বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু রেলপথ কোনগুলো

এত বেশি উচ্চতার কারণে যাত্রীদের সুরক্ষার জন্য এখানে বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছেছবি: গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস ওয়েবসাইট

ট্রেনে চড়ে ভ্রমণ করার মজাই আলাদা। বিশেষ করে যখন ট্রেন চলে বিশাল কোনো পাহাড়ের গা ঘেঁষে। আর সেই ট্রেন যদি পাহাড় বেয়ে ওপরে উঠতে থাকে, তবে সেই অভিজ্ঞতা হয় একদম অন্য রকম।

পৃথিবীতে এমন কিছু রেলপথ আছে, যা আমাদের দেশের সবচেয়ে উঁচু পাহাড়ের চূড়ার চেয়েও অনেক ওপর দিয়ে চলে। এসব রেললাইন তৈরি করা ও তা টিকিয়ে রাখা কিন্তু সহজ কথা নয়। তুষারপাত, তীব্র ঠান্ডা, প্রচণ্ড বাতাস ও প্রতিকূল আবহাওয়ার মতো প্রাকৃতিক সমস্যাগুলো এখানে একটি ব্যয়বহুল ও কঠিন চ্যালেঞ্জ তৈরি করে।

তা সত্ত্বেও এই রেলপথগুলো প্রতিদিনই দুর্গম অঞ্চলের মানুষের কাছে প্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবা পৌঁছে দিচ্ছে। চলো, তাহলে নিচে তাকালে ভয় লাগা বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু কিছু রেলপথের কথা জেনে নেওয়া যাক।

বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু রেলপথের তালিকায় সবার প্রথমে আসে চীনের কিংহাই–তিব্বত রেলপথ (Qinghai–Tibet Railway)। এ রেলপথটি ১ হাজার ৯৫৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং এর নির্মাণকাজ ২০০৫ সালের অক্টোবরে শেষ হয়। এই লাইনের বেশির ভাগ অংশই সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৪ হাজার মিটার বা ১৩ হাজার ১২৩ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত, যা এটিকে বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু রেলপথ বানিয়েছে।

আরও পড়ুন

এই রেললাইন চীনের কিংহাই প্রদেশের জিংনিং ও তিব্বতের রাজধানী লাসাকে সংযুক্ত করেছে। এর সর্বোচ্চ বিন্দুটি ৫ হাজার ৭২ মিটার বা ১৬ হাজার ৬৪০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত। এই বিশাল রেলপথটিতে মোট ৪৪টি রেলস্টেশন রয়েছে। এদের মধ্যে ৫ হাজার ৬৮ মিটার উচ্চতায় থাকা টাঙ্গুলা মাউন্টেন রেলস্টেশনটি বর্তমানে বিশ্বের সর্বোচ্চ রেলস্টেশন হিসেবে পরিচিত। এই স্টেশন থেকে প্রায়ই মেঘের দেখা পাওয়া যায়।

অবিশ্বাস্য উচ্চতার কারণেই এই রেলপথটিকে ‘পৃথিবীর ছাদ’ (রুফ অব দ্য ওয়ার্ল্ড) বলা হয়। এত বেশি উচ্চতার কারণে যাত্রীদের সুরক্ষার জন্য এখানে বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ২০০৭ সালে জনসাধারণের জন্য পরিষেবা চালু হওয়ার পর থেকে এই ট্রেনের যাত্রীবাহী কামরাগুলো বিমানের কেবিনের মতো চাপযুক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া যাত্রীদের ব্যবহারের জন্য অক্সিজেন মাস্কের ব্যবস্থা আছে। প্রতিকূল আবহাওয়ার মোকাবিলা করে এই ট্রেনগুলো হিমায়িত অঞ্চলে ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটার ও অন্যান্য স্থানে ঘণ্টায় ১২০ কিলোমিটার গতিতে চলাচল করে।

বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রেলপথ হিসেবে ধরা হয় ফেরোক্যারিল সেন্ট্রাল রেলওয়েকে, যা ফেরোক্যারিল সেন্ট্রাল অ্যান্ডিনো নামে একটি কোম্পানি পরিচালনা করে। এই রেলপথ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৫ হাজার ৮৪৩ ফুট বা প্রায় ৪ হাজার ৮২৯ মিটার উঁচু।

আরও পড়ুন

রেললাইনটি পেরুর রাজধানী লিমা ও প্রধান সমুদ্রবন্দর ক্যালাওকে আন্দিয়ান পর্বতমালার ভেতরের শহর সেরো ডি পাসকো ও কেন্দ্রীয় উচ্চভূমি অঞ্চলের আরেক শহর হুয়ানকায়োর সঙ্গে যুক্ত করে।

মূলত ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে এক পোলিশ বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী আর্নেস্ট অ্যাডাম ম্যালিনোস্কির অসাধারণ পরিকল্পনায় এটি ডিজাইন ও তৈরি হয়েছিল। পরে এই লাইনে আরও কিছু উন্নয়ন করা হয়। ১৯৫৫ সালে এই রেললাইনের একটি শাখা ভলকান মাইন পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয়, যা এটিকে ১৫ হাজার ৮৪৩ ফুট উচ্চতায় পৌঁছে দেয়।

পেরুর এই রেলপথটিকে বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক পথগুলোর মধ্যে একটি ধরা হয়। এই পথে রয়েছে মোট ৬১টি সেতু ও ৬৫টি সুড়ঙ্গপথ, যা পাহাড় কেটে তৈরি করা হয়েছে। এই পথগুলো পার হওয়ার সময় একটু অসতর্ক হলেই ভয়ংকর দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির মতো ঘটনা ঘটতে পারে।

বিশ্বের তৃতীয় সর্বোচ্চ রেলপথের তালিকায় আছে বলিভিয়ার রিও মুলাতোস–পোটোসি লাইন। এই রেলপথের সর্বোচ্চ উচ্চতা ১৫ হাজার ৭০২ ফুট বা প্রায় ৪ হাজার ৭৮৬ মিটার। এই রেলপথে একটি বিশেষ স্টেশন রয়েছে, যার নাম কন্ডোর স্টেশন (Condor Station)। এই স্টেশন সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৫ হাজার ৭২ ফুট উঁচুতে অবস্থিত এবং এটিই হলো পশ্চিম গোলার্ধের সবচেয়ে উঁচু রেলস্টেশন।

সূত্র: গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস, ওয়ার্ল্ডঅ্যাটলাস, বিবিসি

আরও পড়ুন