শরৎ এলেই কাশফুল এত বেশি ফোটে কেন

শরৎ এলেই বাংলাদেশে দেখা যায় সারি সারি সাদা কাশফুলছবি: লেখক

এখন অক্টোবরের মাঝামাঝি। নীল আকাশে সাদা মেঘ, আর নদীর চর, খোলা মাঠ কিংবা রাস্তার পাশের জমিতে সারি সারি সাদা কাশফুল। কয়েক সপ্তাহ আগেও যেখানে শুধু লম্বা সবুজ ঘাস ছিল, সেখানে এখন সাদা কাশফুলের বন। কিন্তু এই শরৎকাল এলেই কেন সব কাশগাছে একসঙ্গে এভাবে ফুল ফুটতে শুরু করে?

আসলে ব্যাপারটা পুরোপুরি কাকতালীয় নয়। বছরের এই সময়টা কাশগাছ নিজের মতো করেই বুঝতে পারে।

আমরা যাকে কাশ বলি, তার বৈজ্ঞানিক নাম Saccharum spontaneum। আখের বুনো আত্মীয় এই ঘাস বাংলাদেশে স্বাভাবিকভাবেই জন্মায়। কাশের জীবন এক মৌসুমেই শেষ হয়ে যায় না। মাটির নিচে রাইজোম নামে এর একধরনের কাণ্ড ছড়িয়ে থাকে। দেখতে শিকড়ের মতো হলেও রাইজোম আসলে কাণ্ড। এটি মাটির নিচে চারদিকে বাড়তে থাকে, আর এর বিভিন্ন জায়গা থেকে নতুন নতুন কাণ্ড বের হয়। এ কারণেই নদীর চর বা খোলা জমিতে একবার কাশ জন্মালে ধীরে ধীরে বড় ঝাড় তৈরি হতে পারে। কাশের কাণ্ড সাধারণত দুই থেকে চার মিটার পর্যন্ত উঁচু হয়, কখনো আরও বেশি।

শরতে আমরা যে সাদা কাশবন দেখি, তার প্রস্তুতি কিন্তু শুরু হয় আরও আগে। বর্ষার কয়েক মাস ধরে কাশগাছ বেড়ে ওঠে। নতুন কাণ্ড বের হয়, পাতা বাড়ে, মাটির নিচের রাইজোমও চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। গাছ যথেষ্ট পরিণত হলে একসময় কাণ্ডের মাথায় ফুল তৈরির কাজ শুরু হয়। এত দিন যে অংশ থেকে নতুন পাতা আর কাণ্ড তৈরি হচ্ছিল, সেখানেই এবার ধীরে ধীরে ফুলের গুচ্ছ তৈরি হতে থাকে। তবে সেই ফুল বাইরে থেকে দেখা যেতে আরও কিছুদিন সময় লাগে।

আরও পড়ুন

কাশের ফুল ফোটার সময়ের সঙ্গে বর্ষা শেষ হওয়ার একটা সম্পর্ক বিজ্ঞানীরা অনেক আগেই লক্ষ করেছিলেন। ভারতের কোয়েম্বাটুরে একদল গবেষক ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে সংগ্রহ করা প্রায় ৩৪০টি কাশের ক্লোন নিয়ে ছয় বছর ধরে গবেষণা করেন। তাঁদের গবেষণার ফল প্রকাশিত হয় ১৯৫৯ সালে।

কাশের কাণ্ডের মাথায় থাকা ফুলমঞ্জরির শাখাগুলোয় অসংখ্য ছোট ছোট ফুল থাকে। ছোট ছোট ফুলের গোড়ায় থাকে রেশমের মতো মিহি সাদা লোম
ছবি: লেখক

গবেষণার অংশ হিসেবে কিছু কাশ কোয়েম্বাটুর থেকে অনেক উত্তরের কারনালে নিয়ে গিয়ে পরীক্ষা করা হয়। জায়গা বদলানোর সঙ্গে ফুল ফোটার সময়ও বদলে যাচ্ছিল। উত্তরের দিকে নিয়ে গেলে ফুল আসছিল দেরিতে, দক্ষিণের দিকে আনলে আগে। এই পার্থক্য থেকে গবেষকেরা হিসাব করেন, গাছগুলো নিজেদের আদি জায়গায় থাকলে আনুমানিক কখন ফুল দিত। সেই সময়ের সঙ্গে ওই এলাকায় বর্ষা শেষ হওয়ার সময়ের বেশ ভালো মিল পাওয়া গেল।

এরপর ২০১৭ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত কোয়েম্বাটুরে কাশ নিয়ে আরও বড় একটি গবেষণা হয়। সেখানে ১,৪৫৯টি কাশের নমুনা টানা তিন মৌসুম ধরে পর্যবেক্ষণ করেন বিজ্ঞানীরা। সব কাশ অবশ্য একই সময়ে ফুল দেয়নি। কোনোটায় ফুল এসেছে আগে, কোনোটায় পরে। তবে সবচেয়ে বেশি কাশগাছে ফুল পাওয়া গেছে অক্টোবর মাসেই।

কাশের ফুল আসার সময়ের সঙ্গে বর্ষা শেষ হওয়ার এই মিলের পেছনে দিনের দৈর্ঘ্যেরও বড় ভূমিকা আছে।

গাছের কাছে ঘড়ি বা ক্যালেন্ডার নেই। কিন্তু দিনে কতক্ষণ আলো থাকছে, রাত কতটা লম্বা হচ্ছে, সেই পরিবর্তন অনেক গাছই বুঝতে পারে। দিন-রাতের দৈর্ঘ্য বদলালে গাছের শরীরেও তার প্রভাব পড়ে। এমনকি ফুল ফোটার সময়ও বদলে যেতে পারে। গাছের এই ধরনের প্রতিক্রিয়াকে বলা হয় ফটোপিরিয়ডিজম। জুনের ২১ তারিখের পর থেকে আমাদের দেশে দিন আস্তে আস্তে ছোট হতে থাকে। দিনের দৈর্ঘ্যের এই পরিবর্তন কিছু উদ্ভিদের কাছে ঋতু বদলের খবরের মতো কাজ করে। কাশও তার ব্যতিক্রম নয়।

১৯৭৩ সালে কাশের দুটি ক্লোন নিয়ে এ–সংক্রান্ত একটি পরীক্ষা হয়েছিল। পরীক্ষার ফল বুঝতে হলে কাশফুলের গঠনটা একটু জানা দরকার। কাশের মাথায় আমরা যে বড় সাদা ঝুঁটির মতো অংশ দেখি, সেটা আসলে একটা ফুল নয়। একটা মূল ডাঁটা থেকে অনেক শাখা বের হয়, আর সেই শাখাগুলোয় থাকে অসংখ্য ছোট ছোট ফুল। পুরো অংশটাকে বলা হয় ফুলমঞ্জরি। তবে ফুলমঞ্জরির সব অংশ একসঙ্গে তৈরি হয় না। ধাপে ধাপে তৈরি হয়।

আরও পড়ুন

পরীক্ষায় দেখা গেছে, ফুল তৈরির একেবারে শুরুর ধাপটি সবচেয়ে ভালো এগিয়েছে যখন দিনের দৈর্ঘ্য ছিল ১২ ঘণ্টা ৩০ মিনিট। এরপর ফুলমঞ্জরির শাখা তৈরির সময় দিনের আলো ১৩ ঘণ্টার বেশি থাকলে সেই কাজে বাধা এসেছে। আরও পরের ধাপে, যখন ছোট ছোট ফুল তৈরি হতে শুরু করে, তখন দিনে ৯ থেকে ১১ ঘণ্টা আলো থাকলে সেই কাজটা সবচেয়ে ভালোভাবে এগিয়েছে।

তার মানে অবশ্য এই নয় যে দিনে সাড়ে ১২ ঘণ্টা আলো পেলেই কাশফুল ফুটতে শুরু করবে। গবেষণাটি হয়েছিল কাশের মাত্র দুটি ক্লোন নিয়ে। তাই সব কাশগাছের ক্ষেত্রে একই হিসাব খাটবে, এমনটা বলা যায় না। তা ছাড়া ফুলমঞ্জরি তৈরি হতে শুরু করার পর সেটি বড় হয়ে বাইরে বেরিয়ে আসতেও সময় লাগে। আমরা যখন কাণ্ডের মাথায় সাদা ঝুঁটির মতো কাশফুল দেখি, তার অনেক আগেই কিন্তু ফুল তৈরির কাজ শুরু হয়।

কাশফুল ছুঁয়ে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করছেন এক দর্শনার্থী

বাংলাদেশের শরতের সঙ্গে দিনের দৈর্ঘ্যের এই হিসাবটা বেশ ভালোভাবে মিলে যায়। আগস্টের শেষ থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে দিনের দৈর্ঘ্য সাড়ে ১২ ঘণ্টা থেকে ১২ ঘণ্টার দিকে নেমে আসে। অক্টোবরের শুরুতে সেটা ১২ ঘণ্টারও কম হয়ে যায়। আজ ১৫ অক্টোবর যেমন ঢাকায় দিনের আলো থাকছে প্রায় ১১ ঘণ্টা ৩৭ মিনিট।

তবে দিন ১২ ঘণ্টার নিচে নামল আর সঙ্গে সঙ্গে কাশফুল ফুটে গেল, হিসাবটা এত সহজ নয়। ফুল তৈরির আগের কয়েক সপ্তাহে দিন-রাতের দৈর্ঘ্য কীভাবে বদলেছে, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। এর পাশাপাশি তাপমাত্রা, পানি, আর্দ্রতা এবং গাছ কতটা পরিণত হয়েছে, সেসবেরও প্রভাব আছে।

মজার ব্যাপার হলো, দিনের দৈর্ঘ্যের এই পরিবর্তনের প্রভাব গাছের জিনের কাজেও দেখা যায়। মানুষসহ অন্যান্য প্রাণীর মতো গাছের কোষেও ডিএনএ থাকে। এই ডিএনএতেই থাকে গাছের বংশগত তথ্য। ডিএনএর নির্দিষ্ট কিছু অংশকে বলা হয় জিন। বিভিন্ন জিনের নির্দেশনা মেনে কোষ নানা ধরনের প্রোটিন তৈরি করে। গাছের বেড়ে ওঠা, পাতা গজানো কিংবা ফুল আসার মতো অনেক কাজেই এসব প্রোটিনের ভূমিকা আছে। তবে সব জিন সব সময় সমানভাবে সক্রিয় থাকে না। পরিবেশ বদলালে কোনো কোনো জিনের কাজও কমবেশি হতে পারে।

২০২৬ সালের একটি গবেষণায় বিজ্ঞানীরা FT3 নামে এমনই একটি জিনের দিকে বিশেষভাবে নজর দেন। দিনের দৈর্ঘ্য বদলানোর সঙ্গে কাশগাছে এই জিনের সক্রিয়তাও বদলাতে দেখা যায়। অর্থাৎ গাছটি কখনো এই জিনের তথ্য বেশি ব্যবহার করছে, কখনো কম। চাষের আখের তুলনায় বুনো কাশে জিনটি বেশি সক্রিয় ছিল।

আরও পড়ুন

কিন্তু কোনো জিন বেশি সক্রিয় হলেই যে সেটি ফুল ফোটাতে সাহায্য করছে, তা বলা যায় না। এ জন্য আরও পরীক্ষা দরকার। বিজ্ঞানীরা তাই কাশ ও চাষের আখের FT3 জিন আরাবিডপসিস থালিয়ানা (Arabidopsis thaliana) নামে ছোট একটি উদ্ভিদে বসিয়ে পরীক্ষা করেন। শর্ষে পরিবারের এই গাছটি গবেষণাগারে খুব পরিচিত। দ্রুত বড় হয়, অল্প সময়ে ফুল দেয়, আর এর জিন নিয়ে পরীক্ষা করাও তুলনামূলক সহজ। দেখা গেল, FT3 জিন বসানো গাছগুলো সাধারণ গাছের তুলনায় প্রায় ১৯ দিন আগে ফুল দিয়েছে।

একই গবেষণায় TFL1 নামে আরেকটি জিন নিয়ে পাওয়া গেল উল্টো ফল। এই জিন বসানো গাছগুলোর ফুল বরং দেরিতে এসেছে। অর্থাৎ একটি জিন ফুল আসার সময় এগিয়ে দিতে পারে, অন্যটি পিছিয়ে দিতে পারে। তবে এই পরীক্ষাগুলো সরাসরি কাশগাছে হয়নি। আরাবিডপসিসে পরীক্ষা করে বিজ্ঞানীরা জিনগুলোর ভূমিকা সম্পর্কে আরও ভালোভাবে জানতে পেরেছেন।

এভাবে দিনের দৈর্ঘ্যের পরিবর্তনে গাছের ভেতরে কী ঘটতে পারে, তারও কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়। তবে ফুল আসার সময় শুধু একটি জিন বা দিনের দৈর্ঘ্য দিয়ে ঠিক হয় না। বাইরের পরিবেশ আর গাছের ভেতরের নানা প্রক্রিয়া মিলিয়েই ফুল তৈরির কাজ এগোয়।

বিস্তীর্ণ প্রান্তরে ফুটে আছে শুভ্র কাশফুল

একই কাশবনে অনেক কাণ্ডে কাছাকাছি সময়ে ফুল ফোটার পেছনেও এসবের ভূমিকা থাকতে পারে। পাশাপাশি থাকা কাশগাছগুলো প্রায় একই দৈর্ঘ্যের দিন, একই বৃষ্টি আর একই তাপমাত্রা পায়। আবার মাটির নিচে ছড়িয়ে থাকা একটি রাইজোম থেকেই অনেকগুলো কাণ্ড বের হতে পারে। অর্থাৎ একই ঝাড়ের অনেক কাণ্ড আসলে একই গাছের অংশ হতে পারে। এসব কারণে তাদের ফুল আসার সময়ও কাছাকাছি হতে পারে।

এর মানে অবশ্য সব কাণ্ডে একই দিনে ফুল ফোটে, তা না। কোনো কাণ্ডে আগে, কোনোটায় পরে। কিন্তু কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এত বেশি কাশে ফুল আসে যে আমাদের চোখে মনে হয়, পুরো সবুজ মাঠটা যেন হঠাৎ করেই সাদা হয়ে গেছে।

কেবল এত ফুল একসঙ্গে এলেই অবশ্য কাশবন এমন ধবধবে সাদা দেখাত না। এই সাদা রঙের পেছনে আছে ফুলমঞ্জরির বিশেষ গঠন। কাণ্ডের মাথায় থাকা ফুলমঞ্জরি ২৫ থেকে ৬০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। এর শাখাগুলোয় অসংখ্য ছোট ছোট ফুল থাকে। ছোট ছোট ফুলের গোড়ায় থাকে রেশমের মতো মিহি সাদা লোম। হাজার হাজার এমন লোম একসঙ্গে থাকার কারণেই দূর থেকে কাশবনকে তুলার মতো সাদা দেখায়।

এই লোম শুধু কাশবনকে সুন্দর দেখাতে না, বীজ ছড়াতেও সাহায্য করে। বীজ পেকে গেলে লোমযুক্ত হালকা অংশগুলো বাতাসে ভেসে ছড়িয়ে পড়ে। সেগুলোর সঙ্গেই বীজও পৌঁছে যেতে পারে দূরের কোনো জায়গায়। তবে কাশ শুধু বীজের ওপর নির্ভর করে না। মাটির নিচের রাইজোম, এমনকি কাণ্ডের টুকরা থেকেও নতুন গাছ জন্মাতে পারে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, অক্টোবরের মাঝামাঝি আমরা যে সাদা কাশবন দেখি, সেটা শরতের কয়েক দিনে তৈরি হয়নি। বর্ষার কয়েক মাস ধরে গাছ বেড়ে উঠেছে। দিন ধীরে ধীরে ছোট হয়েছে। আর সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে গাছের ভেতরেও চলেছে ফুল তৈরির প্রস্তুতি।

আমাদের ক্যালেন্ডারে যখন শরৎ আসে, কাশ তার খবর পেতে শুরু করে আরও আগে থেকেই।

আরও পড়ুন