প্রাণীরা কি গুনতে পারে
জটিল অঙ্ক বা গাণিতিক সমস্যা সমাধানের এই অদ্ভুত ক্ষমতাই মানুষকে অন্যান্য প্রাণী থেকে আলাদা করে তুলেছে। তবে মজার বিষয় হলো, কিছু প্রাণীর মধ্যে কিন্তু একধরনের মৌলিক হিসাব করার ক্ষমতা দেখা যায়। সহজ কথায়, এরা এক অর্থে গণনা করতে পারে।
বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে জার্মানির বার্লিনে ‘ক্লেভার হ্যান্স’ নামের একটি ঘোড়া পুরো পৃথিবীতে বেশ আলোড়ন ফেলে দিয়েছিল। তার ট্রেইনার দাবি করেছিলেন, ঘোড়াটি সাধারণ যোগ-বিয়োগ বা হিসাব করতে পারে। যেকোনো অঙ্কের উত্তর দিতে ঘোড়া মাটিতে খুর দিয়ে আঘাত করে সংখ্যা বুঝিয়ে দিত।
কিন্তু পরবর্তী সময়ে বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করে দেখেন, ঘোড়াটির আসলে এমন কোনো ক্ষমতা ছিল না। তবে সেটার ছিল অসম্ভব তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা। প্রশ্নকর্তার মুখের অভিব্যক্তি ও শরীরের সূক্ষ্ম নড়াচড়া দেখেই বুঝে ফেলত কখন থামতে হবে। এমনকি যেসব প্রশ্নের উত্তর প্রশ্নকর্তা নিজে জানতেন না, সেগুলোর উত্তর কিন্তু ঘোড়াটিও দিতে পারত না।
এক শতাব্দী আগে ক্লেভার হ্যান্স হয়তো অঙ্ক পরীক্ষায় ফেল করেছিল। তবে সাম্প্রতিক নানা গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক প্রাণীরই সত্যি চমৎকার সংখ্যা বোধ (number sense) রয়েছে। অর্থাৎ কোনটি কম আর কোনটি বেশি সেই পরিমাণের পার্থক্য এরা খুব সহজেই বুঝে নিতে পারে।
বানর ও শিম্পাঞ্জিদের মধ্যে হিসাব করার ভালো ক্ষমতা থাকবে। আশির দশকের শেষের দিকে বিজ্ঞানীরা এক গবেষণায় দেখান, শিম্পাঞ্জিরা একদম সঠিক যোগ-বিয়োগ করতে পারে। দুটি আলাদা বাটিতে কয়েকটি করে চকলেট রাখলে এরা চোখের নিমেষে সেগুলোর মোট সংখ্যা হিসাব করে ফেলে। তারপর অন্য দুটি বাটির চকলেট যোগ করে দুটির মধ্যে যেটি বেশি, প্রায় ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রেই সেই বেশি চকলেটের বাটিটি বেছে নেয়।
বিশ বছর পরের আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, কম্পিউটারের পর্দায় ভেসে ওঠা নানা জিনিস দ্রুত গুনে ফেলার কাজে রিসাস বানরদের দক্ষতা একজন কলেজ শিক্ষার্থীর প্রায় ৮০ শতাংশের সমান।
শুধু দেখেই নয়, কানে শোনার সাপেক্ষেও এরা হিসাব মেলাতে পারে। কোনো শব্দের আওয়াজ কয়বার হলো, সেই সংখ্যার সঙ্গে মিল রেখে এরা স্ক্রিনের সঠিক আকৃতিটি নিখুঁতভাবে চিনে নিতে পারে।
সিংহের মধ্যেও গর্জন শুনে সংখ্যা আন্দাজ করার অদ্ভুত ক্ষমতা রয়েছে। লাউডস্পিকারে অন্য কোনো সিংহের ডাক শোনানো হলে, নিজেদের দলের সদস্য সংখ্যা কত ও শত্রুর সংখ্যা কত তা মেপে নিয়ে এরা এগোনোর বা পিছু হটার সিদ্ধান্ত নেয়।
নেকড়ে ও কালো ভালুকের মতো স্তন্যপায়ীদের মধ্যেও কম–বেশি পরিমাণের পার্থক্য বোঝার শক্তি দেখা গেছে।
মৌমাছিদের বুদ্ধিমত্তা কিন্তু দারুণ। এরা অন্তত ৪ পর্যন্ত গুনতে পারে। ১৯৯০-এর দশকের গবেষণায় দেখা যায়, বাসা থেকে কতটা দূরে এসেছে তা মনে রাখার জন্য এরা পথের ধারের বড় কোনো বস্তু বা চিহ্ন (সর্বোচ্চ ৪টি) গুনে হিসাব রাখে। পরীক্ষার সময় গবেষকেরা চিহ্নের সংখ্যা বদলে দিলে মৌমাছিরা দিক হারিয়ে ফেলত। এমনকি বিন্দুর সংখ্যা দেখেও এরা পরিমাণের পার্থক্য ধরে ফেলতে পারে।
মাছেরা বুদ্ধির জন্য খুব পরিচিত না হলেও এদের মধ্যে সংখ্যা বোঝার চমৎকার ক্ষমতা আছে। গাপ্পি মাছ সব সময় বড় ঝাঁকে বা বেশি মাছের দলে যোগ দিতে পছন্দ করে, যাতে নিজেদের সুরক্ষা বা নিরাপত্তা বেশি থাকে।
বিজ্ঞানীদের মতে, পরিমাণের এই পার্থক্য বোঝার ক্ষমতা হয়তো অনেক প্রাণীর জন্মগত। ২০১৫ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, মাত্র তিন দিন বয়সী মুরগির ছানারাও কোনটি কম আর কোনটি বেশি তা আলাদা করতে পারে।
সব মিলিয়ে, সংখ্যা বোঝার এই ক্ষমতা কিন্তু শুধু মানুষের একার নয়। এমনকি প্রাণিজগতের বাইরেও এর দেখা মেলে। ভেনাস ফ্লাইট্র্যাপের মতো কিছু শিকারি উদ্ভিদও নাকি নিজেদের উপায়ে হিসাব বা গণনা করতে পারে।