হাতি কিংবা ড্রিল মেশিনের চেয়েও জোড়ে শব্দ করতে পারে যে পাখি
ব্রাজিলের সেরা দো মার পর্বতমালার ঘন জঙ্গলে এক অদ্ভুত আওয়াজ পাওয়া যেত। এই আওয়াজ এতটাই জোরালো যে শুনলে কান ঝালাপালা হয়ে যাওয়ার অবস্থা হয়। কোনো ধাতব বস্তুতে জোরে আঘাত করলে যেমন শব্দ হয়, এই বনের গাছপালার মধ্যে থেকে ঠিক তেমনই তীব্র শব্দ হতো।
অনেক খোঁজাখুঁজির পর বিজ্ঞানীরা সেই আওয়াজের সন্ধান পেলেন। একটা পাখি এভাবে ডাকে। নাম তার বেয়ার-থ্রোটেড বেলবার্ড। মূলত স্ত্রী পাখিকে ডাকার জন্য এরা এত তীব্র শব্দে ডাকে। মজার বিষয় হলো, পাখিটি আকারে একটি সাধারণ ঘুঘুর চেয়ে বড় নয়। অথচ এর গলার জোর এত। এর ডাকের আওয়াজ ড্রিল মেশিন কিংবা কাঠ কাটার মেশিনের শব্দের চেয়েও বেশি। এমনকি বিশালাকার হাতির ডাকের চেয়েও এর গলার আওয়াজ বেশি শক্তিশালী।
সম্প্রতি অক্সফোর্ড একাডেমিকের ‘ইভোলিউশন’ সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণা থেকে এই পাখির কথা জানা যায়। ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটস অ্যামহার্স্টের গবেষকেরা জানান, বেলবার্ড পাখি খালি গলায় ১২০ ডেসিবেলের চেয়েও বেশি জোরালো আওয়াজে ডাকতে পারে।
বিজ্ঞানীদের গবেষণায় উঠে এসেছে, এখন পর্যন্ত রেকর্ড করা পাখির ডাকের মধ্যে এটি অন্যতম জোরালো। গবেষণাপত্রের প্রধান লেখক জীববিজ্ঞানী জোয়াও মেনেজেস। তিনি জানান, এই ছোট্ট পাখির ডাকের জোর হাতি, সিংহ, নেকড়ে কিংবা বাইসনের গর্জনকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে।
গবেষকেরা দেখেছেন, বেলবার্ডের পাশাপাশি একই তালিকার শীর্ষে রয়েছে ব্রাজিলের আরেকটি পাখি। সেটির নাম রেড-লেগড সেরিয়েমা। বিজ্ঞানীদের আগে জানা সবচেয়ে জোরালো ডাকের বেলবার্ড পাখির তালিকার সঙ্গে এখন এই নতুন দুটি প্রজাতিও যুক্ত হলো।
গবেষণায় বিজ্ঞানীরা মূলত জানতে চেয়েছেন অত ছোট একটা পাখির শরীর কীভাবে এত বিকট শব্দ তৈরি করে। গবেষণার পর বিজ্ঞানীদের কাছে তা এখন পরিষ্কার। পর্তুগালের পোর্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের পাখি বিশেষজ্ঞ গনসালো কার্দোসো বলেন, ‘বিভিন্ন জাতের পাখির ডাকের জোর বা তীব্রতা নিয়ে এটিই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় গবেষণা। তবে পাখির ডাকের বিশাল জগতের কেবল ছোট একটি অংশই আমরা জানতে পেরেছি, জানতে এখনো অনেক বাকি।’
পাখির ডাকের তীব্রতা মাপা হলো যেভাবে
শব্দের বিস্তার বা ‘অ্যামপ্লিটিউড’ থেকে জানা যায় কোনো শব্দ কতটা জোরালো। আর তা কত দূর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। পাখি কত জোরে ডাকতে পারে, তা জানতে এই অ্যামপ্লিটিউড জানা খুবই প্রয়োজন।
গবেষক ডাক্তার মেনেজেস জানান, আগে খোলা বনে গিয়ে পাখির ডাকের এই তীব্রতা মাপা খুব কঠিন কাজ ছিল। কারণ, চারপাশের অনেক পাখির শব্দ থেকে নির্দিষ্ট একটি পাখিকে আলাদা করা এবং সেটির সঠিক দূরত্ব মেপে রেকর্ড করা সহজ ছিল না। এ কারণে পাখিদের ডাকের জোর মাপার বিষয়টি বিজ্ঞানীদের কাছে এত দিন রহস্যই হয়েছিল। এমনকি চেনা পাখি কানাডা গুজের ডাকের জোরও আগে কখনো মাপা হয়নি।
এই সমস্যার সমাধানে ডাক্তার মেনেজেস ও তাঁর দল লেজারচালিত ‘রেঞ্জ ফাইন্ডার’ যন্ত্র ব্যবহার করেন। এটা গলফ খেলার মাঠে দূরত্ব মাপতে কাজে লাগে। এর সঙ্গে ব্যবহার করা হয় ‘সাউন্ড লেভেল মিটার’, যার মাধ্যমে আশপাশের অন্যান্য শব্দ বাদ দিয়ে নির্দিষ্ট পাখির ডাক রেকর্ড করা যায়।
করোনা মহামারির শুরুতে যখন চারপাশ একদম নিস্তব্ধ ছিল, তখন যুক্তরাষ্ট্র থেকে এই গবেষণার কাজ শুরু হয়। গাড়িঘোড়ার শব্দ না থাকায় পাখির ডাক পরিষ্কারভাবে রেকর্ড করা সহজ হয়েছিল। এরপর গবেষকেরা ব্রাজিলের পাহাড়ি বন ও তৃণভূমিতে গিয়ে কাজ শুরু করেন। কারণ, সেখানে নানা জাতের পাখি থাকে।
সব মিলিয়ে তাঁরা ১২৩টি পাখির গান ও ডাকের জোর রেকর্ড করেন। এতে দেখা যায়, বিভিন্ন পাখির ডাকের জোরে বিশাল পার্থক্য রয়েছে। সবচেয়ে মৃদু ডাক রেকর্ড করা হয়েছে ছোট হামিংবার্ডের, যা মাঝারি বৃষ্টির শব্দের মতো।
তবে সবচেয়ে অবাক করেছে বেলবার্ড এবং সারস পাখির মতো দেখতে সেরিয়েমা পাখি। বেলবার্ডের ডাক ধাতব শব্দের মতো তীক্ষ্ণ, আর সেরিয়েমার ডাক বেশ দীর্ঘ। দুটি পাখির ডাকের জোরই রেকর্ড করা হয়েছে ১২১ থেকে ১২২ ডেসিবেল, যা অন্যান্য সব পাখির চেয়ে অনেক বেশি।
কীভাবে এত জোরালো শব্দ তৈরি করে পাখি?
বিজ্ঞানী পোডোস জানান, বেলবার্ড সত্যিই খুব বিস্ময়কর এক পাখি। কারণ, শরীর ছোট হওয়া সত্ত্বেও এরা এত বিকট শব্দ তৈরি করতে পারে।
পাখিদের শরীর অত্যন্ত উচ্চ স্বরে শব্দ তৈরির উপযোগী হয়ে উঠেছে সময়ের সঙ্গে। এদের শরীরে সিরিংস নামে একটি বিশেষ অঙ্গ রয়েছে। এই অঙ্গ ফুসফুসের বাতাসকে শ্বাসনালির লম্বা নলের ভেতর দিয়ে বাইরের দিকে ঠেলে দেয়।
এটি অনেকটা ট্রাম্বোন বা ট্রাম্পেটের মতো বাদ্যযন্ত্রের নলের মতো কাজ করে। এই নলটি শব্দের সব শক্তিকে এক জায়গায় এনে জমায়, যার ফলে হঠাৎ তীব্র ও বিকট শব্দ বের হয়ে আসে।
পাখির শরীরের গঠন ও ডাক নিয়ে কাজ করতে গিয়ে গবেষকেরা আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় দেখতে পান। একটি হলো ঠোঁট কতটা ছড়ানো এবং অন্যটি হলো পাখির নিজের আকার। চওড়া ঠোঁট কোনো মাইক বা বাদ্যযন্ত্রের স্পিকারের মতো কাজ করে। এটা চারপাশের বাতাসে শব্দকে সহজে ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করে।
আর যেসব পাখির আকার বড়, এদের কণ্ঠনালি ও পেশি অনেক বেশি শক্ত ও মজবুত হয়। শক্তিশালী এই পেশির সাহায্যে এরা শরীরের ভেতরের বাতাসকে প্রচণ্ড চাপে বাইরে বের করে দিতে পারে। এই বাতাসের প্রবল চাপই মূলত জোরালো আওয়াজ তৈরি করে।