এই পাখি মাটিতে না নেমে টানা ১০ মাস উড়তে পারে
মানুষের পক্ষে কি একটানা ১০ মাস কোনো বিরতি ছাড়া কাজ করা সম্ভব? একদমই নয়। কিন্তু এই অসম্ভব কাজটি করে ‘কমন সুইফট’ নামের ছোট এক প্রজাতির পাখি। সুইডেনের লান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা আবিষ্কার করেছেন, এই পাখিগুলো মাটিতে না নেমে একটানা ১০ মাস পর্যন্ত আকাশে উড়তে পারে।
পাখির গায়ে আলো ও নড়াচড়া মাপার বিশেষ এক প্রযুক্তি বসিয়ে বিজ্ঞানীরা এই তথ্য পান। গবেষণায় দেখা যায়, ১০ মাসের পরিযায়ী হওয়ার পুরোটাই এরা আকাশে উড়ে কাটায়। শুধু ডিম পাড়ার জন্য বছরের বাকি দুই মাস এরা মাটিতে নামে।
জীববিজ্ঞানী অ্যান্ডার্স হেডেনস্ট্রম জানান, প্রাণিজগতের এই ক্ষমতা বিজ্ঞানীদের অবাক করে দিয়েছে। মাটিতে পা না রেখে একটানা ১০ মাস আকাশে উড়ে চলার ঘটনা এখন পর্যন্ত জানা সবচেয়ে দীর্ঘতম রেকর্ড।
অন্য পাখিরা কি এত দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে পারে
পৃথিবীতে আরও অনেক পাখিই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে পারে। ‘ওয়ান্ডারিং অ্যালবাট্রস’ ডানা না ঝাপটেই বাতাসে ভেসে ১০ হাজার মাইল (১৬ হাজার ৯০ কিলোমিটার) পথ চলে যেতে পারে। আবার ছোট্ট হামিংবার্ড একটানা নিজের শরীরের দৈর্ঘ্যের চেয়ে ২ কোটি ৯০ লাখ গুণ বেশি দূরত্ব উড়তে পারে।
তবে কমন সুইফটের বিষয়টি একদম আলাদা। অ্যালবাট্রস পাখি বাতাসে বিশাল হ্যাং গ্লাইডারের মতো ভেসে ভেসে কাটায়। কিন্তু সুইফটকে ওড়ার জন্য প্রায় সারাক্ষণ ডানা ঝাপটাতে হয়।
এত কষ্ট করে সারাক্ষণ ডানা ঝাপটে ওড়া এক বিরাট রহস্য। সুইফট পাখিরা কখন ঘুমায়? এরা কি আদৌ ঘুমায়? টানা এত দিন উড়তে উড়তে এরা কীভাবে খাবার খুঁজে খায়? বিজ্ঞানীদের কাছে এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা।
সুইফট পাখির অসামান্য সহনক্ষমতা
গবেষকদের কাছে এখনো এসব প্রশ্নের স্পষ্ট কোনো উত্তর নেই। তাঁরা দেখেছেন, ১০ মাস টানা আকাশে থাকা যেসব পাখি একবারও মাটিতে নামেনি, এদের ওড়ার পুরোনো পালক ঝরে নতুন পালক গজিয়েছে। কিন্তু যেসব পাখি মাঝেমধ্যে একটু মাটিতে নেমেছিল, এদের পালক ঝরেনি।
তবে বিশ্রাম নেওয়া আর না নেওয়া এই দুই দলের ওড়ার সময়ের তফাত ছিল খুবই কম। পরীক্ষা করা ১৩টি পাখির মধ্যে যারা মাঝেমধ্যে একটু বিশ্রাম নিয়েছিল, এরাও ১০ মাসের ৯৯.৫ শতাংশ সময় আকাশেই উড়িয়ে কাটিয়েছে।
বিজ্ঞানী হেডেনস্ট্রমের মতে, পালক ঝরা বা না ঝরা দেখে পাখির স্বাস্থ্য কিংবা শরীরে জীবাণুর সংক্রমণের সামান্য পার্থক্য বোঝা যেতে পারে। আর এটিই হয়তো একই প্রজাতির পাখির ওড়ার অভ্যাসে এমন সামান্য তফাত থাকার কারণ।
সুইফট পাখির আবাসস্থল ও পরিযায়ন
বাসস্থান নির্বাচনের ক্ষেত্রে সুইফট পাখিরা বেশ মানিয়ে নিতে পারে। সাধারণত এরা গাছের কোটরে বাসা বাঁধত। কিন্তু সেই ধরনের থাকার জায়গা কমে যাওয়ায় এরা এখন শহুরে পরিবেশকে বেছে নিয়েছে।
সুইফট পাখিরা পুরোনো টানেল বা সরু জায়গায় বাসা তৈরি করে। চিমনি ও বিভিন্ন দালানের সোজা খাড়া দেয়াল এদের বাসা বাঁধার জন্য বেশ উপযোগী জায়গা। বিশেষ করে কমন সুইফটের এক নিকট আত্মীয় রয়েছে, যাদের নাম চিমনি সুইফট। এরা ঠিক এই ধরনের খাড়া চিমনি ও দেয়ালের গায়েই বাসা বাঁধতে সবচেয়ে পছন্দ করে।
দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ভ্রমণকারী পাখি হিসেবে প্রতিটি সুইফট শীতকালটা অপেক্ষাকৃত গরম কোনো অঞ্চলে কাটায়। গরমে এদের থাকার জায়গা বেশ বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে আছে। দক্ষিণ আমেরিকার পূর্ব পেরু ও আমাজন অববাহিকার বিভিন্ন অংশে যেমন এদের দেখা মেলে, তেমনি অনেকে আবার ইউরেশিয়া বা দক্ষিণ আফ্রিকাতেও পাড়ি জমায়। জুন বা জুলাই মাসে এরা ডিম দেয়।
সুইফট পাখিদের সুরক্ষা
মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও সুইফট পাখিরা এখন নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। আকাশে বিচরণকারী অন্যান্য পতঙ্গ খাওয়া পাখির মতোই এদের সংখ্যাও কমে যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন ও থাকার জায়গা ধ্বংস সম্ভবত এর মূল কারণ। এদের খাদ্যের প্রধান উৎস উড়ন্ত পোকামাকড়ের সংখ্যা কমে যাওয়াটাও একটি বড় উদ্বেগের বিষয়।