বজ্রপাতের সময় মাটিতে শুয়ে পড়া কেন বিপজ্জনক

আকাশ কালো হয়ে আসছে, মাঠে তখনো তুমি দাঁড়িয়ে। দূরে বিদ্যুতের এক চমক, তারপর গুমগুম শব্দ। মানে বজ্রপাত হচ্ছে! প্রচলিত আছে, বজ্রপাতের সময় মাঠে দাঁড়িয়ে থাকা যাবে না। তাহলে কি বজ্রপাতের সময় মাঠে শুয়ে পড়ব? বজ্রপাতের সময় আমরা ঠিক কী করব, বজ্রপাতে নিরাপদে থাকার উপায় নিয়ে এই লেখা।

মাটিতে শুয়ে পড়লে বজ্রপাত থেকে বাঁচা যায় না, উল্টো ঝুঁকি বাড়ে। কিছু বইয়ে একসময় এই ভুল কথাটাই লেখা থাকত, কিন্তু বজ্রপাত আসলে যেভাবে কাজ করে, এর সঙ্গে এই উপদেশের কোনো মিল নেই।

মেঘ থেকে বিদ্যুৎ নিচে নামার সময় সবচেয়ে কম বাধার পথ খোঁজে। গাছ, খুঁটি বা পাহাড়ের চূড়ার মতো উঁচু কিছু সাধারণত আগে আঘাত পায়। কিন্তু সরাসরি গায়ে পড়া বজ্রপাতের চেয়েও বেশি মানুষ মারা যায় ‘গ্রাউন্ড কারেন্ট’ বা ভূমিপ্রবাহে। কাছাকাছি কোথাও বজ্রপাত হলে সেই বিদ্যুৎ মাটির ভেতর দিয়ে ঢেউয়ের মতো ছড়িয়ে পড়ে। শরীরের দুই অংশ যদি মাটির দুই ভিন্ন বিন্দু ছোঁয়, আর সেই দুই বিন্দুতে বিদ্যুতের পরিমাণে তফাত থাকে, কারেন্ট তখন শরীরের ভেতর দিয়েই বয়ে যায়। একে বলে ‘স্টেপ ভোল্টেজ’।

আরও পড়ুন

চিত হয়ে শুয়ে থাকলে মাথা থেকে পা পর্যন্ত পুরো শরীর মাটি স্পর্শ করে, ফলে দুই বিন্দুর দূরত্ব বেড়ে যায় আর ভোল্টেজের পার্থক্যও বাড়ার আশঙ্কা থাকে। শরীর তখন বিদ্যুতের একটা সহজ রাস্তা হয়ে যায়। দুই পা জোড়া করে দাঁড়ালে এই দূরত্ব সবচেয়ে কম থাকে, এই একটা কারণেই বিশেষজ্ঞরা শুয়ে পড়ার বদলে পা গুটিয়ে বসা বা দাঁড়িয়ে থাকার পরামর্শ দেন।

তবে এটাকে নিরাপদ পদ্ধতি বলা ঠিক হবে না। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় আবহাওয়া দপ্তর স্পষ্ট করেই বলেছে, খোলা জায়গায় বজ্রপাত থেকে বাঁচার কোনো নিশ্চিত উপায় নেই। যা আছে তা শুধু ঝুঁকি কমানোর একটা শেষ চেষ্টা, যখন আশ্রয়ে পৌঁছানোর আর কোনো রাস্তা থাকে না।

বাংলাদেশে বজ্রপাত এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো প্রাকৃতিক ঘটনা নয়। এটি একটি মারাত্মক প্রাণঘাতী দুর্যোগে পরিণত হয়েছে।
ছবি: প্রথম আলো

আসল কথাটা হলো, ঝড় শুরু হওয়ার আগেই জায়গা ছেড়ে দেওয়া। ৩০-৩০ নিয়মটা এখানে কাজে লাগে। বিদ্যুৎ চমকানোর পর গর্জনের শব্দ আসতে ৩০ সেকেন্ডের কম সময় লাগলে বুঝতে হবে ঝড় কাছেই, এখনই আশ্রয়ে যাওয়া দরকার। শেষ গর্জনের পর অন্তত ৩০ মিনিট অপেক্ষা করে তবেই বাইরে ফেরা উচিত।

আশ্রয় মানে শক্ত দেয়াল আর ছাদওয়ালা বাড়ি, নাহয় ধাতব শরীরের গাড়ি। টিনের চাল বা খোলা শেড আশ্রয় নয়। মাঠে খেলার সময় ঝড়ের আভাস পেলে কাছের পাকা ভবনে দৌড় দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। একলা একটা গাছের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা সবচেয়ে বিপজ্জনক ভুলগুলোর একটা—গাছ আঘাত পেলে তার চারপাশের মাটি, এমনকি গাছের গা বেয়ে নামা বিদ্যুতের স্রোতও মানুষকে ছুঁয়ে দিতে পারে। পানিতে নামাও চলবে না, পানি বিদ্যুতের জন্য আরও সহজ মাধ্যম। ছাতা, ধাতব বেড়া, সাইকেল বা মোটরসাইকেলের হাতলও তখন বিপজ্জনক সঙ্গী।

আরও পড়ুন

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই আলোচনা পাঠ্যবইয়ের তথ্য মাত্র নয়। আবহাওয়া অধিদপ্তরের হিসাবে গত এক দশকে বজ্রপাতে এ দেশে প্রাণ গেছে সাড়ে তিন হাজারের বেশি মানুষের, আর ২০২৫ সালেই মারা গেছেন দুই শতাধিক, যাঁদের একটা বড় অংশ কৃষক। ধান কাটতে, সেচ দিতে বা গরু আনতে গিয়ে খোলা মাঠেই ঝড়ের মধ্যে আটকে পড়েছিলেন তাঁরা। সিলেটের হাওর অঞ্চলে ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি, কারণ বিশাল জলভাগ থেকে জলীয় বাষ্প উঠে দ্রুত মেঘ তৈরি করে, আর খোলা প্রান্তরে আশ্রয় নেওয়ার মতো জায়গাও কম।

বজ্রপাত
ছবি: উইকিপিডিয়া

তোমার আশপাশে কেউ কৃষিকাজ করে, মাছ ধরে, বা বিকেলে মাঠে খেলতে যায় কি না দেখো। তাঁদের জন্য এই তথ্যটা শুধু জ্ঞানের কথা নয়। আকাশে মেঘ জমলে, বাতাসে একটা অদ্ভুত গুমোট ভাব এলে, কাজ ফেলে রওনা দেওয়াটাই বুদ্ধির পরিচয়। ফসল পরে কাটা যায়।

আর যদি কখনো এমন কোনো জায়গায় পড়ে যাও, যেখানে আশ্রয় বলতে কিছুই নেই—না বাড়ি, না গাড়ি, শুধু খোলা মাঠ আর মাথার ওপর গর্জন করতে থাকা মেঘ—তখন শুয়ে পড়ার বদলে পা জোড়া করে গুটিয়ে বসে পড়ো, হাত দুটো কান চাপা দিয়ে। মাটির সঙ্গে শরীরের ছোঁয়া যতটা সম্ভব কম রাখো, আর চোখ রাখো কাছাকাছি কোনো পাকা ছাদের দিকে—কারণ, এই বসে থাকাটা নিরাপত্তা নয়, শুধু আশ্রয় পর্যন্ত পৌঁছানোর একটা পথ।

সূত্র: ন্যাশনাল ওয়েদার সার্ভিস

আরও পড়ুন