বিশ্বের ক্ষুদ্রতম ডাইনোসরের খোঁজ মিলেছে
ডাইনোসর বললেই আমাদের মাথায় সাধারণত টি রেক্স, ব্রন্টোসরাস কিংবা বিশালকার প্যাটাগোটাইটানের ছবি ভেসে ওঠে। কিন্তু সব ডাইনোসর আকারে এত বড় ছিল না। এদের মধ্যে একটি ক্ষুদ্র প্রজাতির নাম হলো আলনাশেত্রি (Alnashetri)। ডাইনোসরটি আকারে এত ছোট ছিল যে এর ওজন একটি সাধারণ হেজহগের (Hedgehog) চেয়েও কম।
বিজ্ঞানীরা জানান, আলনাশেত্রি মূলত একটি পোকাখেকো ডাইনোসর। এর আকার আমাদের হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলির সমান। এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত ক্ষুদ্রতম ডাইনোসরগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। সাধারণত ডাইনোসরকে দৈত্যাকার প্রাণী হিসেবে কল্পনা করা হলেও এই ক্ষুদ্র প্রজাতি প্রমাণ করে, ডাইনোসরদের বৈচিত্র্য ছিল অনেক বেশি। বিশ্বের ক্ষুদ্রতম এই ডাইনোসর নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা নেচার জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।
আবিষ্কৃত জীবাশ্মটি বিশ্লেষণ করে এই ডাইনোসরের শারীরিক গঠন সম্পর্কে বেশ কিছু অদ্ভুত তথ্য জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
২০১৪ সালে আর্জেন্টিনার উত্তর পাতাগোনিয়ায় ৯ কোটি বছর আগের একটি ডাইনোসরের জীবাশ্ম পাওয়া যায়। ডাইনোসরটি আকারে খুব ছোট হলেও বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এর গুরুত্ব অনেক বেশি। ডাইনোসরটির প্রজাতির নাম আলনাশেত্রি সেরোপোলিসিয়েনসিস (Alnashetri ceropolisiensis)। আগে কেবল এই প্রজাতির হাড়ের কিছু ভাঙা অংশ পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু এবার প্রায় সম্পূর্ণ একটি কঙ্কাল পাওয়া গেছে, যা বিজ্ঞানীদের জন্য অত্যন্ত বিরল ও সৌভাগ্যের বিষয়।
গবেষণার প্রধান লেখক ও মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পিটার মাকোভিকি জানান, এই পূর্ণাঙ্গ নমুনাটি পাওয়ার ফলে ডাইনোসরদের শরীরের আকার ও পরিবর্তন কীভাবে হয়েছিল, তা নিখুঁতভাবে বোঝা সম্ভব হবে। আগে যেসব অসম্পূর্ণ হাড় পাওয়া গিয়েছিল, সেগুলো এখন এই পূর্ণাঙ্গ কঙ্কালের সঙ্গে তুলনা করে সহজেই শনাক্ত করা যাবে।
বিজ্ঞানীদের জন্য ভাঙা হাড়ের টুকরা থেকে একটি প্রাণীর শারীরিক গঠন বোঝা খুব কঠিন ছিল। কিন্তু এই পূর্ণাঙ্গ জীবাশ্মটি পাওয়ার ফলে এখন ডাইনোসরের ইতিহাস পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করতে পারবেন বিজ্ঞানীরা। জীবাশ্মবিদদের কাছে এই আবিষ্কার একটি গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স হিসেবে কাজ করবে।
এরা আগে থেকেই ছোট ছিল বলেই পরবর্তী সময়ে উইপোকা বা পিঁপড়ার মতো ক্ষুদ্র পতঙ্গ খাওয়ার অভ্যাস তৈরি করেছিল। অর্থাৎ, এদের ছোট আকৃতিই এদের খাদ্যাভ্যাস নির্ধারণ করে দিয়েছিল।
আবিষ্কৃত জীবাশ্মটি বিশ্লেষণ করে এই ডাইনোসরের শারীরিক গঠন সম্পর্কে বেশ কিছু অদ্ভুত তথ্য জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। এর বাহুগুলো ছিল বেশ লম্বা এবং প্রতিটি বাহুর শেষে একটি করে বড় নখ ছিল। এর মুখ ছোট ছোট দাঁতে ভরা ছিল। অণুবীক্ষণ যন্ত্র বা মাইক্রোস্কোপ দিয়ে পরীক্ষা করে গবেষকেরা নিশ্চিত হয়েছেন, এটি একটি পূর্ণবয়স্ক ডাইনোসর ছিল, যার বয়স কমপক্ষে চার বছর। পূর্ণবয়স্ক হওয়া সত্ত্বেও এর ওজন ছিল মাত্র ৯০০ গ্রামের কম, যা একটি ছোট মুরগির ওজনের সমান।
ডাইনোসরটি আলভারেজসর (Alvarezsaurs) নামক একটি দলের অন্তর্ভুক্ত। এই দলের ডাইনোসরগুলো দেখতে অনেকটা পাখির মতো। এতটাই পাখির মতো যে শুরুতে যখন এদের জীবাশ্ম পাওয়া গিয়েছিল, তখন অনেকে ভুল করে এদের আদিম যুগের পাখি মনে করেছিলেন।
আলনাশেত্রির এই শারীরিক গঠন থেকে বোঝা যায়, এই ডাইনোসরগুলো এদের খাবারের কারণে ছোট হয়নি। বরং এরা আগে থেকেই ছোট ছিল বলেই পরবর্তী সময়ে উইপোকা বা পিঁপড়ার মতো ক্ষুদ্র পতঙ্গ খাওয়ার অভ্যাস তৈরি করেছিল। অর্থাৎ, এদের ছোট আকৃতিই এদের খাদ্যাভ্যাস নির্ধারণ করে দিয়েছিল।
আলনাশেত্রির এই আবিষ্কার আলভারেজসর ডাইনোসরদের ইতিহাস সম্পর্কে একটি বড় বিভ্রান্তি দূর করেছে। এর আগে দক্ষিণ আমেরিকায় এই গোষ্ঠীর যেসব জীবাশ্ম পাওয়া গিয়েছিল, সেগুলো ছিল অত্যন্ত ভাঙা ও অসম্পূর্ণ। এর ফলে সেখান থেকে পর্যাপ্ত তথ্য পাওয়া যেত না। অন্যদিকে এশিয়ায় এই ডাইনোসরদের অনেক ভালো নমুনা পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু বিজ্ঞানীদের মনে একটি বড় প্রশ্ন ছিল বিশাল সমুদ্র দিয়ে আলাদা হওয়া সত্ত্বেও একই প্রজাতির ডাইনোসর কীভাবে দুই মহাদেশেই থাকতে পারে?
এই প্রজাতিগুলো প্রমাণ করে যে পৃথিবী থেকে মহাদেশগুলো আলাদা হয়ে যাওয়ার আগেই আলভারেজসররা বিশ্বের প্রায় সব প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছিল।
আর্জেন্টিনায় পাওয়া নতুন এই পূর্ণাঙ্গ জীবাশ্ম সেই রহস্যের সমাধান করে দিয়েছে। আবিষ্কার থেকে উৎসাহিত হয়ে গবেষকেরা ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার পুরোনো জীবাশ্ম সংগ্রহগুলো পুনরায় পরীক্ষা করেন। সেখানেও তাঁরা আলভারেজসর প্রজাতির ডাইনোসরের অস্তিত্ব খুঁজে পান।
অধ্যাপক পিটার মাকোভিকি জানান, এই প্রজাতিগুলো প্রমাণ করে যে পৃথিবী থেকে মহাদেশগুলো আলাদা হয়ে যাওয়ার আগেই আলভারেজসররা বিশ্বের প্রায় সব প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছিল। অর্থাৎ, উত্তর ও দক্ষিণ গোলার্ধের মধ্যে বিশাল দূরত্ব তৈরি হওয়ার অনেক আগে থেকেই এরা পৃথিবীর বিভিন্ন মহাদেশে বসবাস করত। ৯ কোটি বছর আগে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া এই ক্ষুদ্র ডাইনোসর তাই বর্তমানে ডাইনোসরদের ভৌগোলিক বিস্তার বোঝার ক্ষেত্রে অনেক বড় ভূমিকা পালন করছে।