যুদ্ধ হলে তেল-গ্যাসের দাম বাড়ে কেন
পৃথিবীর কোথাও যুদ্ধ শুরু হলেই তার প্রথম প্রভাব পড়ে জ্বালানি খাতে। হুট করেই বেড়ে যায় রান্নার গ্যাস আর যানবাহনের তেলের দাম। কিন্তু যুদ্ধ হচ্ছে কয়েক হাজার মাইল দূরে, অথচ তার জন্য তেলের দাম আমাদের এখানে কেন বাড়বে?
প্রশ্নটার উত্তর রয়েছে উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায়। সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়ার পর বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের দাম হু হু করে বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জবাবে ইরান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন জায়গায় পাল্টা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। গত ৩ মার্চ, মঙ্গলবার বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের দাম রেকর্ড পরিমাণ বেড়ে গেছে।
ইরান এবং মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রভাবে মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি রপ্তানি প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। তেহরান বিভিন্ন জাহাজ ও জ্বালানি কারখানায় হামলা চালানোয় পারস্য উপসাগরে নৌযান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে কাতার থেকে ইরাক পর্যন্ত সব জায়গায় জ্বালানি উৎপাদন থমকে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্বের অন্যতম বড় গ্যাস রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান কাতার এনার্জি তাদের কিছু কারখানায় সামরিক হামলার পর উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে সরাসরি প্রাকৃতিক গ্যাসের দামের ওপর। বর্তমানে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ৮২ ডলারে পৌঁছেছে। সপ্তাহান্তে হরমুজ প্রণালির কাছে অন্তত তিনটি জাহাজে হামলার পর এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
পৃথিবীর সব দেশে তেলের খনি নেই। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া সবচেয়ে বেশি তেল উৎপাদন করে। যদি কোনো কারণে এসব দেশে উৎপাদন কমে যায় বা খনিতে সমস্যা হয়, তবে বাজারে তেলের সংকট দেখা দেয় এবং দাম বেড়ে যায়। অর্থাৎ যখন বাজারে চাহিদার তুলনায় জোগান কমে যায়, তখন স্বাভাবিকভাবেই জিনিসের দাম বেড়ে যায়।
তেলের খনি থেকে তেল উত্তোলন করার পর তা জাহাজ বা পাইপলাইনের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে পাঠানো হয়। একেই বলে সাপ্লাই চেইন। যুদ্ধের কারণে যদি সমুদ্রপথ বন্ধ হয়ে যায়, তবে তেল সময়মতো পৌঁছাতে পারে না। এই সরবরাহে বাধা পড়লে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায়।
বর্তমানে হরমুজ প্রণালি বিশ্বের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পানিপথ। হরমুজ প্রণালী দিয়ে পৃথিবীর প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস সারা বিশ্বে যায়। একে বলা হয় বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের মূল ধমনি। ইরানের পাঁচটি জাহাজে হামলা চালানোর পর টানা চার দিন ধরে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ রয়েছে। এই পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পুরো সরবরাহ ব্যবস্থা এখন অচল হওয়ার মুখে। তেলের প্রধান সরবরাহ পথে এমন উত্তেজনার কারণেই বিশ্বজুড়ে জ্বালানির বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
২০২৪ সালের জুলাই মাসের পর তেলের দাম এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে। গত শুক্রবারের তুলনায় এই দাম বাড়ার হার ১৫ শতাংশের বেশি। এদিকে ইউরোপে গ্যাসের দাম এক দিনেই ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। শুধু জ্বালানি নয়, যুদ্ধের প্রভাবে চিনি, সার এবং সয়াবিনের মতো নিত্যপণ্যের দামও বিশ্ববাজারে চড়া হতে শুরু করেছে।
একসময় বড় বড় বহুজাতিক কোম্পানিগুলোই তেলের দাম ঠিক করত। কিন্তু ১৯৬০ সালে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো মিলে ওপেক নামে একটি জোট তৈরি করে। এর পর থেকে তারাই দাম নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে। তবে ১৯৮৬ সাল থেকে পদ্ধতিতে বদল আসে। এখন আর কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা কোম্পানি একা দাম ঠিক করে না। বরং নিউইয়র্ক বা লন্ডনের মতো আন্তর্জাতিক বাজারের মাধ্যমে প্রতিদিনের তেলের দাম নির্ধারিত হয়।
যুদ্ধের সময় অনেক দেশ ভবিষ্যতের কথা ভেবে আগেভাগেই তেল মজুত করতে শুরু করে। এটা কৃত্রিম চাহিদা। বাজারে তেলের ঘাটতি না থাকলেও সবাই যখন বেশি করে কিনতে চায়, তখন দাম আরও বেড়ে যায়। এই বাড়তি দামের প্রভাবে শুধু জ্বালানি নয়, চিনি, সার এবং সয়াবিনের মতো নিত্যপণ্যের দামও বিশ্ববাজারে চড়া হতে শুরু করে।
বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়লে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের অনেক ক্ষতি হয়। আমাদের দেশে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র জ্বালানি তেল দিয়ে চলে। তাই তেলের দাম বাড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ বেড়ে যায়, যা লোডশেডিংয়ের ঝুঁকি তৈরি করে।
তেলের দাম বাড়লে বাস ও ট্রাকের ভাড়ার ওপরও এর প্রভাব পড়ে। এর ফলে বাজারে চাল, ডাল ও সবজির দাম বেড়ে যায়। আবার কৃষিকাজে পানি দেওয়ার পাম্পগুলো তেলে চলে বলে কৃষকের খরচও অনেক বেড়ে যায়। সহজ কথায়, যুদ্ধ দূরে হলেও এর ফলে আমাদের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে পড়ে।
আর যুদ্ধ যদি দীর্ঘ সময় ধরে চলে, তবে বিশ্বজুড়ে জিনিসের দাম বা মুদ্রাস্ফীতি আরও বেড়ে যেতে পারে। এতে ইউরোপ ও এশিয়ার দেশগুলোর অর্থনৈতিক উন্নতি বাধাগ্রস্ত হবে। বিশ্বের মোট তেল উৎপাদনের এক-তৃতীয়াংশ এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ আসে এই মধ্যপ্রাচ্য এলাকা থেকে। ওপেক জোটের দ্বিতীয় বৃহত্তম তেল উৎপাদনকারী দেশ হলো ইরাক।
ইতিমধ্যে ইরাক তাদের বিশাল রুমাইলা তেলক্ষেত্র থেকে উৎপাদন ৭ লাখ ব্যারেল কমিয়ে দিয়েছে। এ ছাড়া পশ্চিম কুর্না ২ নামের আরেকটি ক্ষেত্র থেকেও প্রায় ৪ লাখ ৬০ হাজার ব্যারেল উৎপাদন কমানো হয়েছে। উৎপাদন এভাবে কমতে থাকলে বিশ্ববাজারে তেলের সংকট আরও তীব্র হবে।
সূত্র: রয়টার্স, সিএনএন, বিবিসি, ব্যালটপিডিয়া