১০০ বছর পর বিড়াল পরিবারে নতুন সদস্য
বলিভিয়ার গহিন বনে বাস করা এই বুনো বিড়ালটির ওজন মাত্র ১ কেজি ৪০০ গ্রাম। গায়ে চিতার মতো ছোপ ছোপ গোল দাগ। উদ্ধার করার পর কিছুদিন এক স্থানীয় মানুষের বাড়িতে এটি পোষা প্রাণীর মতো ছিল। তবে গবেষকদের কাছে এটি মোটেও সাধারণ কোনো বিড়াল নয়। গত ১০০ বছরের মধ্যে বিড়াল পরিবারে (Felidae) এটিই প্রথম সম্পূর্ণ নতুন কোনো প্রজাতি আবিষ্কারের ঘটনা! বিড়ালটির প্রজাতির নাম দেওয়া হয়েছে ‘টিলকায়ো’ (Leopardus tilcayo)।
এর আগে বিড়ালের কিছু উপপ্রজাতিকে আলাদা করে নতুন প্রজাতি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বলিভিয়ার আন্দিজ পর্বতমালার মেঘে ঢাকা বনে পাওয়া এই ‘টিলকায়ো’ একদমই নতুন প্রজাতি। ১৯২৩ সালে ‘পাম্পাস ক্যাট’ চিহ্নিত হওয়ার পর বিড়াল পরিবারে এবারই প্রথম সম্পূর্ণ নতুন কোনো প্রজাতি যুক্ত হলো।
ছোট আকারের এই বিড়াল মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার ‘টাইগার ক্যাট’ বা বাঘের মতো দেখতে বুনো বিড়ালদের দলভুক্ত। ১৭ সেপ্টেম্বর বিজ্ঞান সাময়িকী কারেন্ট বায়োলজিতে প্রকাশিত এক গবেষণায় ডিএনএ পরীক্ষা করে বিজ্ঞানীরা জানান, প্রজাতিটি তার কাছের আত্মীয়দের থেকে প্রায় ১৪ লাখ বছর আগেই আলাদা হয়ে গিয়েছে।
ছোট্ট এক ফোনকল থেকে শুরু
২০১৭ সালে বলিভিয়ায় কাজ করা জীববিজ্ঞানী ও ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক এক্সপ্লোরার পাওলা নোগালেস–আসকারুনজ স্থানীয় একটি বন্য প্রাণী অভয়ারণ্য থেকে একটি ফোন পান। অভয়ারণ্য কর্তৃপক্ষ তাঁকে জানায়, তাদের কাছে একটি অদ্ভুত বিড়াল এসেছে। বনের কাছে রাস্তার ধারে এক লোক বিড়ালছানাটিকে কুড়িয়ে পেয়ে গৃহপালিত জাতের মনে করে বাড়ি নিয়ে যান। বুনো স্বভাবের প্রাণীটির সঙ্গে এক বছর কাটানোর পর তিনি সেটিকে অভয়ারণ্যে দিয়ে আসেন।
অভয়ারণ্যের কর্মীরা মনে করেছিলেন, প্রাণীটি একটি ‘অন্সিলা’ বিড়াল। তাই আদর করে এর নাম রেখেছিলেন ‘টিগ্রিনো’। কিন্তু গবেষণার কাজ করতে গিয়ে নোগালেস–আসকারুনজ প্রাণীটির আকার দেখে বেশ অবাক হন।
নোগালেস–আসকারুনজ বলেন, ‘বিড়ালটি যে কতটা ছোট ছিল, তা আমি বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না। মনে হয়েছিল, এটি কোনো ছানা। কারণ, এক বছর বয়সে টিগ্রিনো পূর্ণবয়স্ক হলেও সাধারণ অন্সিলার চেয়ে অনেক ছোট ছিল (পূর্ণবয়স্ক অন্সিলার ওজন সাড়ে তিন কেজির বেশি হয়)।’
২০১৯ সালে বলিভিয়ার স্থানীয় বুনো বিড়ালদের গাইডবুক তৈরির সময় নোগালেস আসল অন্সিলার সঙ্গে টিগ্রিনোর ছবির বেশ কিছু সূক্ষ্ম তফাত দেখতে পান। এর গায়ের ছোপ দাগগুলো অন্সিলার চেয়ে বড় ছিল। তাই তিনি টিগ্রিনোর ডিএনএ পরীক্ষা শুরু করেন।
ডিএনএ পরীক্ষায় মিলল চমক
বিজ্ঞানী এডুয়ার্ডো আইজিরিক ও জোনাস লেসক্রোয়ার্টের দলের সদস্যরা যখন দক্ষিণ আমেরিকার টাইগার ক্যাট নিয়ে জাদুঘরের নানা নমুনা পর্যালোচনা করছিলেন, তখন তাঁরা নোগালেস–আসকারুনজের সঙ্গে যুক্ত হন।
গবেষণাপত্রের সহলেখক ও জীববিজ্ঞানী লেসক্রোয়ার্ট জানান, দুটি তথ্যভান্ডার মেলাতেই দেখা যায়, টাইগার ক্যাটের মোট প্রজাতির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে পাঁচটিতে। যার মধ্যে বলিভিয়ার এই নতুন ‘টিলকায়ো’ প্রজাতিটি ছিল গবেষকদের কাছে একদমই অপ্রত্যাশিত!
এই প্রজাতির সদস্যরা এখন বলিভিয়ার ইয়ুঙ্গাস অঞ্চলের একটি বন্য প্রাণী আশ্রয়কেন্দ্রে পর্যবেক্ষণে রয়েছে। গবেষকদের মতে, প্রজাতিটি সঠিকভাবে শনাক্ত করা বন্য প্রাণী সংরক্ষণে খুবই জরুরি। কারণ, বন উজাড় ও অবৈধ বন্য প্রাণী বাণিজ্যের কারণে নতুন এই বিড়াল আগেই মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।