ইনানী জাতীয় উদ্যানে যেভাবে মেঘলা চিতার দেখা মিলল
কক্সবাজারের ইনানী জাতীয় উদ্যান। পাহাড় আর উপকূলের মাঝখানে ছড়িয়ে আছে এই সংরক্ষিত বন। এখানে হেঁটে বেড়ালে হয়তো তোমার চোখে পড়বে গাছ, লতাপাতা, ঝোপঝাড় কিংবা পাখি। কিন্তু বনের ভেতরেই যে মেঘলা চিতার মতো বিরল প্রাণী ঘুরে বেড়াচ্ছে, তা হুট করে বোঝা যাবে না। এবার গবেষণায় জানা গেছে, এই বনে আছে মেঘলা চিতা। শুধু তা-ই না, ইনানীর বনে খুঁজে পাওয়া গেছে মোট ২৩ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী। এর মধ্যে আছে এশিয়ান হাতি, উল্লুক, বেঙ্গল স্লো লরিসসহ বেশ কিছু বিপন্ন প্রাণী।
মেঘলা চিতা খুঁজে পাওয়ার গল্পটা একটু আলাদা। গবেষকেরা বনের ভেতরে ঘুরে ঘুরে প্রাণীটির দেখা পাননি। বরং বনের বিভিন্ন জায়গায় ক্যামেরা বসিয়ে রেখেছিলেন। এই ক্যামেরার সামনে দিয়ে প্রাণী গেলেই ক্যামেরা ছবি তুলে রাখে। এভাবেই ইনানীর বনে মেঘলা চিতার ছবি তোলা হয়েছে। ক্যামেরা ট্র্যাপের পাশাপাশি গবেষণায় ব্যবহৃত হয়েছে প্রাণীর পায়ের ছাপ, বিষ্ঠা, গাছের আঁচড়, সরাসরি দেখা এবং প্রাণীর ডাক শোনার মতো নানা চিহ্ন।
এই গবেষণার প্রধান গবেষক বিপুল কৃষ্ণ দাস। তিনি বাংলাদেশ বন বিভাগের বাংলাদেশ ওয়াইল্ডলাইফ সেন্টারের পরিচালক। পাশাপাশি তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সঙ্গে যুক্ত আছেন। তাঁর সহগবেষক হিসেবে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ ফিরোজ জামান এবং একই বিভাগের গবেষক অর্ণব সাহা। মোহাম্মদ জাসিমউদ্দিন ও বাবলা মহাজান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেসের সঙ্গে যুক্ত আছেন। গবেষক দলের আরেক সদস্য প্রদীপ কুমার সরকার জার্মানির গটিঙ্গেন ইউনিভার্সিটির বন ও প্রকৃতি সংরক্ষণ নীতি বিভাগের সঙ্গে যুক্ত আছেন।
তাঁদের গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে জার্নাল ফর নেচার কনজারভেশনে। গবেষণাপত্রটির নাম বাংলাদেশের খণ্ডিত ক্রান্তীয় বনভূমিতে স্তন্যপায়ী প্রাণীদের টিকে থাকা ও সংরক্ষণের অগ্রাধিকার।
এক বছর ধরে খোঁজ
গবেষণাটি করা হয়েছে ২০২২ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৩ সালের নভেম্বর পর্যন্ত। পুরো বনকে বিভিন্ন এলাকার ভিত্তিতে ভাগ করে গবেষকেরা প্রাণীদের খোঁজ করেছেন। শুরুতে ১১টি পথ বা ট্রানসেক্ট বিবেচনা করা হলেও পরে সাতটি নির্দিষ্ট পথ নিয়মিত জরিপের জন্য বেছে নেওয়া হয়। এসব পথে গবেষকেরা দিনে দুবার হেঁটেছেন। সকাল ৬টা থেকে ১০টা এবং বেলা ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত। কোনো প্রাণী সরাসরি দেখা গেলে সেটি নথিভুক্ত করা হয়েছে। আবার প্রাণী সামনে না থাকলেও এর পায়ের ছাপ, বিষ্ঠা, খাবার খাওয়ার চিহ্ন, গাছের আঁচড় কিংবা ডাক থেকেও প্রাণীর উপস্থিতি বোঝার চেষ্টা করা হয়েছে।
এর পাশাপাশি বনের বিভিন্ন জায়গায় বসানো হয়েছিল স্বয়ংক্রিয় ক্যামেরা। মোট ১৫টি ক্যামেরা ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে ৩২টি জায়গায় ব্যবহার করা হয়। কোনো জায়গায় পশুর চলাচলের পথ বা পানির কাছাকাছি জায়গা থাকলে সেখানে ক্যামেরা বসানো হয়েছে। ক্যামেরায় কোনো টোপ বা খাবার ব্যবহার করা হয়নি। মানে প্রাণীদের স্বাভাবিক চলাফেরার সময় ছবি তোলা হয়েছে।
দীর্ঘ অনুসন্ধানে মোট ২৩ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণীর সন্ধান পাওয়া যায়। ক্যামেরায় ধরা পড়ে ১৯ প্রজাতি। সরাসরি দেখা বা প্রাণীর ডাক শুনে শনাক্ত করা হয়েছে ১৮ প্রজাতি। আবার পায়ের ছাপ, বিষ্ঠা, খাবার খাওয়ার চিহ্নসহ নানা পরোক্ষ চিহ্ন থেকেও ১৮ প্রজাতির উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছে। সব পদ্ধতির তথ্য মিলিয়েই পাওয়া গেছে ২৩ প্রজাতির তালিকা।
যেভাবে মেঘলা চিতার দেখা মিলল
এই ২৩ প্রজাতির মধ্যে সবচেয়ে চমক জাগানো আবিষ্কার মনে হয় মেঘলা চিতা। ইংরেজিতে যাকে বলা হয় ক্লাউডেড লেপার্ড। বিড়াল গোত্রের এই প্রাণী অত্যন্ত বিরল। ইনানীর বনে এর উপস্থিতির কথা আগে শোনা গেলেও এবারই প্রথম গবেষণায় এর ছবি পাওয়া গেল।
ক্যামেরা ট্র্যাপের ছবিতে মেঘলা চিতা ধরা পড়েছে পাঁচবার। শুধু ক্যামেরার ছবিই নয়, পায়ের ছাপ ও বিষ্ঠার মতো চিহ্ন মিলিয়ে আরও ১৩টি আলাদা ঘটনার প্রমাণ পাওয়া গেছে। অর্থাৎ গবেষকেরা বনের বিভিন্ন জায়গায় মেঘলা চিতার উপস্থিতির একাধিক প্রমাণ পেয়েছেন।
তবে এতবার প্রমাণ পাওয়া গেলেও প্রাণীটিকে সহজে দেখা যায়নি। গবেষণার হিসাব বলছে, ইনানীর বনের কোনো নির্দিষ্ট জায়গা ব্যবহার করার সম্ভাবনা মেঘলা চিতার ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে কম। তার ওপর প্রাণীটির ক্যামেরায় ধরা পড়ার সম্ভাবনাও খুব কম। এর একটি কারণ এর স্বভাব। মেঘলা চিতা গোপনে চলাফেরা করে এবং মূলত রাতের বেলায় সক্রিয় হয়। বেশির ভাগ সময় গাছের ওপরে থাকে। তাই বনের ভেতর দিয়ে চলাফেরা করলেও মানুষের চোখে পড়া বা ক্যামেরায় ধরা পড়া সহজ নয়।
শুধু মেঘলা চিতা নয়, আরও প্রাণী আছে
ইনানীর বনে মেঘলা চিতার পাশাপাশি আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রাণীর সন্ধান মিলেছে। রয়েছে এশিয়ান হাতি, পশ্চিমের উল্লুক, বেঙ্গল স্লো লরিস, নর্দার্ন পিগ-টেইলড ম্যাকাক, ক্যাপড ল্যাঙ্গুর ও গ্রেটার হগ ব্যাজার। এ ছাড়া বনবিড়াল, লেপার্ড ক্যাট, বন্য শূকর, বিভিন্ন গন্ধগোকুল, বেজি, শজারু, কাঠবিড়ালি ও ট্রিশ্রুর মতো প্রাণীও পাওয়া গেছে।
গবেষণায় তিনটি প্রজাতিকে বৈশ্বিকভাবে বিপন্ন এবং চারটি প্রজাতিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। মেঘলা চিতাও বৈশ্বিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ প্রাণীর তালিকায় রয়েছে। বাংলাদেশে এর অবস্থা আরও সংকটাপন্ন।
গবেষণার বনের বিভিন্ন ধরনের জায়গা নিয়ে আরেকটি বিষয় জানা গেছে। ইনানীর সব জায়গায় সমানসংখ্যক প্রাণী পাওয়া যায়নি। ঝোপঝাড় ও ছড়িয়ে থাকা গাছের এলাকায় সবচেয়ে বেশি প্রজাতির প্রাণী পাওয়া গেছে। বর্ষাকালে এই বৈচিত্র্য আরও বেশি ছিল। অন্যদিকে বনে যেসব এলাকায় বাগান আছে, সেখানে প্রাণীর বৈচিত্র্য পাওয়া গেছে সবচেয়ে কম।
এর পেছনে বনের পরিবেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। যেখানে গাছপালা, ঝোপঝাড় ও বনের স্বাভাবিক গঠন বেশি রয়েছে, সেখানে প্রাণীদের খাবার ও আশ্রয়ের সুযোগও বেশি। বর্ষাকালে গাছপালায় ফল ও নতুন উদ্ভিদের বৃদ্ধি বাড়ায় প্রাণীদের জন্য খাবারের সুযোগও বাড়ে। ফলে ওই সময় বেশি প্রাণীর উপস্থিতি দেখা গেছে।
বন আছে, কিন্তু ভালো নেই
ইনানী জাতীয় উদ্যানের আয়তন ৭ হাজার ৮৫ হেক্টর। ২০১৯ সালে এটিকে জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা করা হয়। কিন্তু বনটি মানুষের নানা কর্মকাণ্ডের চাপ থেকে মুক্ত নয়। বন উজাড়, পাহাড় কাটা, জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ, কৃষিকাজের বিস্তার এবং বনভূমি দখলের কারণে বনের স্বাভাবিক পরিবেশের অনেকটাই বদলে গেছে। কোথাও প্রাকৃতিক বন ভেঙে ঝোপঝাড়ের এলাকা তৈরি হয়েছে, কোথাও হয়েছে বনবাগান।
মানুষের এই চাপ প্রাণীদের ওপরও প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে যেসব প্রাণী কমসংখ্যায় থাকে, গোপনে চলাফেরা করে বা নির্দিষ্ট ধরনের পরিবেশের ওপর নির্ভরশীল, তাদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন। মেঘলা চিতার মতো প্রাণী তাই বন কতটা ভালোভাবে টিকে আছে, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচকও হয়ে উঠতে পারে।
ইনানীর এই বনকে আলাদা হিসেবে দেখলে ঠিক হবে না। কক্সবাজারের ইনানী, হিমছড়ি জাতীয় উদ্যান ও টেকনাফ বন্য প্রাণী অভয়ারণ্যের মধ্যে সংযোগ বজায় থাকাও প্রাণীদের চলাচলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
গবেষকেরা মনে করছেন, শুধু কোনো বনে প্রাণী আছে কি না, সেটি জানলেই কাজ শেষ হয় না। কোন ধরনের জায়গায় প্রাণীরা বেশি থাকে, কোথায় এদের চলাচল বেশি, কোন জায়গা মানুষের চাপে ক্ষতিগ্রস্ত, এসবও জানা প্রয়োজন হয়। এসব তথ্যের ভিত্তিতেই বন রক্ষা ও পুনরুদ্ধারের কাজ করা যায়।
