কষ্ট পেলে মানুষ কাঁদে কেন
অন্ধকার ঘর। পা টিপে টিপে হাঁটতে গিয়ে হঠাৎ দরজার চৌকাঠে ধাক্কা লাগল পায়ের কড়ে আঙুলটা। ব্যথায় পুরো শরীর কুঁকড়ে এল। মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হওয়ার আগেই দুই চোখ বেয়ে বেরিয়ে এল নোনাজল। তুমি হয়তো প্রাণপণে কান্না চেপে রাখার চেষ্টা করছ, কিন্তু চোখ কিছুতেই তোমার কথা শুনছে না। টপটপ করে পানি ঝরছেই। দৃশ্যটা খুব সাধারণ, তাই না? ব্যথা পেলে বা কষ্ট পেলে মানুষের চোখ দিয়ে এমনিতেই পানি চলে আসে। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছ, ব্যথা পাওয়ার সঙ্গে চোখের পানি পড়ার সম্পর্ক কী? কষ্ট পেলে আমরা কাঁদি কেন? বিষয়টা বুঝতে হলে একটু বিজ্ঞানের সাহায্য নিতে হবে।
গল্পটা শুরু করা যাক একদম ছোটবেলা থেকে। একটি সদ্যোজাত শিশু যখন পৃথিবীতে আসে, তখন সে কথা বলতে পারে না। তার হাঁটার ক্ষমতা থাকে না, নিজের খাবার নিজে জোগাড় করতে পারে না। এই সম্পূর্ণ অসহায় অবস্থায় শিশুটি তার মা-বাবাকে কীভাবে বোঝাবে যে তার খিদে পেয়েছে বা কোথাও ব্যথা লাগছে? তার একমাত্র হাতিয়ার হলো কান্না।
বিজ্ঞানীদের মতে, শিশুদের এই কান্না হলো একধরনের বিপদের সংকেত। একটি শিশু যখন ব্যথায় বা কষ্টে কাঁদে, তখন সেই শব্দ শুনে মা-বাবা বা কাছের মানুষেরা দ্রুত ছুটে আসেন। তাঁরা শিশুটির সমস্যা দূর করে তাকে আবারও শান্ত করার চেষ্টা করেন। অর্থাৎ ছোটবেলায় আমাদের এই কান্নাটাই হলো বিপদে সাহায্য ডাকার সবচেয়ে বড় এবং একমাত্র উপায়।
এবার একটু বনের পশুপাখিদের দিকে তাকানো যাক। জঙ্গলে দৌড়াতে গিয়ে একটা হরিণ যদি পায়ে তীক্ষ্ণ কোনো ডালের খোঁচা খায়, সে কি সেখানে বসে মানুষের মতো কাঁদতে শুরু করবে? একেবারেই না!
বন্য প্রাণীদের জগতে নিয়মটা খুব নির্মম। সেখানে কষ্ট পেলে বা ব্যথা পেলে তা প্রকাশ করা যায় না। কারণ, ব্যথা বা কষ্ট পাওয়ার মানেই তুমি এখন দুর্বল। আর তুমি দুর্বল মানেই শিকারিদের সহজ লক্ষ্য। একটি আহত প্রাণী যদি যন্ত্রণায় শব্দ করে বা কাঁদে, তবে সেই শব্দ শুনে বাঘ বা সিংহের মতো শিকারি প্রাণীরা বুঝে ফেলবে যে এখানে একটি সহজ শিকার আছে। শুধু তা-ই নয়, নিজের দলের অন্য প্রতিপক্ষরাও সেই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তাকে দল থেকে তাড়িয়ে দিতে পারে। তাই বন্য প্রাণীরা নিজেদের দুর্বলতা লুকানোর জন্য সব সময় ব্যথা ও কষ্ট চেপে রাখে। এটি তাদের টিকে থাকারই একটি আদিম কৌশল।
মানুষের ভেতরেও কিন্তু বন্য প্রাণীদের সেই কষ্ট চেপে রাখার আদিম প্রবৃত্তিটা কিছুটা রয়ে গেছে। আমরা অনেক সময় অন্যের সামনে কাঁদতে চাই না। আমাদের মনে হয়, কাঁদলে হয়তো অন্যরা আমাদের দুর্বল ভাববে। সমাজ বা চারপাশের পরিবেশের কারণে ছেলেদের মধ্যে এই প্রবৃত্তিটা একটু বেশি দেখা যায়। সম্ভবত এ কারণেই মেয়েদের তুলনায় ছেলেরা নিজেদের কান্না বা আবেগ কিছুটা বেশি চেপে রাখে। তাদের মনে অবচেতনভাবেই সেই আদিম প্রবৃত্তি কাজ করে। নিজেকে শক্ত দেখাতে চায়।
কিন্তু অন্যান্য বেশির ভাগ স্তন্যপায়ী প্রাণীর সঙ্গে মানুষের একটা বিশাল পার্থক্য আছে। মানুষ অত্যন্ত সামাজিক জীব। আমরা দল বেঁধে থাকতে পছন্দ করি এবং একে অপরকে সাহায্য করি। হাজার হাজার বছর ধরে প্রকৃতির বুকে মানুষের টিকে থাকার মূল রহস্যই হলো এই একতা।
আদিম যুগের মানুষদের কথা ধরা যাক। বনে-জঙ্গলে বা গুহায় বসবাসের সময় পদে পদে তাদের বিপদের মুখোমুখি হতে হতো। সেই সময় কেউ যদি খুব ব্যথা পেয়ে কাঁদত, তাহলে হয়তো তার আত্মসম্মানে একটু আঘাত লাগত। কিন্তু এই কান্নার ফলে খুব জরুরি দুটি কাজ হয়।
প্রথমত, তোমার কান্না শুনে আশপাশের বন্ধু বা পরিবারের মানুষেরা বুঝতে পারে যে তুমি বিপদে আছ এবং তারা দ্রুত তোমাকে সাহায্য করতে ছুটে আসে। দ্বিতীয়ত, তোমার কান্না অন্যদের সতর্ক করে দেয় যে ওই জায়গায় কোনো বিপদ আছে। হয়তো সেখানে কোনো ধারালো পাথর আছে, কোনো গর্ত আছে বা কোনো হিংস্র প্রাণী লুকিয়ে আছে।
তাই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে প্রকৃতির বুকে টিকে থাকার লড়াইয়ে কান্না জিনিসটা মানুষের জন্য খুবই দরকারি একটি হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছে। এটি আমাদের একে অপরের সঙ্গে জুড়ে রাখে, মায়ায় বাঁধে এবং বড় কোনো বিপদ থেকে বাঁচায়।
সুতরাং ব্যথা বা কষ্ট পেয়ে কাঁদা মোটেও লজ্জার বিষয় না। মনে রাখবে, তোমার এই চোখের জল কোনো দুর্বলতার চিহ্ন নয়; বরং এটি হাজার হাজার বছর ধরে মানুষকে টিকিয়ে রাখা প্রকৃতির এক দারুণ উপহার!