দাবানল থামাতে ছাগল যেভাবে কাজ করে

চলতি বছর গ্রীষ্মে ইউরোপীয় ইউনিয়নে এক হাজার ৭৫০টিরও বেশি দাবানল লেগেছে। আর প্রতি গ্রীষ্মেই যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া প্রস্তুত হয় দাবানলের মৌসুমের জন্য। তবে আজকাল সেখানে দাবানল ঠেকাতে ব্যবহার করা হচ্ছে ছাগল। কিন্তু ছাগল কি সত্যিই দাবানল প্রতিরোধে সাহায্য করে?

আসলে আমরা যেভাবে ভাবছি, ছাগল সেভাবে সরাসরি আগুন নেভাতে কোনো সাহায্য করে না। তবে সঠিকভাবে ছাগলের পাল ব্যবহার করলে দাবানলের তীব্রতা ও ছড়ানোর ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়। বিভিন্ন গবেষণা ও অগ্নিনির্বাপণ সংস্থাগুলো আসলে কী বলছে এই বিষয়ে?

ফ্রান্স ও স্পেনের বিশাল দাবানল নেভাতে অগ্নিনির্বাপণকর্মীরা বিমান খুঁজে পাচ্ছেন না। এমন সময় জলবায়ুর এই সংকট মোকাবিলায় অভিনব এক সমাধান হয়ে দাঁড়িয়েছে ছাগল ও ভেড়ার দল। শুনতে অবাক লাগলেও ভবিষ্যতে দাবানল ঠেকানোর কাজটা কিন্তু নির্ভর করছে পর্যাপ্ত ছাগল পাওয়ার ওপর।

আরও পড়ুন

বনে বা ঝোপঝাড়ের শুকনা পাতা ও গাছপালা খেয়ে অগ্নিনিরোধক পথ বা ‘ফায়ারব্রেক’ তৈরি করতে তৃণভোজী প্রাণীদের এই ব্যবহার এখন ইউরোপজুড়ে বেশ জনপ্রিয় হচ্ছে। ইউরোপীয় কমিশন ও কৃষকদের বড় বড় সংগঠনগুলোও আনুষ্ঠানিকভাবে এই ধারণাকে মেনে নিয়েছে। স্পেনের বিভিন্ন অঞ্চলে ছাগল ও ভেড়ারা বনের ছোট ছোট ঝোপঝাড় খেয়ে ফেলায় সেখানে আগুন বেশি দূর ছড়াতে পারেনি।

অগ্নিনির্বাপণকর্মীদের মতো মেষপালকদের কাজের গুরুত্বও আমাদের সমানভাবে বোঝা দরকার

উপায়টি খুব জটিল প্রযুক্তিনির্ভর না হলেও এতে কিছুটা খরচ আছে। মেষপালকদের এই কাজে টিকিয়ে রাখতে সরকারি সাহায্যের দরকার পড়ে। তবে অগ্নিনির্বাপণ বিশেষজ্ঞদের মতে বড় সমস্যা অন্য জায়গায়। নেতারা আগুন লাগার পর তা নেভাতে যত টাকা ঢালেন, আগুন যাতে না লাগে সেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থায় ততটা বরাদ্দ দেন না।

স্পেনের দাবানল গবেষণাকারী সংস্থা ‘পাউ কোস্টা ফাউন্ডেশন’-এর প্রধান জর্দি ভেন্ড্রেল। তিনি জানান, অগ্নিনির্বাপণকর্মীদের মতো মেষপালকদের কাজের গুরুত্বও আমাদের সমানভাবে বোঝা দরকার।

এদিকে ফ্রান্সে দাবানল বাড়ায় কৃষকেরা নিজেদের পানির ট্যাংক নিয়ে অগ্নিনির্বাপণকর্মীদের সঙ্গে আগুন নেভানোর কাজে নেমে পড়েছেন। তবে গ্রামে কৃষকের সংখ্যা দিন দিন কমে যাওয়াও এক বড় সংকট।

আরও পড়ুন
বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে জ্বলছে দাবানল। ধোঁয়ায় ঢেকেছে আকাশ। সড়ক দিয়ে এগিয়ে চলেছে একটি গাড়ি। গতকাল স্পেনের আলমেরিয়া অঞ্চলে
রয়টার্স

মানুষ যখন চাষাবাদ ছেড়ে দেয়, তখন সেই পরিত্যক্ত জমিতে ঘাস ও ঝোপঝাড় জমে শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায়। ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার কৃত্রিম উপগ্রহ ‘কোপার্নিকাস’ দেখিয়েছে, বর্তমানে ইউরোপের যেসব জায়গায় বড় দাবানল ছড়াচ্ছে, সেগুলো মূলত এই ধরনের ঝোপঝাড় আর পরিত্যক্ত বনভূমির অংশ।

বনে ছাগল বা গবাদিপশু চরানোর জন্য পর্যাপ্ত চারণভূমি থাকলেও রাখালদের জন্য অর্থনৈতিক লাভ খুব একটা নেই। লাভজনক না হলে তরুণেরা ছাগল পালনে উৎসাহ পাবে না। তাই বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পেশাকে টিকিয়ে রাখতে এবং দাবানলপ্রবণ এলাকা সুরক্ষায় রাখালদের বিশেষ সরকারি তহবিল বা আর্থিক সহায়তা দেওয়া জরুরি।

বনে বা ঝোপঝাড়ের শুকনা পাতা ও গাছপালা খেয়ে অগ্নিনিরোধক পথ বা ‘ফায়ারব্রেক’ তৈরি করতে তৃণভোজী প্রাণীদের এই ব্যবহার এখন ইউরোপজুড়ে বেশ জনপ্রিয় হচ্ছে

কাতালুনিয়ার ‘ফায়ার ফ্লকস’ প্রকল্পের মাধ্যমে সরকারি সহায়তায় ছাগল ও ভেড়ার পালকে বনের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। এই পশুগুলো বনের ছোট ছোট ঝোপঝাড় খেয়ে আগুন ছড়ানোর সুযোগ কমিয়ে দেয়। আবার এসব পশুর দুধ দিয়ে তৈরি পনির ও দই বাজারে বিশেষ লেবেল লাগিয়ে বিক্রি করা হয়, যাতে সাধারণ মানুষও এই উদ্যোগে উৎসাহিত হন। স্পেনের ‘কুসো’ এলাকায় এই কাজের জন্য ব্যবহৃত গরুর মাংসের চাহিদাও এখন সবচেয়ে বেশি।

একসময় বনের আশপাশের জমি অর্থনৈতিক কাজে ব্যবহার করা হতো। কিন্তু এখন তা কমে যাওয়ায় বনের যত্ন নেওয়ার মানুষ নেই। অথচ গবাদিপশু চরানোর মাধ্যমে পরিবেশদূষণ না করেই দাবানল প্রতিরোধ করা সম্ভব।

স্পেনের মাদ্রিদে সম্প্রতি ২৭ হাজার হেক্টর বন পুড়ে যাওয়ার পর সরকার মাত্র ৩ হাজার ৭০০ হেক্টর বনে ছাগল চরানোর পরিকল্পনা নিয়েছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। গবেষকেরা মনে করেন, শুধু ছাগল চরানোই একমাত্র সমাধান নয়। তবে একে বাদ দিয়েও উপায় নেই। কারণ, চারণকারী প্রাণী না থাকলে বনের ঝোপঝাড় বারবার গজিয়ে উঠতেই থাকবে। নেতাদের উচিত কেবল আগুন লাগলে নেভানোর কথা না ভেবে, আগে থেকেই পুরো বনাঞ্চলকে সঠিকভাবে চারণভূমির মাধ্যমে সুরক্ষিত রাখা।

সূত্র: ইউরো পলিটিকো, ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক
আরও পড়ুন