১৬৫ মিলিয়ন বছর আগের জুরাসিক বনের শব্দ তৈরি করেছেন বিজ্ঞানীরা

বিজ্ঞানীরা হাজার হাজার বছর আগের ডাইনোসরের হাড় দেখে এদের শরীরের গঠন সহজেই বুঝতে পারেন। আবার মাটিতে চাপা পড়া প্রাচীন গাছের জীবাশ্ম পরীক্ষা করে সেই সময়ের গাছপালা ও পরিবেশের চেহারাও খুঁজে বের করা সম্ভব হয়েছে।

তবে প্রাগৈতিহাসিক আমলের আসল রূপ জানতে গিয়ে বিজ্ঞানীদের একটা বড় সমস্যায় পড়তে হতো। তা হলো কোটি কোটি বছর আগের সেই শব্দ ও ডাক কেমন ছিল, তা বের করা। হাড় বা গাছের পাতার মতো শব্দ তো আর মাটিতে জমে থাকে না। বনের বাতাসে মিলিয়ে যাওয়া সেই প্রাচীন শব্দ উদ্ধার করা তাই বিজ্ঞানীদের জন্য কঠিন এক চ্যালেঞ্জ ছিল।

এবার গবেষকদের একটি দল প্রাচীন পতঙ্গের সাহায্য নিয়ে ১৬৫ মিলিয়ন বছর আগের একটি জুরাসিক শব্দ ও পরিবেশ তৈরি করতে সফল হয়েছেন। ডাইনোসরের নরম টিস্যুর জীবাশ্ম পাওয়া প্রায় অসম্ভব। তাই বিজ্ঞানীরা ঝিঁঝিপোকা ও ফড়িং-জাতীয় ২০টি প্রাচীন পতঙ্গের জীবাশ্ম পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেন।

গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাগৈতিহাসিক এই পতঙ্গগুলোর ডানায় বিশেষ অঙ্গ ছিল। ডানা দুটো একে অপরের সঙ্গে ঘষা খেলে শব্দ তৈরি হতো, যা আজকের ঝিঁঝিপোকার মতো। আধুনিক লেজার ও স্ক্যানিং প্রযুক্তির সাহায্যে ডানাগুলোর ঘর্ষণ ও কম্পন মেপে বিজ্ঞানীরা বের করেছেন কোটি বছর আগে এই পোকাগুলো ঠিক কী ধরনের শব্দ তৈরি করত।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞানীরা প্রাচীন পতঙ্গের ডানার জীবাশ্ম পরীক্ষা করে সেগুলোর একটি দ্বিমাত্রিক মডেল তৈরি করেন। এর মাধ্যমে তাঁরা জানতে পারেন ১৬ কোটি ৫০ লাখ বছর আগে এই পোকাগুলো ঠিক কেমন শব্দ করত। বিশেষ বিষয় হলো, ট্রায়াসিক যুগ থেকে আজ পর্যন্ত এই পোকাগুলোর শব্দ তৈরির মূল পদ্ধতিটি একই রয়ে গেছে।

শিল্পীর কল্পনায় ডাইনোসর
ফাইল ছবি: রয়টার্স

পরীক্ষায় দেখা গেছে, প্রাচীন পোকাগুলো সংগীতের মতো খুব নিখুঁত ও স্পষ্ট সুর তৈরি করতে পারত। ঘন ও কোলাহলপূর্ণ বনে নিজেদের সঙ্গীদের কাছে সংকেত পাঠানোর জন্যই এরা এই স্পষ্ট শব্দ ব্যবহার করত। একই সঙ্গে এই শব্দের বিশেষত্ব এমন ছিল, যাতে শিকারি প্রাণীরা শব্দ শুনলেও পোকাটির আসল অবস্থান সহজে খুঁজে পেত না। এমনকি বাদুড়ের লাখ লাখ বছর আগেই এই পোকাগুলো আলট্রাসাউন্ড বা অতিউচ্চ কম্পাঙ্কের শব্দ তৈরি করতে পারত।

লিংকন বিশ্ববিদ্যালয়ের সংবেদী জীববিজ্ঞানী ফার্নান্দো মন্টেয়ালেগ্রে-জাপাটা জানান, বর্তমান যুগের ঝিঁঝিপোকার মতো প্রাচীন পোকাগুলোর গানও ছিল সুরেল। ঝিঁঝিপোকার শব্দ যেমন কানে এলেও সহজে একে খুঁজে পাওয়া যায় না, কোটি বছর আগের শব্দগুলোও ঠিক তেমনই কৌশলপূর্ণ ছিল।

আরও পড়ুন

এই গবেষণার কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বিজ্ঞানীরা মডেলগুলোর মাধ্যমে পতঙ্গের মূল শব্দ ও তীক্ষ্ণতা অনুমান করতে পারলেও, সেগুলোর গান গাওয়ার সুর বা নির্দিষ্ট ছন্দ পুরোপুরি ফুটিয়ে তোলা সম্ভব হয়নি। তবু কোটি বছর আগের জুরাসিক যুগের একটি কাল্পনিক শব্দচিত্র তৈরি করতে এই মডেলটি যথেষ্ট ভূমিকা রেখেছে।

গবেষকেরা জানান, জুরাসিক যুগের এই পোকাগুলো কম কম্পাঙ্কের শব্দ থেকে শুরু করে মাঝারি ধরনের আলট্রাসাউন্ড পর্যন্ত বিভিন্ন কম্পাঙ্কে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করত। প্রায় সাড়ে ১৬ কোটি বছর আগে মধ্য জুরাসিক যুগে এই পোকাদের পূর্বপুরুষেরা আলট্রাসাউন্ড ব্যবহার শুরু করে। এটিই প্রাণীজগতে আলট্রাসাউন্ড যোগাযোগের এখন পর্যন্ত পাওয়া প্রাচীনতম প্রমাণ। এই গবেষণাপত্র বিজ্ঞান সাময়িকী পিএনএএস–এ প্রকাশিত হয়েছে।

সূত্র: আইএফএল সায়েন্স
আরও পড়ুন