর্জিও ফেরারিকে মাঠের বাইরে পাঠান রেফারি। কিন্তু রেফারির সিদ্ধান্ত না মেনে উল্টো তাঁর সঙ্গেই বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন জর্জিও। পুলিশ ডেকে তাঁকে পাঠানো হয় মাঠের বাইরে। ১০ মিনিট পর খেলা শুরু হতে না হতেই ইতালির অধিনায়কের মুখে ঘুষি বসিয়ে দেন চিলির লিওনেল সানচেজ। আরেক দফা হট্টগোল লেগে যায় মাঠে। প্রথমার্ধের শেষ মিনিটে ফ্লাইং কিক করে দ্বিতীয় ইতালিয়ান হিসেবে মাঠ ছাড়েন মারিও ডেভিড।
দ্বিতীয়ার্ধেও বিন্দুমাত্র উন্নতি হয়নি ম্যাচের পরিস্থিতির। কাউকে মাঠ ত্যাগ করতে না হলেও প্রতি মিনিটেই বেজে চলছিল ফাউলের বাঁশি। ৯ জনের ইতালির বিপক্ষে সহজেই দুই গোলের লিড নিয়ে নেয় স্বাগতিক চিলি। অন্যদিকে ৯০ মিনিট পার হতে না হতেই ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজিয়ে দেন রেফারি কেন অ্যাস্টন। তাঁর মতে, সেই ম্যাচে আর এক মিনিটও মাঠে থাকা তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না।
এই ম্যাচের প্রভাব পরে পুরো চিলিতে। বার, রেস্তোরাঁ নিষিদ্ধ করা হয় ইতালিয়ানদের। নিরাপত্তার জন্য মোতায়েন করা হয় সেনাবাহিনী। সেবার গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেয় ইতালি। এমনও শোনা যায়, ইতালির বিদায়ে স্বস্তির নিশ্বাস ছেড়েছিলেন অনেকে।
ইতালি বিদায় নিলেও বিশ্বকাপের পিছু ছাড়েনি সহিংসতা। বিশ্বকাপজুড়ে ফুটবল থেকে বেশি প্রাধান্য পেয়েছে সহিংসতা। তবে এত কিছুর মধ্যেও ভাটা পড়েনি একটি জায়গায়—ব্রাজিলের ফর্ম। বিশ্বকাপের প্রথম রাউন্ডেই ইনজুরির কারণে পেলেকে হারিয়ে ফেলে ব্রাজিল। কিন্তু গারিঞ্চা আর ভাভার ওপর ভর করে টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপের পথে এগিয়ে যায় ব্রাজিল। কোয়ার্টারে ইংল্যান্ড ও সেমিতে চিলিকে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো ফাইনাল খেলার যোগ্যতা অর্জন করে ব্রাজিল। কিন্তু ফাইনালেই পথেই বাধে বিপত্তি।
১৯৫৮ বিশ্বকাপ যদি হয়ে থাকে পেলের, তবে ১৯৬২ বিশ্বকাপ ছিল গারিঞ্চার। পেলের চোটের কারণে সবাই যখন ব্রাজিলকে দুর্বল ভাবতে শুরু করেছিল, তখনই ব্রাজিলের ত্রাতা হয়ে আসেন ‘ছোট পাখি’ গারিঞ্চা। বিশ্বকাপের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত গারিঞ্চা একাই টেনে এনেছেন ব্রাজিলকে। কিন্তু চিলির বিপক্ষে সেমিফাইনালে তাঁকে মাঠের বাইরে বের করে দেন রেফারি। ফলে নিষেধাজ্ঞা জারি হয় ফাইনালে। যদিও শেষ মুহূর্তে বিশেষ বিবেচনায় গারিঞ্চাকে খেলার অনুমতি দেয় ফিফা। আর গারিঞ্চাই হয়ে ওঠেন ফাইনালে ব্রাজিলের রক্ষাকর্তা।
চেকোস্লোভাকিয়াকে ৩-১ গোলে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জিতে নেয় ব্রাজিল। ফাইনালে গোল না করতে পারলেও পেছন থেকে ব্রাজিলের হয়ে ছড়ি ঘুরিয়েছেন গারিঞ্চাই। যদিও ব্রাজিলের দারুণ ফর্ম আর টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ মুছে দিতে পারেনি পুরো টুর্নামেন্টের কালিমা। এখনো ইতিহাসের সবচেয়ে সহিংস বিশ্বকাপ হিসেবে পরিচিত ১৯৬২ চিলি বিশ্বকাপ।