মানুষ কি কখনো প্লাস্টিক ব্যবহার বন্ধ করতে পারবে
পৃথিবীর উষ্ণতা কমানোর জন্য বর্তমানে বিশ্বজুড়ে জীবাশ্ম জ্বালানির তেল, গ্যাস ও কয়লা ব্যবহার কমানোর চেষ্টা চলছে। এর ফলে যানবাহনে তেলের ব্যবহার ধীরে ধীরে কমে আসছে। তবে একটি বিশেষ খাতে তেলের ব্যবহার উল্টো বাড়ছে, আর তা হলো প্লাস্টিক উৎপাদন শিল্প।
আগে তেলের শোধনাগারগুলো মূলত গাড়ির জ্বালানি তৈরির জন্য ব্যবহার করা হতো। এখন সেই শোধনাগারগুলোকে নতুনভাবে তৈরি করা হচ্ছে, যাতে সেগুলো থেকে বেশি করে রাসায়নিক উপাদান উৎপাদন করা যায়। এই রাসায়নিকগুলোই প্লাস্টিক তৈরির মূল কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল ও চীনে এখন এমন সব আধুনিক শোধনাগার তৈরি করা হচ্ছে, যেখানে জ্বালানি তেলের বদলে সরাসরি রাসায়নিক পণ্য উৎপাদনের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
পেট্রোলিয়াম বা খনিজ তেল শোধন করার সময় কিছু বিশেষ রাসায়নিক পাওয়া যায়, যেগুলোকে বলা হয় পেট্রোকেমিক্যাল। এগুলো প্লাস্টিকসহ হাজার হাজার পণ্য তৈরির মূল উপাদান। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা ২০১৮ সালের একটি প্রতিবেদনে জানায়, ২০৫০ সাল নাগাদ বিশ্বে তেলের চাহিদার প্রায় অর্ধেকই আসবে এই পেট্রোকেমিক্যাল খাত থেকে। সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ফাতিহ বিরল মনে করেন, জ্বালানি নিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনা হলেও এই পেট্রোকেমিক্যাল খাতের প্রভাবের বিষয়টি এখনো আড়ালেই রয়ে গেছে।
প্লাস্টিক ব্যবহার বন্ধ করা কঠিন হওয়ার একটি প্রধান কারণ হলো এর উৎপাদন খরচ অনেক কম। তবে শুধু কম দামই নয়, চিকিৎসা ক্ষেত্রে এর কিছু বিশেষ গুণের কারণে এটি প্রায় অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। প্লাস্টিক নমনীয় ও এটি সহজেই জীবাণুমুক্ত রাখা যায়। একবার ব্যবহার করে ফেলে দেওয়া যায় বলে এর মাধ্যমে সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকি অনেক কমে যায়।
গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমানে চিকিৎসা ক্ষেত্রে পুনর্ব্যবহারযোগ্য সরঞ্জামের বদলে একবার ব্যবহারযোগ্য ডিসপোজেবল প্লাস্টিক পণ্যের দিকে মানুষ বেশি ঝুঁকছে। ২০২২ সালের একটি গবেষণাপত্রে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রগুলো থেকে উৎপন্ন বর্জ্যের ২০ থেকে ২৫ শতাংশই হলো প্লাস্টিক। স্বাস্থ্যসেবায় এই প্লাস্টিকের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। তবে এর সঠিক পরিমাণ পরিমাপ করার কোনো সহজ উপায় এখনো নেই, যা একটি উদ্বেগের বিষয়।
তেলের ওপর নির্ভরতা কমাতে গবেষকরা এখন পেট্রোলিয়াম ছাড়া অন্য উৎস থেকে প্লাস্টিক তৈরির উপায় খুঁজছেন। ভুট্টার মাড় বা বিশেষ ব্যাকটেরিয়া থেকে তৈরি একধরনের প্রাকৃতিক পলিয়েস্টার। এগুলোকে বলা হয় বায়োপ্লাস্টিক। যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে সয়াবিন থেকে জৈব জ্বালানি তৈরি হচ্ছে; একইভাবে এই উদ্ভিদগুলো বায়োপ্লাস্টিক তৈরির প্রধান উৎস হতে পারে।
তবে বায়োপ্লাস্টিকেরও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সব বায়োপ্লাস্টিক প্রাকৃতিকভাবে পচে যায় না; অনেক ক্ষেত্রে এগুলো নষ্ট করার জন্য বিশেষ শিল্প প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হয়। যদিও এটি তৈরিতে গ্রিনহাউস গ্যাস কম নির্গত হয়। তবু সাধারণ প্লাস্টিকের মতোই এগুলো ভেঙে ক্ষতিকারক মাইক্রোপ্লাস্টিক তৈরি করতে পারে। এ ছাড়া বায়োপ্লাস্টিক উৎপাদন করা অনেক বেশি ব্যয়বহুল এবং সব কাজে এটি ব্যবহার করা যায় না।
চিকিৎসা ক্ষেত্রে বায়োপ্লাস্টিকের ব্যবহার এখনো অনেক কম। এর একটি কারণ হলো স্থায়িত্ব। হাসপাতালের অনেক সরঞ্জাম দীর্ঘ সময় ভালো থাকা প্রয়োজন, কিন্তু বায়োপ্লাস্টিক দ্রুত ক্ষয়ে যায় বলে সেখানে এটি ব্যবহার করা কঠিন। এমআইটির অধ্যাপক রবার্ট ল্যাঙ্গার জানান, স্থায়িত্বের চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ হলো নিরাপত্তা। চিকিৎসা ক্ষেত্রে যেকোনো নতুন উপাদান ব্যবহারের আগে প্রচুর অর্থ খরচ করে সেটির নিরাপত্তা পরীক্ষা করতে হয়, যা বায়োপ্লাস্টিকের পথে বড় বাধা।
স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার কড়াকড়ির কারণে চিকিৎসা ক্ষেত্রে ব্যবহৃত সরঞ্জামগুলোকে খুব কঠিন অবস্থার মধ্যে টিকে থাকতে হয়। প্লাস্টিকের তৈরি যন্ত্রপাতিতে থাকা জীবাণু ধ্বংস করার জন্য সেগুলোকে বারবার উচ্চ তাপ ও চাপের মধ্যে রাখা হয়। জৈব পচনশীল বা বায়োপ্লাস্টিক সাধারণত এই উচ্চ তাপ সহ্য করতে পারে না এবং দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। ফলে এগুলো ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় স্থিতিশীলতা পায় না।
তবে এর অর্থ এই নয় যে চিকিৎসা ক্ষেত্রে চিরকাল সাধারণ প্লাস্টিকই ব্যবহার করা হবে। লুন্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ফ্রেডরিক বাউয়ার মনে করেন, প্লাস্টিকের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে মূলত পেট্রোকেমিক্যাল শিল্পের ওপর। যদি বাজার পরিবর্তিত হয় ও অন্যান্য ক্ষেত্রে তেল থেকে তৈরি প্লাস্টিকের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়, তবে চিকিৎসা শিল্পও নতুন কোনো বিকল্প বেছে নিতে বাধ্য হবে।