নেপালে স্কুলশিক্ষকের সিদ্ধান্তে বাঁচল ৯০০ শিক্ষার্থীর প্রাণ
গত ২৬ আগস্ট বুধবার সকাল। নেপালের একটি স্কুলের অধ্যক্ষ রাজেন্দ্র দাওয়াদির সকালটা অন্য সাধারণ দিনের মতোই শুরু হয়। তিনি জানান, সব কাজ স্বাভাবিক নিয়মেই চলছিল।
সকাল ৯টা ১০ মিনিটের দিকে পরিস্থিতির হুট করে বদলে যায়। সে সময় অধ্যক্ষ রাজেন্দ্র দাওয়াদি রাজধানী কাঠমান্ডুর উত্তরের নুয়াকোট জেলার ‘ত্রিভুবন ত্রিশূলী স্কুলে’ ক্লাস নিচ্ছিলেন। এমন সময় এক কর্মী তাড়াহুড়া করে এসে জানান একটি প্রচণ্ড বন্যা তাদের স্কুলের দিকে ধেয়ে আসছে। পাহাড়ি নদীর ওপরের দিকের বাসিন্দারা তাঁদের আত্মীয়দের কাছে সতর্কবার্তা পাঠাতে থাকলে খবরটি মুহূর্তের মধ্যে সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে পেরে রাজেন্দ্র দাওয়াদি দ্রুত সিদ্ধান্ত নেন। তিনি স্কুলে উপস্থিত সব শিক্ষার্থীকে অবিলম্বে উঁচু স্থানে দৌড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেন। সে সময় স্কুলের মোট ১ হাজার ৬৪৩ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রায় ৯০০ জন উপস্থিত ছিল। তাদের বয়স ছিল ১১ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে। স্যারের কথা শুনে সবাই উঁচু জায়গায় চড়তে শুরু করে।
এক সাক্ষাত্কারে রাজেন্দ্র দাওয়াদি জানান, শিক্ষার্থীরা বয়সে একটু বড় হওয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে দৌড়ে নিজেদের রক্ষা করতে পেরেছিল। সেই সময়ে কিন্ডারগার্টেন ও প্রাথমিকের ছোট ছোট শিশুরা থাকলে তাদের সবাইকে এভাবে দ্রুত ও নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়তো সম্ভব হতো না।
যেসব শিক্ষার্থী আগে বাসে চেপে স্কুলে এসেছিল, তাদের দ্রুত আবার বাসে উঠে পড়তে বলা হয়। অধ্যক্ষ রাজেন্দ্র দাওয়াদি চালকদের সময় নষ্ট না করে এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেন।
আতঙ্কের কারণে দু–একজন শিক্ষার্থী হঠাৎ জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। তখন শিক্ষকেরা তাঁদের নিজেদের মোটরবাইকে বসিয়ে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দেন। রাজেন্দ্র দাওয়াদি ভেবেছিলেন, সতর্কবার্তাটি যদি ভুলও প্রমাণিত হয়, তবে বড়জোর এক দিনের পড়াশোনার ক্ষতি হবে। কিন্তু এই খবরটিকে অবহেলা করলে শত শত শিক্ষার্থীর প্রাণহানি ঘটতে পারত।
দুর্যোগের শুরুতে অনেক শিক্ষার্থীই পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে পারেনি। ১৬ বছর বয়সী ছাত্রী ইউনিশা আমাত্য তার বন্ধুদের নিয়ে মাত্র ১০ সেকেন্ডের ব্যবধানে প্রাণে বেঁচে যায়।
বন্যা আঘাত হানার ঠিক আগমুহূর্তে তারা শ্রেণিকক্ষে পড়াশোনা করছিল। শিক্ষকেরা একত্র হলেও প্রথমে ঠিক কী ঘটেছে, তা বুঝতে পারছিলেন না। প্রায় পাঁচ মিনিট পর তারা ক্লাসে এসে বন্যার খবর দেন ও শিক্ষার্থীদের দ্রুত বাড়ি চলে যেতে বলেন। তবে অনেকেই তখনো বিপদটি গুরুত্ব দিয়ে না দেখে গণিত ক্লাসে থাকা সহপাঠীদের জন্য অপেক্ষা করছিল।
শিক্ষকদের নির্দেশ পাওয়ার পর ইউনিশা ও তার বন্ধুরা স্কুলের পেছনের একটি সরু মই বেয়ে দ্রুত পাহাড়ি উঁচু রাস্তার দিকে উঠতে শুরু করে। পাহাড়ে ওঠার সময় হাঁটতে কষ্ট হলে বন্ধুরাই তাকে সাহায্য করে। চোখের পলকে তাদের দেখা পুরো স্থানীয় বাজারটি বন্যার পানিতে ভেসে যায়।
ইউনিশার জুতার তলার গ্রিপ ভালো থাকায় সে পড়ে যাওয়া থেকে রক্ষা পায়। সবাই জীবন বাঁচাতে একে অপরকে ধাক্কা দিয়ে উঁচু স্থানের দিকে দৌড়াচ্ছিল। ইউনিশা জানায়, যারা বিকল্প পথ দিয়ে পালানোর চেষ্টা করেছিল, তাদের অনেকেই চোখের সামনে ভেসে যান।
স্কুলশিক্ষকের তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত সবার জীবন রক্ষা করে। সতর্কবার্তা পাওয়ার ঠিক ১৩ মিনিট পর, সকাল ৯টা ২৩ মিনিটের দিকে কাদা, পানি ও নানা ধ্বংসাবশেষ নিয়ে এক ভয়াবহ পাহাড়ি ঢল এলাকাটিকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। চোখের পলকে সম্পূর্ণ স্কুলটি ধ্বংস হয়ে যায়। ৩১ আগস্ট সোমবার পর্যন্ত পাওয়া তথ্যানুযায়ী, স্কুলের অন্তত একজন শিক্ষক এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।
হিমালয়ের নদী উপত্যকায় পাহাড়ি ঢল নেমে ঘরবাড়ি, দালানকোঠা ও রাস্তাঘাট ভেসে যাওয়ার পর সোমবার পর্যন্ত নেপালে অন্তত ৪ হাজার ২০০ জন মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। সরকারি হিসাবে এই দুর্যোগে এখন পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। আর নিখোঁজের সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বন্যার ফলে যোগাযোগব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। মাইলের পর মাইল সড়ক ধ্বংস হয়ে গেছে। বিভিন্ন দৃশ্য ও ছবিতে দেখা যায়, কাদা ও ভেসে আসা আবর্জনায় ভরা নদীর স্রোত পোল উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে এবং লোকালয়গুলোকে কাদার নিচে চাপা দিচ্ছে।
অধ্যক্ষ রাজেন্দ্র দাওয়াদি নিজেও ছোটবেলায় এই স্কুলের ছাত্র ছিলেন। দীর্ঘ সময় ধরে গড়ে ওঠা নিজের প্রিয় প্রতিষ্ঠানটি চোখের সামনে ভেসে যেতে দেখে তিনি ভেঙে পড়েন। বর্তমানে কেবল দুটি বাস ছাড়া স্কুলের আর কোনো কিছুই অবশিষ্ট নেই।
মানুষের জীবন বাঁচানো সম্ভব হলেও শিক্ষার্থীদের নতুন করে পাঠদান শুরু করা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। স্কুলঘর সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় কোথায় ও কীভাবে আবার শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করা যাবে, তা নিয়ে দুশ্চিন্তা প্রকাশ করেছেন অধ্যক্ষ।