ডলফিন কেন পানি থেকে লাফিয়ে ওঠে
সমুদ্রে বা নদীতে ডলফিন দেখা খুব আনন্দদায়ক। ডলফিনকে কখনো পানি থেকে লাফ দিতে দেখা যায়, কখনো দলবেঁধে সাঁতার কাটতে দেখা যায়, আবার কখনো মাথা দিয়ে পানি ছিটায়। ডলফিন খুব বুদ্ধিমান ও কৌতূহলী স্বভাবের প্রাণী। তবে পানির ওপর ডলফিনের এই লাফ দেওয়া শুধু আমাদের দেখানোর জন্য নয়, এর পেছনে অনেকগুলো কারণ আছে। ডলফিনরা ঠিক কী কারণে এমন লাফ দেয়, বিজ্ঞানীরা তা এখনো নিশ্চিতভাবে জানেন না। তবে এই প্রাণীগুলো কেন পানির ওপরে উঠে আসে, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের বেশ কিছু ধারণা আছে। কারণ যাই হোক, ডলফিনের লাফিয়ে ওঠার দৃশ্যটি সত্যিই দেখার মতো। কিন্তু ডলফিনের এই স্বভাবের পেছনে কোন কোন কারণ রয়েছে?
ডলফিন কীভাবে পানি থেকে লাফ দেয়
কেন এমন করে তা জানার আগে জানতে হবে কীভাবে এরা এই কাজটি করে থাকে। মাঝেমধ্যে ডলফিনকে পানি থেকে অনেক উঁচুতে লাফিয়ে উঠতে দেখে অবাক হয়ে ভাবি, এরা এটা কীভাবে করে? আসলে ডলফিনরা এদের শক্তিশালী লেজ বা ফ্লুক ব্যবহার করে খুব দ্রুতগতিতে পানির ওপরের দিকে নিজেদের ঠেলে দেয়।
পানির নিচ থেকে অনেক দূর পর্যন্ত দ্রুতবেগে সাঁতার কেটে এরা প্রয়োজনীয় গতি অর্জন করে। আর তারপর সজোরে লেজ দিয়ে পানিতে ধাক্কা দিয়ে ওপরে উঠে আসে। ডলফিনের এই বিশেষ আচরণকে বিজ্ঞানীরা বলেন ব্রেচিং।
লাফ দেওয়ার সময় ডলফিন সাধারণত প্রায় সোজা হয়ে ওপরের দিকে ওঠে। যাতে এদের কম শক্তি খরচ হয়। আর যখন এরা পানির নিচে থাকে, তখন এদের বুকের দিকের ফ্লিপার বা পাখনাগুলো ব্যবহার করে চলাফেরা ও দিক পরিবর্তন নিয়ন্ত্রণ করে।
এখন মনে হতে পারে ডলফিন কত উঁচুতে লাফ দিতে পারে? যদি কখনো ডিসকভারি বা ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক চ্যানেল দেখে থাক, তবে হয়তো আন্দাজ করতে পারবে। এরা বাতাস বা শূন্যে প্রায় ২৫ ফুটের বেশি উচ্চতায় লাফ দিতে পারে। শুধু তাই নয়, লাফ দেওয়ার সময় এরা চমৎকারভাবে শরীর ঘোরানো বা ডিগবাজি খাওয়ার মতো অনেক শারীরিক কসরতও দেখাতে পারে।
ডলফিন কেন পানি থেকে লাফ দেয়
ডলফিন কেবল আনন্দের জন্য লাফালাফি করে না। বরং অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ কারণে এরা এটা করে থাকে। চলো জেনে নিই ডলফিনরা কেন এমনটা করে।
চারপাশ ভালো করে দেখা
পানির ওপর থেকে ডলফিন চারপাশের পরিবেশ পাখির চোখের মতো পরিষ্কার দেখতে পায়। একে বলা হয় স্পাই হপিং। এর মাধ্যমে এরা শিকারের খোঁজ করে কিংবা কোনো বিপদ বা শিকারি আসছে কি না, তা দেখে নেয়।
নিজেদের অবস্থান জানানো
ডলফিন সাধারণত দলবদ্ধ বা পড হয়ে চলে। ডলফিন পডে সাধারণত ২ থেকে ৩০টি ডলফিন থাকতে পারে। সমুদ্রের বিশাল অঞ্চলে কোনো ডলফিন যদি দলছুট হয়ে যায়, তখন সেটা লাফ দিয়ে নিজের অবস্থান বাকিদের জানান দেয়। এই বিশেষ কৌশলকে বলা হয় বিচ কাস্টিং।
একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ
ডলফিন খুব বুদ্ধিমান। শিস বা কিচিরমিচির শব্দ ছাড়াও এরা লাফিয়ে পড়ে পানির ওপর সজোরে শব্দ তৈরি করে দূরবর্তী সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। এমনকি দলের নেতা বা আলফা ডলফিন এর আধিপত্য বোঝাতেও এভাবে বাতাসে লাফ দেয়।
শরীর পরিষ্কার রাখা
স্তন্যপায়ী প্রাণী হওয়ায় ডলফিনের শরীরে অনেক সময় পরজীবী বা ছোট সামুদ্রিক পোকা আটকে যায়। এদের থেকে বাঁচতে এরা সজোরে লাফ দেয় এবং পানিতে আছড়ে পড়ে। বাতাসের ঝাপটা আর পানির তীব্র ধাক্কায় পরজীবীগুলো এদের শরীর থেকে খসে পড়ে।
শক্তি সঞ্চয় ও দ্রুত চলা
পানির চেয়ে বাতাস প্রায় ৭৮৪ গুণ কম ঘন অর্থাৎ অনেক বেশি হালকা। তাই দীর্ঘ দূরত্ব দ্রুত পাড়ি দিতে ডলফিন পানি থেকে লাফ দিয়ে বাতাসে ভেসে চলে। এতে পানির বাধা এড়ানো যায় এবং এদের শক্তিও কম খরচ হয়।
শ্বাস নেওয়া
ডলফিন মাছ নয়, এরা আমাদের মতো স্তন্যপায়ী। তাই এদের শ্বাস নেওয়ার জন্য বাতাসের অক্সিজেন প্রয়োজন। পানির ওপর লাফিয়ে উঠে এরা মাথার ওপর থাকা ছিদ্র বা ব্লোহোল দিয়ে দ্রুত শ্বাস নিয়ে নেয়।
শরীর ঠান্ডা রাখা
অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীর মতো, ডলফিনও উষ্ণ রক্তের। ডলফিনের শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা মানুষের মতোই প্রায় ৯৭ থেকে ৯৯ ডিগ্রি ফারেনহাইট। সাঁতার কাটার সময় এদের শরীরে প্রচুর তাপ উৎপন্ন হয়। এই অতিরিক্ত তাপ ছেড়ে দিয়ে শরীর ঠান্ডা রাখতে এরা বাতাস ও পানিতে লাফঝাঁপ দেয়।
নিছক আনন্দ ও খেলাধুলা
সবকিছুর শেষে ডলফিন খুবই আমুদে প্রাণী। এরা কেবল মজা করার জন্য কিংবা নৌকা বা মানুষের সঙ্গ উপভোগ করতেও লাফ দেয়। এই লাফালাফি এদের বুদ্ধিমত্তা ও প্রাণোচ্ছল স্বভাবেরই বহিঃপ্রকাশ।
কখন দেখা যায় ডলফিনের এই খেলা
ডলফিনের এই লাফালাফি বছরের নির্দিষ্ট কোনো সময়ে সীমাবদ্ধ নয়। সমুদ্রের শান্ত ও পরিষ্কার পানিতে এদের বেশি দেখা যায়। সাধারণত ভোরের দিকে বা সূর্যাস্তের সময় যখন পানি কিছুটা শান্ত থাকে, তখন ডলফিন বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে। তবে খাবারের খোঁজে বা দলবেঁধে চলার সময় দিনের যেকোনো সময়ই এরা এমন লাফ দিতে পারে। বিশেষ করে যখন সমুদ্রের ঢেউ কম থাকে ও চারপাশ শান্ত থাকে, তখন ডলফিনের এই চমৎকার দৃশ্যগুলো সবচেয়ে ভালো দেখা যায়।
বাংলাদেশেও প্রচুর ডলফিন আছে। সুন্দরবন ও বঙ্গোপসাগরের সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড এলাকায় অনেক ইরাবতী ডলফিন বাস করে। এটি সারা বিশ্বের মধ্যে ইরাবতী ডলফিনের অন্যতম প্রধান আশ্রয়স্থল। এ ছাড়া আমাদের দেশের হালদা ও পদ্মা নদীতেও ডলফিন দেখা যায়। তবে এই ডলফিনগুলো একটু আলাদা। এগুলো হলো বিপন্ন গাঙ্গেয় ডলফিন, যাদের আমরা স্থানীয় ভাষায় শুশুক নামে চিনি।