চার বছর ধরে বনে-বাদাড়ে সন্তানদের নিয়ে এই বাবা কেন পালিয়ে বেড়াচ্ছেন

বাবার সঙ্গে আছে এম্বার, ম্যাভেরিক এবং জেয়ড।ছবি: ওয়ান নিউজ/ দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া

গহিন বনে প্রায় চার বছর ধরে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন টম ফিলিপস। টমের সঙ্গে আছে তাঁর তিন সন্তান। যাদের মধ্যে সবচেয়ে ছোটজনের নাম এম্বার। এখন বয়স ৯ বছর। দ্বিতীয় সন্তান ম্যাভেরিকের বয়স ১০। সবার বড় জেয়ডের বয়স ১২।

২০২১ সালের বড়দিনের ঠিক আগে টম ফিলিপস তাঁর তিন সন্তানকে নিয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে যান। নিউজিল্যান্ডের ওয়াইকাটো-এর বন্য এলাকায় আশ্রয় নেন তিনি। এরপর আর ফেরেননি।

বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার কারণ, সন্তানদের মায়ের সঙ্গে তাঁর বিবাদ। আদালতের রায় অনুযায়ী, টম ফিলিপসের সন্তানদের দেখাশোনার অধিকার নেই।

সম্প্রতি টমের পরিবার একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে এমনটা জানিয়েছেন। শিশুদের নিয়ে টমকে বাড়িতে ফেরার অনুরোধ জানিয়েছেন তাঁরা। এই প্রথম পরিবারের লোকজন প্রকাশ্যে টমের উদ্দেশ্যে কিছু বললেন।

টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে টমের বোন রোজজি ফিলিপস বলেছেন, ‘আমি তোমাকে খুব মিস করি। তোমার জীবনের অংশ হতে পারছি না বলে কষ্ট পাই। আমি সত্যি তোমাকে ও বাচ্চাদের দেখতে চাই।’

তিনি চান তাঁর এই অনুরোধ যেন ভাইয়ের কাছে পৌঁছায়। কারণ ইমেইল ও ফোনের মাধ্যমে টমের সঙ্গে যোগাযোগের সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।

রোজজি ফিলিপস আরও বলেন, ‘আমি আশা করি, হয়তো সে এটা দেখবে এবং বুঝবে যে সে ফিরে আসতে পারে। আমরা তাঁর পাশে আছি এবং সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। আমি তোমাকে ভালোবাসি। তোমার সন্তানদের পাশে থাকতে চাই। এমন কোনো দিন নেই, যেদিন আমি ওদের চারজনের কথা ভাবি না।’

আরও পড়ুন

টমের মা তাঁর ছেলেকে একটি চিঠি লিখেছেন। রোজজি টিভিতে সাক্ষাৎকারটা পড়ে শোনান। চিঠিতে লেখা ছিল, ‘তোমাদের ছবি আর জিনিসপত্র বাড়িতে পড়ে থাকতে দেখলে আমার খুব কষ্ট লাগে। মনে হয়, যদি তুমি চলে না যেতে, তাহলে পরিস্থিতি অন্যরকম হতে পারত। জেয়ডা, ম্যাভেরিক, এম্বার, আমি তোমাদের খুব ভালোবাসি। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে ভাবি, আজই হয়তো তোমরা বাড়ি ফিরবে।’

টম ফিলিপস
ছবি: ওয়ান নিউজ/ দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া

টম ফিলিপসের এই নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি নিয়ে বছরের পর বছর ধরে নিউজিল্যান্ডের মানুষের আগ্রহ আছে। টমের বোন রোজজি টিভির শোতে ছোট ভাইয়ের অনেক প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেন, ‘তাঁর অসাধারণ রসবোধ ছিল। সে ঘরের বাইরের জগৎ পছন্দ করত। নির্মাণকাজ পারত, শিকার করতে পারত। তাঁর সারভাইভাল শক্তি অনেক।’

ধারণা করা হয়, ফিলিপস নিউজিল্যান্ডের ওয়াইকাটোর বিশাল বনভূমিতে লুকিয়ে আছেন। এই অঞ্চলটি নিউজিল্যান্ডের পশ্চিমের উপকূলীয় এলাকায় অবস্থিত। এর কেন্দ্রে আছে বনভূমি আর খামার। উত্তরে চুনাপাথরের গুহা এবং সবুজে ঘেরা ছোট ছোট গ্রামীণ এলাকা।

ফিলিপস কৃষক পরিবারের সন্তান। মারোকোপা নামের একটি ছোট্ট উপকূলীয় গ্রাম, যেখানে ১০০-এরও কম মানুষ বাস করে, সেই জায়গাটির সঙ্গে তাঁর গল্প জড়িয়ে আছে। তাঁর নিখোঁজ হওয়ার আগে এলাকাটি ছিল বেশ অপরিচিত। জায়গাটি হ্যামিল্টন শহর থেকে দুই ঘণ্টার দূরত্বে অবস্থিত একটি শান্ত, বিচ্ছিন্ন গ্রাম। যেখানে ঘন বন ও পাহাড়ি এলাকার মধ্য দিয়ে একটিমাত্র আঁকাবাঁকা রাস্তা গ্রামের দিকে চলে গেছে।

আরও পড়ুন

দুর্গম ভূখণ্ডে টম ফিলিপসের আত্মগোপন নিয়ে পুলিশ বেশ হতাশ। যদিও তাঁর পরিবার তাঁকে সাহায্য করেছে এমন কোনো প্রমাণ নেই। তবে কীভাবে সে তাঁর তিন সন্তানকে নিয়ে এই কঠিন পরিবেশে এতদিন ধরে লুকিয়ে আছে, তা নিয়ে অনেকেই অবাক হন। কিছু অনুমান আছে তাদের নিয়ে। যেমন, হয়তো স্থানীয় কেউ তাঁকে সাহায্য করছে।

২০২৪ সালের অক্টোবরে তাঁদের একবার দেখা গেছে
ছবি: ওয়ান নিউজ/ দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া

ফিলিপসের বোন জানান, তিনি একদিকে আশা করেন যে কেউ তাঁর ভাইকে সাহায্য করুক। আবার যদি কেউ তাঁদের সুস্থতার খবর পরিবারকে না জানায়, তাহলে তিনি তাঁদের প্রতি ‘খুবই রাগ’ করবেন।

এর আগেও একবার ফিলিপস সন্তানদের নিয়ে বাড়ি ছেড়ে নিখোঁজ হয়েছিলেন। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে ফিলিপস তাঁর সন্তানদের নিয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে যান। সে সময় তাঁর গাড়ি মারোকোপা উপকূলের কাছে পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। ফলে তখন উপকূলে ও সমুদ্রে ব্যাপক তল্লাশি চালানো হয়। ১৯ দিন পর ফিলিপস ও তাঁর সন্তানেরা হেঁটে তাঁর বাবা-মায়ের খামারবাড়িতে ফিরে আসেন। তখন ফিলিপস দাবি করেছিলেন, তিনি মন শান্ত করতে সন্তানদের নিয়ে গভীর বনের ভেতর ক্যাম্পিংয়ে গিয়েছিলেন। এই ঘটনার জন্য তাঁকে পুলিশের সময় ও সম্পদ নষ্ট করার দায়ে অভিযুক্ত করা হয়েছিল।

কিন্তু এর তিন মাসেরও কম সময়ের মধ্যে ফিলিপস আবার নিখোঁজ হন। জানুয়ারি মাসে আদালতে হাজিরা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় তাঁকে গ্রেপ্তারের জন্য পরোয়ানা জারি করা হয়।

সাড়ে তিন বছরে ফিলিপস ও তাঁর সন্তানদের খুব একটা সাড়াশব্দ পাওয়া যায়নি। খুব অল্প সময়ের জন্য তাঁদের দেখা গেছে। সভ্য সমাজের সঙ্গে তাঁদের যোগাযোগ হয়েছে খুব কম। ২০২৩ সালের মে মাসে ফিলিপসকে পার্শ্ববর্তী কুইটি শহরে একটি ব্যাংক ডাকাতি করতে দেখা গেছে। সে বছর নভেম্বরে একটি ছোট মুদির দোকানে তিনি ডাকাতির চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ আছে। ২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে আরও কয়েকটি জায়গায় তাদের দেখা গেলেও জুন মাস থেকে তাঁদের আর খোঁজ পাওয়া যায়নি। জুন মাসে তাঁদের খোঁজ দেওয়ার বিনিময়ে ৮০,০০০ ডলার পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। এরপর তিনি যেন উধাও হয়ে গেছেন।

আরও পড়ুন

পুলিশ ফিলিপসকে ‘মূলধারার জীবনযাপন করেন না’ এমন ব্যক্তি হিসেবে বর্ণনা করেছে। পুলিশের মতে তিনি সামাজিকতা এড়িয়ে চলেন। ব্যাংকও খুব কম ব্যবহার করেন। তবে তাঁবুর সরঞ্জাম এবং বীজ কেনার ধরন থেকে বোঝা যায়, তিনি প্রকৃতি থেকেই জীবনধারণ করছেন।

২০২৪ সালের অক্টোবরে তাঁদের একবার দেখা গেছে। তখন কয়েকজন শিকারি কিশোরের ফোনে ধারণ করা একটি ভিডিও ফুটেজ সামনে আসে। যে ভিডিওতে একজন প্রাপ্তবয়স্ক লোক এবং তিনটি শিশুকে মারোকোপা এলাকার খামারে হাঁটতে দেখা যায়। পুলিশ মনে করে এটি ফিলিপস এবং তাঁর সন্তানেরা। পরের দিন পুলিশ ওই এলাকায় তল্লাশি চালিয়েও তাঁদের খুঁজে পায়নি।

পুলিশ ফিলিপস এবং তাঁকে যারা সাহায্য করছে, তাদের সঙ্গে আলোচনা করতে চায়। সবাইকে নিরাপদে বন থেকে বের করে আনতে চায়। কারণ, শিশুদের বন থেকে বের করে নিজেদের জীবন শুরু করতে দেওয়া উচিত।

আরও পড়ুন