ব্রাশ করার পর কমলার জুস বিস্বাদ লাগে কেন
সকালে তাড়াহুড়া করে দাঁত ব্রাশের পর ভুলে কমলার জুস খেয়েছ কখনো? যারা খেয়েছ, তারা জানো নিশ্চয়ই, জুসটা কেমন বিস্বাদ লেগেছে! জুস হওয়ার কথা ছিল মিষ্টি, কিন্তু হয়ে গেছে কেমন যেন তিতা। স্বাদও কেমন অদ্ভুত, একদম ভালো লাগে না। কেন এমন হয়?
এর জন্য দায়ী হলো টুথপেস্ট। আমরা দাঁত ব্রাশ করি দাঁত পরিষ্কারের জন্য। কিন্তু টুথপেস্টে এমন একধরনের উপাদান থাকে, যেটা আসলে ডিটারজেন্টের মতো কাজ করে। ডিটারজেন্ট যেমন তেল-চিটচিটে জিনিস পরিষ্কার করে, টুথপেস্টও ঠিক তা–ই করে।
আমাদের জিহ্বার ওপর ছোট ছোট অংশ আছে, এগুলোকে বলে টেস্ট বাড। এই টেস্ট বাড দিয়েই আমরা স্বাদ বুঝি। কোনো খাবার মিষ্টি নাকি নোনতা, টক নাকি তিতা, তা এই টেস্ট বাডের সাহায্যেই আমরা বুঝতে পারি। জিহ্বার এই টেস্ট বাডের গায়ে একটা পাতলা আবরণ থাকে। এই আবরণ তৈরি হয় চর্বি দিয়ে।
টুথপেস্টে থাকা ডিটারজেন্ট–জাতীয় উপাদান এই চর্বির স্তরকে সাময়িকভাবে এলোমেলো করে দেয়। এতে টেস্ট বাড ঠিকভাবে কাজ করতে পারে না। তবে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। কয়েক মিনিটের মধ্যে সম্পূর্ণ জিনিস আবার ঠিক হয়ে যায়।
কিন্তু এই কয়েক মিনিটের মধ্যেই তুমি কমলার জুস খেলে বিপদ। আরেকটু গভীরে গিয়ে বিষয়টা বোঝা দরকার। আমাদের জিহ্বায় অনেক রিসেপ্টর থাকে। মিষ্টি স্বাদ আমাদের ভালো লাগে, কারণ শরীরের শক্তির জন্য চিনি দরকার। আর তিতা স্বাদ আমাদের ভালো লাগে না, কারণ প্রকৃতিতে বেশির ভাগ বিষাক্ত জিনিসের স্বাদ তিতা। তাই তিতা মানেই শরীরের জন্য একটা সতর্কসংকেত।
আমাদের শরীরের কোষগুলো একটা ঝিল্লি দিয়ে ঘেরা থাকে। এই ঝিল্লি তৈরি হয় ফ্যাট দিয়ে। মিষ্টি আর তিতা স্বাদ ধরার জন্য কোষগুলোর গায়ে বিশেষ একধরনের অণু থাকে। সেই অণুর নাম জি প্রোটিন-কাপল্ড রিসেপ্টর, সংক্ষেপে বলে জিপিসিআর। কিছু জিপিসিআর শুধু মিষ্টি চিনতে পারে, মিষ্টি ছাড়া অন্য কিছু বুঝতে পারে না। আবার কিছু জিপিসিআর শুধু তিতা খুঁজে বেড়ায়। নোনতা ও টক স্বাদ একটু আলাদা উপায়ে কাজ করে। এগুলো বুঝতে সাহায্য করে আয়ন। আয়ন মানে চার্জযুক্ত কণা।
লবণাক্ত স্বাদের ক্ষেত্রে এই আয়ন হলো সোডিয়াম আয়ন। আমরা যখন লবণ খাই, তখন এই সোডিয়াম আয়ন টেস্ট বাডের ভেতর ঢুকে মস্তিষ্ককে জানায়, ‘এটা নোনতা’। টক স্বাদের ক্ষেত্রে কাজ করে হাইড্রোজেন আয়ন। সব অ্যাসিডেই এই হাইড্রোজেন আয়ন থাকে। তাই টক মানেই অ্যাসিডিক।
এখন প্রশ্ন হলো, কমলার জুসে কী আছে? একদিকে প্রচুর চিনি, অন্যদিকে সাইট্রিক অ্যাসিড। এই দুইয়ের মিশ্রণেই কমলার জুস এত ভালো লাগে। কিন্তু দাঁত ব্রাশ করার পর টুথপেস্টের সোডিয়াম লরেল সালফেট ফেনা তৈরি করে। এটাও একধরনের ডিটারজেন্ট। থালা ধোয়ার ডিটারজেন্ট যেমন সব পরিষ্কার করে দেয়; মুখের ভেতরও এটা তেমনই পরিষ্কার করে। সোডিয়াম লরেল সালফেট জিহ্বার টেস্ট বাডের ফ্যাটের স্তরটাকে এলোমেলো করে দেয়। ফলে স্বাদ ধরার ক্ষমতা গুলিয়ে যায়।
এটা কিন্তু শুধু মনগড়া ধারণা নয়, এর প্রমাণও আছে। ১৯৮০ সালে এর একটা পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষায় দেখা যায়, সোডিয়াম লরেল সালফেট ব্যবহারের পর মিষ্টি, নোনতা ও তিতা স্বাদ বোঝার ক্ষমতা কিছুটা কমে গেছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় পরিবর্তন দেখা গেল টক স্বাদের ক্ষেত্রে। সাইট্রিক অ্যাসিডের টক স্বাদের সঙ্গে যুক্ত হলো কড়া তিতা স্বাদ।
এ কারণেই দাঁত ব্রাশ করার পর কমলার জুস খেলে সেটার স্বাদ আর আগের মতো লাগে না। মিষ্টিটা ঠিকভাবে টের পাওয়া যায় না। ফলে টক স্বাদকেই মস্তিষ্ক ভুল করে তিতা মনে করে। তাই ব্রাশ করার পর কমলার জুস থেকে সাবধান!
সূত্র: দ্য কনভার্সেশন