মাইনাসে মাইনাসে কেন প্লাস হয়
গণিতে এমন কিছু নিয়ম আছে, যেগুলো প্রথমবার শুনলে মনে হয়, গণিত বুঝি আমাদের সঙ্গে মজা করছে। যেমন ৩-এর সঙ্গে ৩ যোগ করলে ৬ হয়। ৩ থেকে ৩ বাদ দিলে হয় ০। দুটি বিষয়ই খুব স্বাভাবিক! আবার ৩-কে ২ দিয়ে গুণ করলে ৬ হবে, এতেও অবাক হওয়ার কিছু নেই।
কিন্তু হঠাৎ যদি বলা হয়, ৩ × −৩ = ৯, তখন একটু থমকে যেতে হয়। কী বললে? একটা মাইনাসের সঙ্গে আরেকটা মাইনাস গুণ করা হলো, আর উত্তর হয়ে গেল প্লাস!
ভাবো তো, তোমার কাছে ৩টা আম নেই। মানে আমের হিসাবে তোমার অবস্থা −৩। এবার সেই ‘নেই’-কেই যদি আবার তিনবার নেওয়া হয়, তাহলে কি আম উধাও হওয়ার বদলে ৯টা আম হাজির হয়ে যাবে? বাস্তব জীবনে নিশ্চয়ই এমন হয় না। তাহলে গণিতে এমন অদ্ভুত নিয়ম এল কোথা থেকে?
আসলে এখানে গণিত কোনো জাদু দেখাচ্ছে না, আবার ইচ্ছেমতো কোনো নিয়মও বানিয়ে নেয়নি। মাইনাস সংখ্যাগুলোও সংখ্যার একটি নিয়ম মেনে চলে। সেই নিয়ম ঠিকভাবে অনুসরণ করলেই দেখা যায়, − × − = + হওয়াটা মোটেও অদ্ভুত নয়। বরং অন্যভাবে হলে গণিতের অনেক পরিচিত নিয়মই আর ঠিকমতো কাজ করত না। তাই মাইনাসে মাইনাসে প্লাস হওয়াটা খুব গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু কেন গুরুত্বপূর্ণ, সেই গল্পটাও নিশ্চয়ই জানতে ইচ্ছা করছে! হয়তো আরও জানতে ইচ্ছা করছে, এই নিয়ম কে বানাল। তাহলে চলো, এর রহস্যটা একটু খুলেই বলি।
ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, আজ থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর আগে ভারতের বিখ্যাত গণিতবিদ ব্রহ্মগুপ্ত প্রথম শূন্য (০) এবং ঋণাত্মক সংখ্যার ধারণা পরিষ্কার করেন। তিনি ধনাত্মক সংখ্যাগুলোকে বলতেন সম্পদ এবং ঋণাত্মক সংখ্যাগুলোকে বলতেন দেনা বা ঋণ।
মাইনাসের সঙ্গে মাইনাস গুণ করার বিষয়টা বোঝার জন্য আমরা এই দেনার ধারণা ব্যবহার করতে পারি। একটু ভেবে দেখো, যোগ করা মানে কিছু দেওয়া বা যোগ করা। আর বিয়োগ করা মানে কিছু নিয়ে নেওয়া বা সরিয়ে ফেলা।
ধরো, তুমি তোমার বন্ধুর কাছ থেকে ১০০ টাকা ধার নিয়েছ। ব্রহ্মগুপ্তর ভাষায়, তোমার কাছে এখন -১০০ টাকা আছে এবং এটা তোমার ঋণ। এখন তোমার বড় ভাই এসে তোমার ওপর খুশি হয়ে বলল, ‘তোর ওই ঋণ আমি শোধ করে দেব।’
এর মানে কী দাঁড়াল? তোমার বড় ভাই তোমার ঋণ করা ১০০ টাকা দিয়ে দিল। তোমার বড় ভাই টাকাটা না দিলে তোমার পকেট থেকে ১০০ টাকা দিতে হতো। কিন্তু এখন আর সেটা দেওয়া লাগবে না। মূলকথা হলো, দেনা মানে মাইনাস (-)। আবার সরিয়ে দেওয়া মানেও মাইনাস। অর্থাৎ তোমার ভাই তোমার জীবন থেকে একটা মাইনাসকে মাইনাস করে দিল! ফলাফল কী হলো? ধার থেকে মুক্ত হয়ে তুমি মনে মনে আনন্দে লাফিয়ে বেড়াচ্ছ। তোমার মনে হলো তুমি যেন ১০০ টাকা উপহার পেয়েছ!
দেনা (-) যখন সরিয়ে দেওয়া হয় (-), তখন আমরা আসলে লাভবান হই (+)। বাস্তব জীবনেও দেখবে, শত্রু একটা নেগেটিভ শব্দ। কিন্তু তোমার শত্রুর যে শত্রু, সে কিন্তু তোমার সঙ্গে হাত মেলাবে। অর্থাৎ শত্রুর (-) শত্রু (-) সব সময় বন্ধু (+) হয়!
এবার চলো আরেকটি মজার জিনিস দেখি। ধরো, তুমি একটা বিশাল বড় সোজা রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছ। তোমার পায়ের নিচে লেখা শূন্য (০)। তোমার ডান দিকের রাস্তাটা চলে গেছে পজিটিভ সংখ্যার দেশে (১, ২, ৩, ৪...), আর বাঁ দিকের রাস্তাটা চলে গেছে নেগেটিভ সংখ্যার দেশে (-১, -২, -৩, -৪...)।
তুমি শূন্যের ওপর দাঁড়িয়ে ডান দিকে মুখ করে আছ। এখন কেউ যদি তোমাকে বলে ৩-এর সঙ্গে ২ গুণ করতে, তুমি কী করবে? তুমি ডান দিকে মুখ করেই ২ কদম করে ৩ বার লাফ দেবে। তুমি পৌঁছে যাবে ডান দিকের ৬ নম্বর ঘরে।
এবার কেউ তোমাকে বলল ৩-এর সঙ্গে -২ গুণ করতে। যেকোনো সংখ্যার আগে মাইনাস থাকার জ্যামিতিক অর্থ হলো ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে যাওয়া বা পুরোপুরি উল্টো দিকে ঘুরে দাঁড়ানো!
যেহেতু ২-এর আগে মাইনাস আছে, তুমি প্রথমে ডান দিক থেকে ঘুরে বাঁ দিকে (নেগেটিভ দিকে) মুখ করবে। তারপর ২ কদম করে ৩ বার লাফ দেবে। তুমি পৌঁছে যাবে বাঁ দিকের ৬ নম্বর ঘরে। অর্থাৎ উত্তর হলো -৬।
এই উদাহরণ খুব একটা পছন্দ হলো না! আচ্ছা ঠিক আছে, তাহলে এবার আসল ম্যাজিকটা শুরু করা যাক। কেউ তোমাকে বলল -৩ এর সঙ্গে -২ গুণ করতে। এখানে ৩-এর আগেও মাইনাস আছে, ২-এর আগেও মাইনাস আছে। তাহলে তুমি কী করবে?
প্রথম মাইনাসের জন্য তুমি ডান দিক থেকে ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে বাঁ দিকে মুখ করবে।
কিন্তু এরপর আরও একটা মাইনাস আছে! তাই তুমি বাঁ দিক থেকে আরও ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে যাবে। বাঁ দিক থেকে ১৮০ ডিগ্রি ঘুরলে তুমি আবার কোথায় মুখ করে থাকবে? ঠিক ধরেছ, তুমি আবার ডান দিকে (পজিটিভ দিকে) মুখ করে ফেলবে!
দুটো মাইনাস পরপর আসার মানে, তুমি দুবার উল্টো দিকে ঘুরছ। আর দুবার উল্টো দিকে ঘুরলে মানুষ আবার আগের জায়গাতেই ফিরে আসে। তাই তুমি যখন ডান দিকে মুখ করে ২ কদম করে ৩ বার লাফ দেবে, তুমি পৌঁছে যাবে পজিটিভ ৬-এর ঘরে।
এ জন্যই মাইনাসে মাইনাসে গুণ করলে প্লাস হয়।
কিন্তু এখানেই এই মজার ব্যাপার শেষ করতে চাই না। তাই এ ব্যাপারে তোমাদের আরেকটু জানাতে চাই। এই ব্যাপারও কিন্তু মজার।
আগেই বলেছি, গণিত কোনো পাগলাটে জাদুকর নয় যে যখন যা খুশি তা–ই করবে। গণিত তার নিজের তৈরি নিয়ম ও প্যাটার্ন খুব কঠোরভাবে মেনে চলে। সে কিছুতেই তার নিয়মের বাইরে একচুলও নড়বে না।
এখন আমরা গণিতের সেই প্যাটার্ন ধরে একটা গোয়েন্দাগিরি করব। আমরা ৩-এর ঘরের একটা সাধারণ নামতা পড়ব, তবে একটু ভিন্নভাবে। আমরা ক্রমান্বয়ে নিচের দিকে নামতে থাকব।
৩ × ৩ = ৯
৩ × ২ = ৬
৩ × ১ = ৩
৩ × ০ = ০
খুব মনোযোগ দিয়ে ওপরের প্যাটার্নটা খেয়াল করো। আমরা যখনই বাঁ দিকের গুণফল থেকে ১ কমাচ্ছি, ডান দিকের উত্তর সব সময় ৩ করে কমে যাচ্ছে। ৯ থেকে ৬ হলো, ৬ থেকে ৩ হলো, ৩ থেকে হলো ০। গণিত বলছে, এই প্যাটার্ন কোনোভাবেই ভাঙা যাবে না। তাহলে এরপর কী হবে? শূন্যর চেয়ে ১ কমালে হয় -১। আর ডান দিকের উত্তর শূন্য থেকে আরও ৩ কমে যাবে।
৩ × -১ = -৩
৩ × -২ = -৬
দারুণ ব্যাপার না! আমরা কিন্তু প্রমাণ করে ফেললাম, একটা পজিটিভ ও একটা নেগেটিভ গুণ করলে নেগেটিভ হয়। কিন্তু আমাদের মূল লক্ষ্য হলো মাইনাসে মাইনাসে কী হয়, সেটা দেখা। তাই চলো এবার আমরা -৩–এর ঘরের নামতা পড়ি আর ওপর থেকে নিচের দিকে নামি।
-৩ × ৩ = -৯ (মাইনাসে প্লাসে মাইনাস হয়)
-৩ × ২ = -৬
-৩ × ১ = -৩
-৩ × ০ = ০
এবারও ডান দিকের উত্তরের প্যাটার্নটা খুব ভালো করে খেয়াল করো। -৯ থেকে উত্তর হয়ে গেল -৬। অর্থাৎ উত্তরটা ৩ ঘর বেড়েছে। মনে রাখতে হবে, নেগেটিভ দিকে সংখ্যা ছোট হওয়া মানে মান বেড়ে যাওয়া। এরপর -৬ থেকে আরও ৩ ঘর বেড়ে হলো -৩। তারপর -৩ থেকে আরও ৩ ঘর বেড়ে হলো ০।
অর্থাৎ বাঁ দিকে সংখ্যা ১ করে কমলে ডান দিকের উত্তর ঠিক ৩ করে বাড়ছে। এটাই এই নামতার প্যাটার্ন। গণিত কিছুতেই এই প্যাটার্ন ভাঙতে দেবে না।
তাহলে শূন্যের পরে বাঁ দিকে কী আসবে? আসবে -১।
আর ডান দিকে শূন্যের চেয়ে আরও ৩ বেড়ে যাবে। শূন্যের চেয়ে ৩ বাড়লে কত হয়? প্লাস ৩!
-৩ × -১ = +৩
-৩ × -২ = +৬
-৩ × -৩ = +৯
এটা আরও অন্যভাবেও লেখা যায়। যেমন এখানে আরেকটা উদাহরণ দিই।
−৩ × ০ = ০
কিন্তু ০ লেখা যায় ৩ + (−৩) হিসেবেও। তাই,
−৩ × [৩ + (−৩)] = ০
গুণের বণ্টন সূত্র ব্যবহার করলে—
(−৩ × ৩) + (−৩ × −৩) = ০
অর্থাৎ,
−৯ + (−৩ × −৩) = ০
তাই, −৩ × −৩ = ৯
দেখলে তো! কোনো ম্যাজিক নয়, কোনো জবরদস্তি নয়। গণিত তার নিজের যৌক্তিক প্যাটার্ন ঠিক রাখতে গিয়েই প্রমাণ করে দিল, দুটো মাইনাস সংখ্যা গুণ করলে উত্তরটা লাফ দিয়ে প্লাসের ঘরে চলে আসতে বাধ্য! যদি মাইনাসে মাইনাসে প্লাস না হতো, তাহলে গণিতের পুরো সিস্টেম তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ত।
গণিত আসলে মহাবিশ্বের ভাষা। এটি কোনো রাগী শিক্ষকের তৈরি করা মুখস্থ করার নিয়ম নয়। তুমি যখন একটি স্প্রিংকে টেনে ধরো, স্প্রিংটি উল্টো দিকে তোমাকে টান দেয়। তুমি যখন একটা বল দেয়ালে ছুড়ে মারো, দেয়াল বলটাকে উল্টো দিকে ফিরিয়ে দেয়। প্রকৃতির পরতে পরতে এই যে একটা ভারসাম্য, গণিতের মাইনাসে মাইনাসে প্লাস হওয়াটাও সেই ভারসাম্যেরই একটা গাণিতিক রূপ।
তাই এখন থেকে আর শুধু মুখস্থ কোরো না যে মাইনাসে মাইনাসে প্লাস হয়; বোঝার চেষ্টাও কোরো, কেন প্লাস হয়।