বোতলে ভেসে আসা সবচেয়ে পুরোনো বার্তা কী
আজকাল বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায় নিমেষেই। ইনস্টাগ্রাম বা মেসেঞ্জারে একটা টেক্সট ছুড়ে দিলেই কাজ শেষ! কিন্তু আজ থেকে এক বা দেড় শ বছর আগে ব্যাপারটা এমন ছিল না। তখন তো আর স্মার্টফোন বা ইন্টারনেটের ছড়াছড়ি ছিল না। সাগরের বুকে মাসের পর মাস ভেসে থাকা কোনো জাহাজের নাবিকের যদি ডাঙায় কারও সঙ্গে যোগাযোগের প্রয়োজন হতো, সে কী করত? হয়তো একটা ছোট্ট চিরকুটে মনের কথা লিখে, সেটা একটা কাচের বোতলে পুরে ভাসিয়ে দিত সাগরের নোনা জলে। একে বলে মেসেজ ইন আ বোটল। সাগরের ঢেউয়ে ভাসতে ভাসতে এই বোতলগুলো হয়তো কোনো দিন কারও হাতে পড়ত, অথবা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অজানা জলরাশিতেই রয়ে যেত।
আজ এমনই এক বোতলের গল্প শোনাব, যা সাগরের বুকে ভেসে বেড়িয়েছে দীর্ঘ সময়।
গল্পটা শুরু ২০১৮ সালে। অস্ট্রেলিয়ার ওয়েজ আইল্যান্ডের ঠিক উত্তরের একটা সৈকতে আপন মনে হাঁটছিলেন টনিয়া ইলম্যান নামের এক নারী। নরম বালুর ওপর হঠাৎ তাঁর চোখে পড়ল পুরোনো, অদ্ভুত সুন্দর একটা কাচের বোতল। টনিয়া ভাবলেন, ‘বাহ্! বোতলটা তো বেশ কিউট! এটা আমার বইয়ের তাকের এক কোণায় সাজিয়ে রাখলে দারুণ মানাবে।’ এই ভেবে তিনি সেটা কুড়িয়ে নিলেন। তখনো তিনি ঘুণাক্ষরেও জানতেন না, তিনি আসলে বইয়ের তাক সাজানোর জন্য ইতিহাসের একটা জীবন্ত টুকরা কুড়িয়ে নিয়েছেন!
বাড়িতে ফেরার টনিয়ার পরিবারের এক সদস্য যখন বোতলের ভেতরকার বালি বের করার চেষ্টা করছিলেন, তখনই আসল চমকটা বেরিয়ে এল। বালি নয়, বোতলের ভেতর থেকে বের হলো শক্ত করে পাকানো একটা ছোট্ট কাগজ, যা সুতা দিয়ে যত্ন করে বাঁধা ছিল। চিরকুটটা বেশ ভেজা ও স্যাঁতস্যেঁতে হয়ে গিয়েছিল। খুব সাবধানে সেটাকে শুকানো হলো। কাগজটা খুলতেই দেখা গেল, সেটা একটা ছাপা ফর্ম। তাতে খুব অস্পষ্ট হাতে জার্মান ভাষায় কিছু একটা লেখা!
টনিয়া ও তাঁর স্বামী তো অবাক! তারা ইন্টারনেটে ঘাঁটাঘাঁটি শুরু করলেন। একটু খোঁজ নিতেই তারা আবিষ্কার করলেন, এই বোতলটা জার্মান নৌ মানমন্দিরের বিশাল এক বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার অংশ ছিল। সমুদ্রের পৃষ্ঠের স্রোত কীভাবে কাজ করে এবং কোন দিকে যায়, সেটা বোঝার জন্য তারা টানা ৬৯ বছর ধরে এমন অসংখ্য বোতল সাগরে ভাসিয়েছিল।
ফর্মের গায়ে স্পষ্ট লেখা ছিল বোতলটা ঠিক কবে সাগরে ফেলা হয়েছে, জাহাজের নাম কী, কোন পথে জাহাজটি যাচ্ছিল, এমনকি স্থানাঙ্ক কত ছিল, তা-ও। কাগজের উল্টো পিঠে লেখা ছিল, যে ব্যক্তি এই বোতলটি পাবে, সে যেন বোতল পাওয়ার তারিখ ও জায়গাটা লিখে জার্মান মানমন্দিরে ফেরত পাঠায়।
চিরকুটের তথ্য অনুযায়ী, বোতলটা সাগরে ফেলা হয়েছিল সেই ১৮৮৬ সালে! পাউলা নামে একটি জাহাজ ওয়েলসের কার্ডিফ থেকে ইন্দোনেশিয়ার মাকাসার শহরের দিকে যাচ্ছিল। তখনই কেউ একজন এটা সাগরে ছুড়ে মারে। এরপর ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ান মিউজিয়াম এবং জার্মানির বিশেষজ্ঞরা কাগজ ও হাতের লেখা পরীক্ষা করে পুরোপুরি নিশ্চিত হন, সেটি আসল।
সবচেয়ে রোমাঞ্চকর ব্যাপার কী জানো? ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ান মিউজিয়ামের সামুদ্রিক প্রত্নতত্ত্বের সহকারী কিউরেটর রস অ্যান্ডারসন জানান, জার্মানির আর্কাইভ ঘেঁটে পাউলা জাহাজের ক্যাপ্টেনের মূল লগবুক সত্যিই খুঁজে পাওয়া গেছে। সেখানে ১৮৮৬ সালের ১২ জুনের পাতায় ক্যাপ্টেনের নিজের হাতে স্পষ্ট লেখা ছিল, ওই দিন ঠিক ওই স্থানাঙ্ক থেকেই একটা বোতল সাগরে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল! চিরকুটের লেখার সঙ্গে ক্যাপ্টেনের ডায়েরির লেখা একদম হুবহু মিলে গেল! এর মাধ্যমেই ১৩২ বছর বয়সী এই চিরকুট সবচেয়ে পুরোনো বোতল-বার্তার বিশ্বরেকর্ড গড়ে ফেলল। একটু চিন্তা করে দেখো, এই বোতলটা যখন সাগরে ভাসছিল, তখনো পৃথিবীতে দুটো বিশ্বযুদ্ধ হয়নি, টাইটানিক ডোবেনি, এমনকি রাইট ভাইয়েরা উড়োজাহাজও আবিষ্কার করেননি!
তবে এই রেকর্ডের সিংহাসন কিন্তু বেশ নড়বড়ে। ১৩২ বছরের পুরোনো এই রেকর্ড ভাঙার জন্য এরই মধ্যে আরও দুজন নতুন প্রতিযোগী মাঠে নেমেছে। ২০২২ সালে স্কটল্যান্ডের একটা বাড়ির মেঝের কাঠের তক্তা তুলতেই এক প্লাম্বার একটা বোতল খুঁজে পান, যেটার বয়স নাকি ১৩৫ বছর! আবার সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির এক সৈকতে হালকা নীল রঙের আরেকটা বোতল পাওয়া গেছে, যেটার বয়স তার চেয়েও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে স্কটল্যান্ড ও নিউ জার্সির বোতল দুটোর বয়স এখনো বিজ্ঞানীরা পুরোপুরি নিশ্চিত করতে পারেননি। তাই যাচাই-বাছাই শেষ না হওয়া পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ার সৈকতে কুড়িয়ে পাওয়া ওই ১৩২ বছরের পুরোনো বোতলটাই চ্যাম্পিয়নের মুকুট পরে আছে। কে জানে, হয়তো তুমিও কক্সবাজার বা কুয়াকাটার সৈকতে হাঁটতে গিয়ে এর চেয়েও পুরোনো কোনো বোতল কুড়িয়ে পাবে; যা হয়তো কোনো এক অজানা নাবিকের গল্প বুকে নিয়ে তোমার জন্যই অপেক্ষা করছে!