সাহারা মরুভূমিতে যেভাবে ডাইনোসরের ফসিল খুঁজে পেলাম
জীবাশ্মবিদেরা (জীবাশ্ম নিয়ে গবেষণা করা বিজ্ঞানী) ৪০ ফুট লম্বা একটি তৃণভোজী ডাইনোসরের জীবাশ্ম খুঁজে পেয়েছেন। দিনের মরুভূমির প্রচণ্ড গরম এড়াতে তাঁরা রাতে কাজ করেন।
তাপমাত্রা ৫২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। চারদিকে খাঁ খাঁ বালুচর। পৃথিবীর অন্যতম উষ্ণ ও ভয়ংকর জায়গা সাহারা মরুভূমি। এমন এক মৃত্যুপুরীতে তুমি কী খুঁজবে? পানি নাকি একটুখানি ছায়া?
আমি ও আমার ২০ জন তরুণ ফসিলশিকারির দল সেখানে গিয়েছিলাম ডাইনোসরের খোঁজে! পশ্চিম আফ্রিকার দেশ নাইজারে আমাদের এই অভিযান ছিল আমার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় ডাইনোসর শিকার। তিন মাস ধরে আমরা এই রাস্তাঘাটহীন, জ্বলন্ত মরুভূমির তিনটি আলাদা এলাকায় ফসিলের খোঁজ করব বলে ঠিক করি।
আমাদের পরিকল্পনা ছিল বেশ গোছানো। ঠিক করেছিলাম, যেসব ফসিল আমরা খুঁড়ে বের করব, সেগুলো খুব সাবধানে পরিষ্কার ও গবেষণার জন্য ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোর ফসিল ল্যাবে পাঠাব। এরপর গবেষণা শেষে সেগুলো আবার নাইজারেই ফিরিয়ে আনা হবে, যাতে সেখানকার জাদুঘরে মানুষ এগুলো দেখতে পারে।
সাহারা মরুভূমির একটি পাথুরে শৈলশিরা পেরিয়ে হাঁটছেন জীবাশ্মবিদেরা
এর আগেও আমি নাইজারের এই এলাকাগুলোতে এসেছিলাম। তখন দেখেছিলাম, ধু ধু মরুভূমির মাটি ফুঁড়ে বিশাল সব ডাইনোসরের কঙ্কাল বেরিয়ে আছে! কিন্তু সঙ্গে পর্যাপ্ত লোকজন বা যন্ত্রপাতি না থাকায় তখন শুধু জায়গাগুলোর নাম টুকে রাখা ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না। মনে মনে শুধু এমন একটা অভিযানের স্বপ্ন দেখতাম। এবার আমরা আধুনিক সব সরঞ্জাম নিয়ে পুরোপুরি প্রস্তুত। ফসিল খোঁড়ার কাজটা কিন্তু আগের মতো শুধু হাতুড়ি আর ছেনির ওপর নির্ভরশীল নেই। আমরা এখন পুরোনো আমলের গাঁইতির পাশাপাশি পাললিক শিলা কাটার জন্য ওজনে হালকা কিন্তু ভীষণ শক্তিশালী ইলেকট্রিক জ্যাকহ্যামারও ব্যবহার করি!
সরোপড আইল্যান্ড ও আইপড রহস্য
আমাদের প্রথম গন্তব্য ছিল এমন একটা জায়গা, যার নাম আমরা দিয়েছিলাম সরোপড আইল্যান্ড। এখানে পৌঁছাতেই আমরা বিশাল এক ডাইনোসরের পাঁচটি কঙ্কাল আবিষ্কার করলাম। এগুলো ছিল সরোপড, মানে যাদের গলা অনেক লম্বা হয় এবং যারা লতাপাতা খেয়ে বাঁচে। এরা লম্বায় প্রায় ৫০ ফুটের মতো হতে পারে। আমরা এই নতুন ও নাম না-জানা ডাইনোসর প্রজাতিটির চমৎকার একটা ডাকনাম দিলাম—আইপড।
একজন গবেষক সেই জীবাশ্মের মানচিত্র দেখছেন, যা পল সেরেনো বহু বছর আগে খননকাজ শুরুর সময় এঁকেছিলেন। তখনই তিনি ডাইনোসরের কঙ্কালটি প্রথম দেখতে পান।
আমার ধারণা, এই আইপডরা পৃথিবীতে ঘুরে বেড়াত আজ থেকে প্রায় ১৬ কোটি বছর আগে। তখন সাহারা আজকের মতো এমন শুকনো মরুভূমি ছিল না, বরং এখানে ছিল সবুজে ঘেরা বিশাল বনভূমি ও নদী। এখানে হাড়গোড় খুঁজে পাওয়া মোটেও কঠিন ছিল না। আসল চ্যালেঞ্জ ছিল অন্য জায়গায়। আমাদের হাতে সময় ছিল মাত্র তিন সপ্তাহ। এই অল্প সময়ের মধ্যে এত বিশাল সব হাড় আমরা খুঁড়ে বের করতে পারব কি না, তা নিয়ে দলের অনেকেই সন্দিহান ছিল। কিন্তু আমাদের পরিশ্রম কাজে দিল। আমরা যখন সরোপড আইল্যান্ড থেকে বিদায় নিচ্ছি, তখন আমাদের ট্রাকগুলোয় বোঝাই করা ছিল প্রায় ২৫ টন ফসিল! একবার ভেবে দেখো, একটা আস্ত ময়লার ট্রাক কানায় কানায় পূর্ণ থাকলে যতটা ভারী হয়, আমাদের ফসিলের ওজন ছিল ঠিক ততটাই!
একজন জীবাশ্মবিদ্যার শিক্ষার্থী সোরোপড ডাইনোসরের লেজের হাড় থেকে ধীরে ধীরে মাটি সরাচ্ছেন
লাল হাড়ের খোঁজে
আমাদের দ্বিতীয় গন্তব্যে যাওয়ার রাস্তাটা ছিল আক্ষরিক অর্থেই এক দুঃস্বপ্ন। সাহারার ওই ভয়ংকর গরমে ট্রাক বারবার বালুতে আটকে যাচ্ছিল। চরম রোদের ভেতর বালু খুঁড়ে ট্রাক টেনে তুলতে তুলতে এক দিনের রাস্তা পার হতে আমাদের তিন দিন লেগে গেল! তবে গন্তব্যে পৌঁছানোর পর সব কষ্ট উবে গেল নিমেষেই।
কজন ভূতত্ত্বের শিক্ষার্থী পলির একটি টুকরা খুব কাছ থেকে পরীক্ষা করছেন
চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল ডাইনোসরের হাড়। লাখ লাখ বছর ধরে মাটিতে থাকা আয়রনের কারণে হাড়গুলো একদম লালচে রঙের হয়ে গিয়েছিল। এখানেই আমরা আবিষ্কার করলাম অক্ষত অবস্থায় থাকা একটি ডাইনোসরের পিঠের পাখনা। এটি ছিল ওউরানোসরাস নামে ৩০ ফুট লম্বা একটি লতাপাতাখেকো ডাইনোসরের। এই অদ্ভুত পাখনাটি আসলে কী কাজে লাগত, তা নিয়ে গবেষণা প্রয়োজন। পাখনাটি হয়তো শরীর ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করত বা অন্যকিছু।
হারিয়ে যাওয়া স্পাইনোসরাস
বেশ কয়েক বছর আগের কথা। স্থানীয় এক লোক মোটরসাইকেলে করে আমাদের বালিয়াড়ির মধ্য দিয়ে অনেক দূরের একটা দুর্গম এলাকায় নিয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে আমরা মাংসাশী ডাইনোসরের অদ্ভুত কিছু চোয়ালের হাড় পেয়েছিাম। পরে গবেষণায় জানতে পারি, সেগুলো আসলে ভয়ংকর স্পাইনোসরাসের চোয়াল!
জীবাশ্মের টুকরোগুলোয় লেবেলিং করা হচ্ছে
এবার আমাদের অভিযানের তৃতীয় ও শেষ ধাপে আমরা আবার সেই এলাকায় ফিরে এলাম। হাতে সময় মাত্র দুই সপ্তাহ। এই সময়ের মধ্যে কি আমরা আরও কিছু পাব? অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, আমরা সেখানে বিশাল আকারের মাথার একটি চূড়া খুঁজে পেলাম। চমকের ব্যাপার হলো, এটি স্পাইনোসরাসের সম্পূর্ণ নতুন একটি প্রজাতি!
তিন মাসের এই হাড়ভাঙা খাটুনি আর উত্তপ্ত মরুভূমির রোমাঞ্চ শেষে আমি আমার তরুণ দলকে ডেকে বললাম, ‘সাহারার বুক চিরে আমরা আজ যে আবিষ্কারগুলো করলাম, তা দিয়ে পৃথিবীর ইতিহাসে আমরা আস্ত একটা নতুন অধ্যায় লিখতে যাচ্ছি!’