নতুন ভাষা শেখার সময় মস্তিষ্কে কী ঘটে

নতুন কোনো ভাষা শেখার কথা ভাবলেই হয়তো মাথায় একগাদা ব্যাকরণ ও কঠিন শব্দের তালিকা ভেসে ওঠে। নতুন কোনো ভাষার নতুন শব্দ মুখস্থ করতে গিয়ে মাঝেমধ্যেই হয়তো মনে হয়, ম্যাট্রিক্স মুভির মতো মাথায় যদি একটা চিপ লাগিয়ে রাতারাতি ভাষাটা শিখে ফেলা যেত! কিন্তু তুমি কি জানো, নতুন কোনো ভাষা শেখার সময় মাথার ভেতরে সত্যিই দারুণ সব পরিবর্তন ঘটে? মস্তিষ্ক তখন আক্ষরিক অর্থেই আকারে বড় হতে থাকে! চলো, জেনে নিই মস্তিষ্কে আরও কী কী ঘটে।

আমাদের মস্তিষ্কের বাঁ দিকের অংশে ব্রোকাস এরিয়া নামে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি জায়গা আছে। এই অংশটি মূলত আমাদের কথা বলা বা ভাষা তৈরির কাজ নিয়ন্ত্রণ করে। তুমি যখন নতুন কোনো ভাষা শিখতে শুরু করো, তখন তোমার মস্তিষ্কের এই ব্রোকাস এরিয়া এবং এর আশপাশের অংশগুলো আকারে বড় হতে থাকে। শুধু আকারেই নয়, এদের কাজের ক্ষমতাও অনেক বেড়ে যায়। ব্যাপারটা ঠিক জিমে গিয়ে ব্যায়াম করার মতো। তুমি যখন নিয়মিত ওজন তোলো, তখন তোমার হাতের পেশি যেমন বড় ও শক্তিশালী হয়, নতুন ভাষা শিখলে তেমনি ব্রোকাস এরিয়াও ঠিক সেভাবেই শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

তবে বয়সভেদে ভাষা শেখার এই প্রক্রিয়ায় একটা দারুণ পার্থক্য আছে। যারা ছোটবেলা থেকেই একসঙ্গে দুটি ভাষা শিখে বড় হয়, তাদের মস্তিষ্কের কাজ করার ধরন একটু অন্য রকম। শিশুদের মস্তিষ্ক দুটি ভাষাকে একই জায়গায় সাজিয়ে রাখে। অর্থাৎ তাদের মাতৃভাষা এবং দ্বিতীয় ভাষা একই ‘ঘরে’ থাকে। কিন্তু তুমি যদি একটু বড় হয়ে বা বয়স্ক অবস্থায় নতুন কোনো ভাষা শিখতে যাও, তখন মস্তিষ্ক ওই একই ঘরে নতুন ভাষাকে জায়গা দেয় না। বরং মাতৃভাষার জায়গার ঠিক পাশেই নতুন ভাষাটির জন্য সে আলাদা একটি নতুন জায়গা তৈরি করে নেয়!

আরও পড়ুন

তুমি নিশ্চয়ই খেয়াল করেছ, তোমার বন্ধুদের মধ্যে কেউ কেউ খুব দ্রুত নতুন ভাষার উচ্চারণ বা শব্দ শিখে ফেলে। আবার কারও কারও বেশ সময় লাগে। বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে দেখেছেন, এই দ্রুত বা দেরিতে শেখার পেছনেও মস্তিষ্কের আলাদা আলাদা অংশের ভূমিকা আছে। যারা খুব দ্রুত নতুন ভাষা শিখতে পারে, তাদের মস্তিষ্কের হিপোক্যাম্পাস ও ব্রোকাস এরিয়ায় সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন আসে। হিপোক্যাম্পাস হলো আমাদের মস্তিষ্কের স্মৃতিভান্ডার। অন্যদিকে যাদের নতুন ভাষা শিখতে একটু বেশি সময় লাগে, তাদের মস্তিষ্কের মোটর কর্টেক্স নামে অংশে বেশি পরিবর্তন দেখা যায়।

তুমি নতুন ভাষা কতটা সহজে শিখতে পারবে, তা অনেক সময় তোমার মাতৃভাষার ওপরও নির্ভর করে। একটি দারুণ উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা পরিষ্কার হবে। জাপানিদের মাতৃভাষায় R ও L শব্দের আলাদা কোনো উচ্চারণ নেই। তাই একজন জাপানি মানুষ যখন ইংরেজি শিখতে যান, তখন তিনি R ও L-এর মধ্যে পার্থক্য করতে গিয়ে বেশ ঝামেলায় পড়েন। কারণ, ছোটবেলা থেকে এই দুটি ধ্বনি আলাদা করে না শোনার ফলে জাপানিদের মস্তিষ্কে এই দুটি শব্দ শোনার পর একই জায়গা সক্রিয় হয়। কিন্তু যাদের মাতৃভাষা ইংরেজি বা বাংলা, তাদের মস্তিষ্কে এই দুটি ধ্বনি শোনার সঙ্গে সঙ্গে আলাদা আলাদা অংশ সক্রিয় হয়। তাই আমরা সহজেই ‘র’ এবং ‘ল’-এর পার্থক্য বুঝতে পারি।

নতুন ভাষা শেখা মানে শুধু অন্য দেশের মানুষের সঙ্গে কথা বলতে পারা নয়। এটি তোমার মস্তিষ্ককে রীতিমতো সুপারপাওয়ার এনে দেয়! নতুন ভাষা শিখলে মস্তিষ্কের কাজ করার ক্ষমতা বহুগুণ বেড়ে যায়। স্মৃতিশক্তি অনেক বেশি প্রখর হয়। মস্তিষ্ক অনেক বেশি নমনীয় হয়। ফলে যেকোনো জটিল পরিস্থিতিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়। সৃজনশীলতা বাড়ানোর ক্ষেত্রেও এর জুড়ি মেলা ভার। সবচেয়ে বড় কথা, বয়সকালে মানুষের স্মৃতিভ্রম বা ডিমেনশিয়া নামে যে রোগটি হয়, নতুন ভাষা শেখার অভ্যাস সেই রোগকে অনেক বছর পর্যন্ত দূরে সরিয়ে রাখতে পারে।

তাই সুযোগ পেলেই নতুন ভাষা শিখতে পারো। নতুন ভাষা শেখার মধ্যে কিন্তু আলাদা মজাও আছে। বিশ্বাস না হলে আজই চেষ্টা করে দেখো!

সূত্র: বিবিসি সায়েন্স ফোকাস

আরও পড়ুন