‘ল্যারি দ্য ক্যাট’ কেন বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী ও জনপ্রিয় বিড়াল
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টে পরপর বেশ কয়েকজন প্রধানমন্ত্রী বদল হয়েছেন। একজন প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব নিয়েছেন, আবার কিছুদিন পর নতুন প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব নিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন তাঁদের সবার ঠিকানা হয়েছে লন্ডনের বিখ্যাত ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটে; ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে। রাজনৈতিক পালাবদলে প্রধানমন্ত্রী বদলে গেলেও এই বাসভবনের এক সদস্যের কোনো বদল ঘটেনি। ১৪ বছর ধরে একই পদে দায়িত্ব পালন করে চলেছে সে। ল্যারি নামের একটি বিড়ালের কথা বলছি। এ পর্যন্ত প্রায় ছয়জন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে ল্যারির।
ল্যারি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ে ‘চিফ মাউসার টু দ্য ক্যাবিনেট অফিস’ পদে কাজ করছে। ডাউনিং স্ট্রিটের সরকারি ওয়েবসাইটের একটি বিজ্ঞপ্তিতে বলা আছে, ল্যারিই প্রথম বিড়াল যাকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিফ মাউসারের উপাধি দেওয়া হয়েছিল। চিফ মাউসার অর্থাৎ প্রধান ইঁদুরশিকারি। এই পদের মূল কাজ হলো, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও বাসভবনকে ইঁদুরমুক্ত রাখা। এসব পুরোনো ভবনে ইঁদুরের আনাগোনা কমানোর জন্য ঐতিহ্যগতভাবে বিড়ালকে এই পদে নিয়োগ দেওয়া হয়।
ল্যারি ট্যাবি জাতের বিড়াল। গায়ের রং বাদামি সাদা। ২০১১ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ল্যারি কাজ করেছে ডেভিড ক্যামেরন, টেরেসা মে, বরিস জনসন, লিজ ট্রাস, ঋষি সুনাক ও কিয়ার স্টারমার—মোট ছয়জন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে। তবে ল্যারি কিন্তু যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রীদের ব্যক্তিগত পোষা প্রাণী নয়। ডাউনিং স্ট্রিটের কর্মীরাই ল্যারির দেখাশোনা করেন। আর ল্যারি ডাউনিং স্ট্রিটে আবাসিক কর্মী হিসেবে থাকে। নতুন প্রধানমন্ত্রী ডাউনিং স্ট্রিটে এলে ল্যারি তাঁদের স্বাগত জানায়। আবার বিদায়ও জানায়।
যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন কার্যালয়ে বিড়ালদের দিয়ে ইঁদুর ধরার কাজটা শুরু হয়েছিল ষোড়শ শতাব্দীতে। তখন থেকেই ব্রিটিশ সরকার ইঁদুরশিকারি ও পোষা প্রাণী হিসেবে একটি করে বিড়াল রাখত। তবে বিড়ালদের এই কাজের রেকর্ড পাওয়া যায় ১৯২০ সালের পর থেকে।
ল্যারির আগে আরও অনেক বিড়াল ডাউনিং স্ট্রিটে কাজ করেছে। কিন্তু ল্যারিই প্রথম বিড়াল যাকে ২০১১ সালে ব্রিটিশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ‘চিফ মাউসার’ উপাধি দেয়। অন্য বিড়ালদের সাধারণত ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমই মজা করে এই উপাধি দিত।
২০০৭ সালের জানুয়ারি মাসে জন্ম নেওয়া ল্যারির জীবনের শুরুটা হয়েছিল রাস্তার বিড়াল হিসেবে। পরে ল্যারির ঠিকানা হয় ব্যাটারসি ডগস অ্যান্ড ক্যাটস হোম নামের আশ্রয়কেন্দ্রে। ২০১১ সালে ল্যারিকে দত্তক নিয়ে আনা হয় ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটে। তখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ডেভিড ক্যামেরন। পরিবারের পোষা প্রাণী হিসেবে বড় হতে থাকে ল্যারি। দিন দিন তার চলাফেরা ও স্বভাব সবাইকে বেশ আকর্ষণ করে। দ্রুতই সে সংবাদমাধ্যমের নজর কাড়ে। প্রায়ই তাকে ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটের গেটের সামনে বসে থাকতে অথবা আশপাশে হাঁটাহাঁটি করতে দেখা যায়। ক্যামেরা দেখলেই যেন সে আরও বেশি আকর্ষণীয় ভঙ্গিতে বসে।
২০১৬ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বিদায় নেওয়ার আগে পার্লামেন্টে দেওয়া শেষ ভাষণে ডেভিড ক্যামেরন স্পষ্ট করে বলেছিলেন, ল্যারি কোনো ব্যক্তিগত পোষা প্রাণী নয়, বরং সরকারি চাকরিজীবী। আর এ কারণেই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে যিনিই দায়িত্ব নিন না কেন, ল্যারি ডাউনিং স্ট্রিটেই থাকবে।
তবে ল্যারিকে যে কাজের জন্য রাখা হয়েছে, সে কাজ করতে তাকে খুব কমই দেখা যায়। যুক্তরাজ্য সরকার জানিয়েছে, ল্যারির সরকারি দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে ডাউনিং স্ট্রিটের অতিথিদের অভ্যর্থনা জানানো এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা পরিদর্শন করা। আর বিশ্রাম নেওয়ার মাধ্যমে ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটের পুরোনো আসবাবগুলো পরীক্ষা করা।
‘চিফ মাউসার’ হিসেবে নিযুক্ত হওয়ার পর থেকে ল্যারি আন্তর্জাতিক নেতাদের সঙ্গে বেশ কিছু মজার কাণ্ড ঘটিয়েছে। বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানেরা যখন ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটে আসেন, তখন তাঁদের অভ্যর্থনা জানানোর পাশাপাশি ল্যারি কখনো কখনো এমন কিছু করে বসে যা সংবাদমাধ্যমে শিরোনাম হয়ে ওঠে। ২০১৯ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গাড়িবহর আসার পর ট্রাম্পের লিমোজিনের নিচে আরাম করে ঘুমিয়ে পড়ে ল্যারি। এতে অনেকটা সময় দেরি হয়ে যায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের।
২০২২ সালে দ্য গার্ডিয়ান–এ প্রকাশিত একটি ভিডিওতে ল্যারির সাহসের দেখা মেলে। প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের বাইরে একটি খেঁকশিয়াল ফুটপাত দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল, যা ল্যারির পছন্দ হয়নি। সে তৎক্ষণাৎ শিয়ালটির পিছু নিয়ে তাড়া করে। ল্যারির অতর্কিত আক্রমণে ভয় পেয়ে শিয়ালটি দ্রুত পালিয়ে যায়।
ল্যারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বেশ জনপ্রিয়। এক্স হ্যান্ডলে ‘ল্যারি দ্য ক্যাট’ নামের একটি আন–অফিশিয়াল অ্যাকাউন্টে প্রায় কয়েক লাখ ফলোয়ার আছে ল্যারির। এই অ্যাকাউন্ট থেকে প্রায়ই রাজনৈতিক নানা পরিস্থিতি নিয়ে মজার পোস্ট ও মিম শেয়ার করা হয়। তবে এই পেজ কে চালায়, তা এখনো অজানা।
ল্যারি সম্ভবত ইঁদুর শিকারের দায়িত্বের শেষ পর্যায়ে রয়েছে। শিগগিরই অবসর নেবে সে। কেননা ট্যাবি জাতের বিড়াল সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বাঁচে। ল্যারির বয়স এখন ১৪ বছর, যা অধিকাংশ মানুষের জীবনের বয়স হিসাবে ৭০ বছরের বেশি। ল্যারির মতো লন্ডনের হোয়াইট হলে ফরেন অ্যান্ড কমনওয়েলথ অফিসের (এফসিও) প্রধান ইঁদুরশিকারি হলো ‘পামারস্টন’ নামের আরেকটি বিড়াল। পামারস্টনের সঙ্গে প্রায়ই মারামারি করত ল্যারি। ২০২০ সালে অবসর নেওয়ার আগপর্যন্ত পামারস্টন এই পদে দায়িত্ব পালন করেছে।
সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস, বিবিসি, দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, ফক্স নিউজ