পাকস্থলীর অ্যাসিড যদি ধাতু গলাতে পারে, তবে পেট কেন গলে যায় না

আমাদের পাকস্থলীতে রয়েছে হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড, যা অত্যন্ত শক্তিশালী ও ক্ষয়কারী একটি রাসায়নিক। এই অ্যাসিড এতটাই তীব্র যে এটি লোহা বা ইস্পাতের মতো ধাতু গলিয়ে ফেলতে পারে। শরীরের অন্য কোথাও বা চামড়ার ওপর এই অ্যাসিড লাগলে মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। মূলত হজমে সাহায্য করা এনজাইমগুলোকে সক্রিয় করতে ও খাবারের সঙ্গে আসা ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া মেরে ফেলতেই আমাদের পেট এই অ্যাসিড তৈরি করে। কিন্তু অবাক করা বিষয় হলো, এই তীব্র অ্যাসিড পাকস্থলীর নিজের টিস্যুগুলোকে পুড়িয়ে বা গলিয়ে ফেলে না।

কেন নিজের অ্যাসিডে নিজেই গলে যায় না পাকস্থলী

আমাদের পাকস্থলীতে থাকা অ্যাসিডের পিএইচ (pH) মাত্রা ০ দশমিক ৮ পর্যন্ত নামতে পারে, যা যেকোনো প্রাণীর টিস্যু নিমেষেই গলিয়ে ফেলার জন্য যথেষ্ট এবং সুযোগ পেলে এই অ্যাসিড আমাদের পাকস্থলীকেই হজম করে ফেলত। কিন্তু শরীরের ভেতর এক অদ্ভুত সুরক্ষাব্যবস্থা আমাদের এই বিপদ থেকে বাঁচিয়ে রাখে। এই রক্ষাকবচ আর কিছুই নয়, আমাদের শরীরেরই তৈরি প্রচুর পরিমাণ শ্লেষ্মা বা মিউকাস।

এই মিউকাস মূলত মিউসিন নামক একধরনের প্রোটিন ও বিশেষ কিছু অণু দিয়ে তৈরি। এই মিশ্রণ মিউকাসকে এত আঠালো ও পিচ্ছিল করে তোলে যে পাকস্থলীর হজমকারী এনজাইমগুলো একে ভাঙতে পারে না। পাকস্থলীতে এই মিউকাস দুটি স্তরে থাকে। একটি স্তর আঠার মতো পাকস্থলীর দেয়ালে লেগে থেকে বর্মের কাজ করে। আর অন্য স্তরটি জেলের মতো আলগা থাকে। যেখানে আমাদের শরীরের জন্য উপকারী ভালো ব্যাকটেরিয়াগুলো বাস করে।

আরও পড়ুন

পাকস্থলীর প্যারিটাল কোষ থেকে যখন এই তীব্র অ্যাসিড বের হয়, তখন তা অন্যান্য তরলের সঙ্গে মিশে কিছুটা পাতলা হয়ে ১ থেকে ৩ পিএইচ মাত্রায় পৌঁছায়। পাকস্থলীর দেয়ালের মিউকাস স্তরটি এই অ্যাসিডের সামনে দেয়াল হয়ে দাঁড়ায়, যাতে অ্যাসিড সরাসরি শরীরের টিস্যুতে স্পর্শ করতে না পারে। শুধু বাধা দেওয়াই এর কাজ, এমন নয়। এই মিউকাসে থাকে বাইকার্বোনেট, যা অ্যাসিডের তীব্রতাকে প্রশমিত করতে পারে। অনেকটা বুক জ্বালাপোড়া ওষুধের মতো এটি প্রাকৃতিক উপায়েই আমাদের পেটের ভেতর সুরক্ষা দেয়।

পাকস্থলীর সুরক্ষাকবচ হলো মিউকাস

পেটের ভেতর যখন মিউকাসের দেয়াল ভেঙে যায়

পাকস্থলীর সুরক্ষাকবচ হলো মিউকাস। তবে এই মিউকাস স্তর কিন্তু সব সময় পাকস্থলীকে বাঁচাতে পারে না। কিছু ক্ষতিকর পরজীবী ও ব্যাকটেরিয়া আছে, যারা খুব কৌশলে এই মিউকাসের স্তরটিকে দুর্বল করে দেয়। একবার সুরক্ষার এই দেয়াল ভেঙে গেলে ব্যাকটেরিয়াগুলো সরাসরি পাকস্থলীর টিস্যুতে ঢুকে পড়ে। এর ফলে পাকস্থলীতে মারাত্মক প্রদাহ বা জ্বালাপোড়া হয় এবং গ্যাস্ট্রিক রোগের সৃষ্টি হয়।

সমস্যা যখন আরও বেড়ে যায়, তখন পাকস্থলীর দেয়ালে আলসার বা ক্ষতের সৃষ্টি হয়। এই ক্ষত যদি কোনো রক্তনালির কাছে পৌঁছায়, তবে শরীরের ভেতরেই রক্তপাত শুরু হতে পারে। সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি হয় তখন, যখন আলসার পাকস্থলী ফুটো করে দেয়। এর ফলে তীব্র অ্যাসিড পেটের গহ্বরে ছড়িয়ে পড়ে এবং পেরিটোনাইটিস নামক মারাত্মক ইনফেকশন তৈরি করে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে একটি জরুরি অবস্থা হিসেবে দেখা হয়। শুধু আলসার নয়, আমাদের শরীরের এই হজমকারী অ্যাসিড মাঝেমধ্যে অন্য উপায়েও পাকস্থলী থেকে বেরিয়ে এসে যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

আরও পড়ুন
আমাদের পাকস্থলীতে হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড থাকে

যখন ছাড়িয়ে যায় পেটের অ্যাসিড

যাঁরা মাঝেমধ্যেই বুক জ্বালাপোড়া বা অ্যাসিড রিফ্লাক্সের সমস্যায় ভোগেন, তাঁরা ভালোভাবেই জানেন পাকস্থলীর অ্যাসিড খাদ্যনালিতে উঠে এলে কতটা অস্বস্তি হয়। আমাদের পাকস্থলী ও খাদ্যনালির মধ্যে ইসোফেজিয়াল স্ফিংক্টার নামের একটি বিশেষ ভাল্‌ভ থাকে। এর কাজ হলো পেটের খাবারকে আবার ওপরের দিকে উঠতে বাধা দেওয়া। কিন্তু অনিয়মিত জীবনযাপনের ফলে এই ভাল্‌ভ দুর্বল হয়ে পড়ে। তখন পাকস্থলীর সেই তীব্র অ্যাসিড বাঁধ ভেঙে ওপরে উঠে আসে। খাদ্যনালির নরম টিস্যুগুলোকে পুড়িয়ে দেয়, যা বুক জ্বালাপোড়া হিসেবে অনুভব হয়।

তাই শ্লেষ্মা বা মিউকাস শব্দটিকে সাধারণ বা তুচ্ছ ভাবার কোনো সুযোগ নেই। এই আঠালো পদার্থটিই শরীরের ভেতরে এক অদৃশ্য দেয়াল হয়ে আমাদের প্রতিদিন রক্ষা করছে। এই পিচ্ছিল সুরক্ষা স্তরটি না থাকলে আমাদের শক্তিশালী অ্যাসিড নিজেদের শরীরকেই পুড়িয়ে দিত।

সূত্র: আইএফএল সায়েন্স
আরও পড়ুন