বিনা বেতনে দেশ গড়ার লড়াইয়ে দক্ষিণ সুদানের শিক্ষকেরা

দক্ষিণ সুদানের জুবা শহরের একটি স্কুলের প্রধান শিক্ষক পল সান্তিনো। তাঁকে দেখলে আর দশজন সাধারণ শিক্ষকের মতোই মনে হবে। তিনি বই দিয়ে সাজানো একটি অন্ধকার ঘরে কাঠের ডেস্কে একা বসে থাকেন। ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষকেরা তাঁর রুমে ঢোকার আগে ভদ্রভাবে দরজায় টোকা দেয়। মাঝেমধ্যে তিনি স্কুল চত্বরে চক্কর দেন, ক্লাসরুমে উঁকি দেন, স্কুলমাঠের কাজকর্ম তদারক করেন এবং ইউনিফর্ম বা আচরণের জন্য শিক্ষার্থীদের মৃদু বকুনি দেন।

কিন্তু আর দশজন সাধারণ শিক্ষকের সঙ্গে সান্তিনোর একটা বড় পার্থক্য রয়েছে। তিনি গত এক বছরের বেশি সময় ধরে কোনো বেতন পাননি! শুধু তিনিই নন, রাজধানী জুবার ‘গুম্বো বেসিক স্কুল’-এর কোনো শিক্ষক বা কর্মী বেতন পাননি। এমনকি এই দেশের সরকারি কোনো স্কুলের শিক্ষকই এক বছর ধরে কোনো বেতন পাচ্ছেন না!

দক্ষিণ সুদানের শিক্ষাব্যবস্থা এখন এক চরম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

কয়েক দশকের স্বাধীনতাযুদ্ধের পর ২০১১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় দক্ষিণ সুদান। এই দেশকে আফ্রিকার সবচেয়ে ভঙ্গুর দেশগুলোর একটি মনে করা হয়। দেশের সরকারি তহবিল প্রায় শূন্য। দক্ষিণ সুদানের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক মানুষের বয়সই ১৮ বছর বা তার নিচে। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে সরকারের বাজেটে শিক্ষাক্ষেত্রকে এত অবহেলা করা হয়েছে যে স্কুলগুলো এখন বন্ধের উপক্রম।

বিশ্বের নতুন এই দেশের জন্য এটি মহাবিপর্যয়। আফ্রিকার জনসংখ্যা বিস্ফোরণের এই সময়ে অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু ১ কোটি ২০ লাখ মানুষের দেশ দক্ষিণ সুদান আজ দেখাচ্ছে, স্কুলব্যবস্থা ভেঙে পড়লে কী করুণ পরিণতি হতে পারে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, এই দেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যাওয়ার বয়সী শিশুদের মাত্র ৪০ শতাংশ স্কুলে ভর্তি হতে পেরেছে। এদের মধ্যে খুব সামান্য অংশই সাধারণত লিখতে, পড়তে বা অঙ্ক করতে পারে।

আরও পড়ুন

যুক্তরাষ্ট্রসহ বিদেশি দাতাগোষ্ঠীগুলোর তহবিল বা সাহায্য কমে যাওয়ায় গুম্বো স্কুলের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো এখন ধুঁকে ধুঁকে চলছে। এই চরম দুরবস্থার মধ্যেও দক্ষিণ সুদানের স্কুলগুলো যে এখনো টিকে আছে, এটাই আশ্চর্য। এর একমাত্র কারণ, পল সান্তিনোর মতো ৬৭ বছর বয়সী শিক্ষকদের অদম্য ইচ্ছা ও দায়বদ্ধতা।

বিনা বেতনে কেন প্রতিদিন কাজ করতে আসেন, জানতে চাইলে সান্তিনো নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, ‘আমি আমার চাকরিটাকে বড্ড বেশি ভালোবাসি।’ সরকারি কোনো বেতন না থাকায় নিজের স্ত্রী ও ছয় সন্তানের খরচ চালাতে তিনি নিজের দৈনন্দিন খরচ একদম কমিয়ে ফেলেছেন। পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা যখন যেভাবে পারে স্কুলটিকে বাঁচিয়ে রাখতে ছোটখাটো আর্থিক সাহায্য বা চাঁদা দেয়।

প্রতিদিন ভোরে সান্তিনো চার মাইল পথ হেঁটে স্কুলে আসেন। আবার সন্ধ্যায় স্কুলের তালা বন্ধ করে সেই চার মাইল পথ হেঁটে বাড়ি ফেরেন।

দক্ষিণ সুদানের এই স্কুলগুলোর এমন দশা একটি নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিদেশি দাতাদের দেওয়া অর্থ এই দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে সাহায্য করছে, নাকি উল্টো অলস করে দিচ্ছে? যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রশাসনের দাবি, বিদেশি সাহায্যের ওপর নির্ভরশীলতার কারণে দক্ষিণ সুদানের নেতারা নিজ দেশের মানুষের শিক্ষাব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রয়োজন মনে করছেন না।

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, দক্ষিণ সুদানের শিক্ষার এই শোচনীয় অবস্থার জন্য দাতাদের তহবিলের অভাব দায়ী নয়। বরং তারা দেশটির মৌলিক সেবাগুলোতে সরকারি তহবিল সঠিকভাবে ব্যবহার না করার জন্য সে দেশের সরকারকে সরাসরি দায়ী করেছে।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, দেশের নেতারা তেল বিক্রির কোটি কোটি ডলারের রাজস্ব আত্মসাৎ করেছেন, যা শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যবহার করা যেত। দক্ষিণ সুদান সরকার বিদেশি সাহায্যকে ‘দেশ পরিচালনার বিকল্প’ হিসেবে ব্যবহার করছে বলে তারা মন্তব্য করেছে।

দক্ষিণ সুদানের তথ্যমন্ত্রী আতেনি ওয়েক আতেনি এই সমালোচনার সরাসরি কোনো জবাব দেননি। তবে তিনি বলেছেন, বিদেশি সাহায্য কমে যাওয়ায় দেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে শিক্ষকেরা বেতন না পেয়েও কাজ চালিয়ে গিয়ে দেশপ্রেমের এক অনন্য নজির দেখিয়েছেন। তিনি বলেন, নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে দক্ষিণ সুদানকে এখন নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে। এ ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।

দেশের অন্যান্য স্কুলের তুলনায় গুম্বো স্কুল কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। দুপুরে স্কুলের বাচ্চাদের জন্য সেখানেই গরম খাবার রান্না করা হয়। অভিভাবকেরা শিক্ষকদের যে সামান্য আর্থিক অনুদান দেন, তা দিয়েই মূলত স্কুলটি কোনোমতে টিকে আছে। গুম্বো স্কুলের প্রতিটি ক্লাসে গড়ে ৮৭ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। প্রধান শিক্ষক সান্তিনো জানান, তাঁর এত সব সমস্যার মধ্যে অন্যতম বড় সমস্যা হলো, স্কুলমাঠের নলকূপটি নষ্ট হয়ে আছে। এটি দিয়ে লোনাপানি আসত। কিন্তু সেটি মেরামত করার মতো কোনো টাকাও স্কুলের কাছে নেই।

আরও পড়ুন

একটি বেসরকারি সংস্থার নীতিনির্ধারক বিশেষজ্ঞ ম্যানুয়েলা তিয়ু বলেছেন, বছরের পর বছর ধরে চলা গৃহযুদ্ধে এ দেশের অভিভাবকেরা চরম ভুক্তভোগী। এ অবস্থায় শিশুদের স্কুলে আসাটা শিশুশ্রম ও বাল্যবিবাহ থেকে রক্ষার উপায় হিসেবে কাজ করছে। এটি সমাজে একধরনের স্থিতিশীলতা বজায় রাখছে।

কিন্তু তহবিলের এই তীব্র অভাবের কারণে শিক্ষকেরা এখন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার চেয়ে অন্য কিছু নিয়ে ভাবতে বাধ্য হচ্ছেন। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায়। যেখানে কোনো অবকাঠামো নেই এবং শিশুরা গাছের নিচে বসে পড়াশোনা করে। তিয়ু চোখের জল মুছতে মুছতে বলেছেন, ‘পরিস্থিতি এত খারাপ যে শিক্ষকেরা এখন পড়াশোনার চেয়ে শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখা আর খেলাধুলা করাকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছেন।’

অনেকের মতে, শিক্ষাব্যবস্থার এই ভাঙন প্রমাণ করে, দেশের নেতারা স্বাধীনতার স্বপ্নকে কীভাবে ধূলিসাৎ করেছেন। স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় দক্ষিণ সুদানের অবিসংবাদিত নেতা জন গ্যারাং বলেছিলেন, বন্দুকের চেয়ে শিক্ষার গুরুত্ব কোনো অংশে কম নয়। এমনকি ইথিওপিয়ার সামরিক প্রশিক্ষণ শিবিরগুলোতেও নতুন রিক্রুটদের লিখতে ও পড়তে শেখানো হতো।

জুবা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক বেঞ্জামিন মাচারের মতে, শিক্ষাকে বুকে টেনে নেওয়ার আরেকটি বড় কারণ ছিল সুদানের রাজধানী খার্তুমের চাপিয়ে দেওয়া শিক্ষাব্যবস্থাকে প্রত্যাখ্যান করা। খার্তুমের শিক্ষায় শেখানো হতো, দক্ষিণের মানুষ উত্তরের চেয়ে নীচু জাতের।

২০১১ সালে যখন দক্ষিণ সুদান স্বাধীনতা লাভ করে, তখন পুরো দেশ এক নতুন আশার আলোয় মুখরিত হয়েছিল। যার পেছনে বড় সমর্থন ছিল যুক্তরাষ্ট্রের। মাচার বলেন, সেই স্বপ্নের মূলে ছিল একটি স্বাধীন ও মুক্ত শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা, যা উত্তরের আধিপত্য ভেঙে নিজেদের জাতীয় গৌরবকে ফুটিয়ে তুলবে। তিনি আফসোস করে বলেন, ‘আমরা জ্ঞানের জন্য তৃষ্ণার্ত ছিলাম। আমরা জানতাম কীভাবে পড়াশোনা করে আগামী দিনের যোগ্য নেতা হতে হয়।’

কিন্তু এর পর থেকে একের পর এক আঘাত আসতে শুরু করে। স্বাধীনতার পর থেকে প্রেসিডেন্ট সালভা কির দেশ পরিচালনা করছেন। ২০১৮ সালে গৃহযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে, তিনি শিক্ষার মতো মৌলিক সরকারি সেবা নিশ্চিত না করে সরকারি অর্থ কেবল নিজের রাজনৈতিক ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার পেছনে ব্যয় করছেন।

বিশ্লেষকেরা আশঙ্কা করছেন, দেশটি হয়তো আবারও গৃহযুদ্ধের মুখে পড়তে পারে। কঙ্গোতে নতুন করে ছড়িয়ে পড়া ইবোলা মহামারিও দক্ষিণ সুদানের দরজায় কড়া নাড়ছে।

তবু গুম্বো স্কুলের ছাত্র ও শিক্ষকেরা এসব বড় দুশ্চিন্তার চেয়ে প্রতিদিনকার বাস্তব সমস্যাগুলো সামাল দিতেই বেশি ব্যস্ত। ২৩ বছর বয়সী সাইমন ওবা এই স্কুলে একজন স্বেচ্ছাসেবী শিক্ষক হিসেবে কাজ করেন। জুবা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজের পড়ার খরচ চালাতে ছাত্রছাত্রীদের অভিভাবকেরা মাঝেমধ্যে তাঁকে সামান্য কিছু টাকা দেন।

প্রতিদিন সকালে জুবা শহরের কাছে নিজের হাতে বানানো মাটির ঘর থেকে হেঁটে তিনি এই স্কুলে আসেন। আবার সন্ধ্যায় হেঁটে বাড়ি ফিরে মোমবাতির আলোয় নিজের পড়াশোনা করেন এবং রাতের রান্না সারেন। প্রাতিষ্ঠানিক বড় ডিগ্রি না থাকলেও সাইমন ওবাদের মতো একবুক নিষ্ঠা নিয়ে কাজ করা শিক্ষকদের ওপরই আজ টিকে আছে এই স্কুল।

ওবা দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, শিক্ষা ছাড়া কোনো পরিবর্তন সম্ভব নয়। শিক্ষাই হলো সবকিছুর আসল চাবিকাঠি।

বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিত, বিজ্ঞান ও ধর্মীয় শিক্ষায় স্নাতক শেষ করার পর ওবা কী হতে চান, জানতে চাইলে তিনি এক সেকেন্ডও না ভেবে বলেন, ‘আমি একজন শিক্ষকই হতে চাই।’

সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস
আরও পড়ুন