এবার চিলির স্কুলে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ

স্কুলে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ করেছে চিলিছবি: ফোন লকার

২০২৫ সালের ডিসেম্বরে চিলির সংসদে একটি নতুন আইন পাস হয়। সেই আইন অনুযায়ী, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ক্লাসরুমে মোবাইল ফোন ও অন্যান্য স্মার্ট ডিভাইস ব্যবহার করা যাবে না। ২০২৬ সালের শিক্ষাবর্ষের শুরু থেকেই সারা দেশে এ নিয়ম কার্যকর করা শুরু হয়েছে।

আইনটি বিপুল সমর্থনে পাস হয়েছে এবং এখন দেশটির রাষ্ট্রপতি গ্যাব্রিয়েল বোরিক আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছেন। নতুন এই নিয়ম অনুযায়ী, প্রাক্‌–বিদ্যালয় থেকে শুরু করে মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা ক্লাসের সময় মোবাইল ফোন বা ইন্টারনেটে যুক্ত কোনো ডিভাইস ব্যবহার করতে পারবে না। স্কুলগুলোকে এই নতুন নিয়ম মেনে চলার জন্য চলতি বছরের মাঝামাঝি পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে সব স্কুলকে তাদের নিজস্ব নিয়মকানুন আপডেট বা পরিবর্তন করে নিতে হবে।

চিলির শিক্ষামন্ত্রী নিকোলাস ক্যাটালডো এই নতুন নিয়মকে একটি বড় সাংস্কৃতিক পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন। তাঁর মতে, ‘এখন প্রযুক্তির যুগ। আমরা এমনটা করে শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তি থেকে দূরে রাখছি না। এই নিষেধাজ্ঞার মূল লক্ষ্য হলো শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় মনোযোগ বাড়ানো। এ ছাড়া ভালো ফলাফল ও মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতির জন্যও এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’

আরও পড়ুন

ক্যাটালডো আরও জানান, এ ব্যবস্থার ফলে শিক্ষার্থীরা ক্লাসের অবসরে একে অপরের সঙ্গে কথা বলবে এবং সামাজিকতা শিখবে। দীর্ঘ সময় ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে না থেকে তারা পড়াশোনায় আগের চেয়ে বেশি মনোযোগী হতে পারবে।

তবে এই আইনে কিছু বিশেষ ছাড়ও দেওয়া হয়েছে। জরুরি প্রয়োজনে, শারীরিক কোনো অসুস্থতার কারণে কিংবা পড়াশোনার বিশেষ কোনো কাজে ডিভাইসের প্রয়োজন হলে তা ব্যবহার করা যাবে। কিন্তু সাধারণভাবে ক্লাস চলাকালীন সময়ে স্মার্টফোন ব্যবহার পুরোপুরি নিষিদ্ধ থাকবে।

স্কুলে মোবাইল ফোন ব্যবহারের ওপর কড়াকড়ি আরোপ করা দেশের তালিকায় চিলি নতুন যুক্ত হলো। এর আগে ফ্রান্স, ব্রাজিল, হাঙ্গেরি, নেদারল্যান্ডস, অস্ট্রেলিয়া এবং চীনও একই ধরনের নিয়ম চালু করেছে। এসব দেশ মনে করে, ক্লাসরুমের পরিবেশ ভালো রাখতে এবং শিক্ষার্থীদের সুস্থতার জন্য স্মার্টফোন ব্যবহারের নিয়ম কঠোর করা জরুরি।

আরও পড়ুন

জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ক্লাসে মোবাইল ফোন থাকা মানেই পড়াশোনায় বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটা। ওইসিডি নামক একটি সংস্থার বলছে, চিলির অনেক শিক্ষার্থী নিজেরাই স্বীকার করেছে, মোবাইল ফোনের কারণে তাদের পড়াশোনায় ক্ষতি হয়। সারা বিশ্বের অনেক দেশের শিক্ষাব্যবস্থাতেই এখন এ সমস্যা দেখা যাচ্ছে।

শিক্ষাগত মনোবিজ্ঞান বা এডুকেশনাল সাইকোলজির গবেষণাগুলো বলছে, ক্লাসে ডিজিটাল ডিভাইসের ব্যবহার কমালে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতা বাড়ে। এতে কোনো কিছু মনে রাখার ক্ষমতা অর্থাৎ, ওয়ার্কিং মেমোরি উন্নত হয় এবং পরীক্ষার ফলাফলও ভালো হয়। মূলত এ কারণেই চিলির মতো দেশগুলো স্কুলে স্মার্টফোন নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

নতুন এই আইন মেনে চলতে স্কুলগুলোকে তাদের নিজস্ব নিয়মকানুন পরিবর্তন করতে হবে। অনেক স্কুলে শিক্ষার্থীরা ক্লাসে প্রবেশের সময় মোবাইল একটি নিদিষ্ট স্থানে রেখে দেয়। ক্লাস শেষে মোবাইল নিয়ে বাড়িতে যায়। ক্লাসে কোনো মোবাইল ব্যবহার করতে পারে না। নতুন এই নিয়ম নিয়ে অভিভাবকেরাও বেশ খুশি।

আরও পড়ুন

যদিও এই নিয়ম মূলত ক্লাসের সময়ের জন্য তৈরি, কিন্তু অনেক স্কুল এখনই আরও বড় পদক্ষেপ নিচ্ছে। কিছু স্কুল পরীক্ষামূলকভাবে এমন প্রযুক্তি ব্যবহার করছে, যাতে স্কুলের ভেতরে ফোনের সিগন্যাল কাজ না করে। আবার অনেক স্কুলে ফোনমুক্ত সময় চালু করা হচ্ছে, যাতে শিক্ষার্থীরা ফোনের পেছনে সময় নষ্ট না করে একে অপরের সঙ্গে কথা বলে এবং একে অপরের প্রতি বন্ধুত্বপূর্ণ মনোভাব বাড়ে।

চিলির এই সিদ্ধান্ত আসলে বিশ্বজুড়ে চলা একটি বড় পরিবর্তনের অংশ। বর্তমানে শিক্ষক ও নীতিনির্ধারকেরা নতুন করে ভাবছেন যে পড়াশোনার ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার কতটুকু হওয়া উচিত। স্মার্টফোনের কারণে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ কমে যাওয়া এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর খারাপ প্রভাব পড়ার বিষয়টি এখন বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই অনেক দেশই এখন চেষ্টা করছে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে, যেখানে প্রযুক্তির সুবিধাগুলোও থাকবে আবার শিক্ষার্থীরা পড়াশোনায় গভীর মনোযোগ দিতে পারবে।

সূত্র: রয়টার্স, ফোন লকার

আরও পড়ুন