কবুতরকে ড্রোন হিসেবে ব্যবহার করছে রাশিয়া

এই প্রকল্পের নাম ‘পিজেন-১’

একসময় কবুতর ছিল চিঠি পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যম। এখন সেই কবুতর হয়ে উঠেছে গুপ্তচর। কবুতরের বুকের সঙ্গে বাঁধা হচ্ছে ক্যামেরা। মাথার ভেতরে বসানো হচ্ছে ক্ষুদ্র যন্ত্র। আর দূর থেকে একে নিয়ন্ত্রণ করে ওড়ানো হচ্ছে। শুনতে কল্পবিজ্ঞানের মতো মনে হলেও এটি বাস্তব। রাশিয়ার একদল বিজ্ঞানী এমন এক প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছেন, যেখানে জীবন্ত পাখিকে রূপ দেওয়া হচ্ছে ‘জীব–ড্রোন’ হিসেবে।

এই প্রকল্পের নাম ‘পিজেন-১’। মস্কোভিত্তিক প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান নেইরি গ্রুপ এই গবেষণার পেছনে কাজ করছে। তাদের দাবি, এই বিশেষভাবে নিয়ন্ত্রিত কবুতরগুলো সাধারণ ড্রোনের তুলনায় অনেক বেশি কার্যকর। কারণ, এরা অনেক দূর পর্যন্ত উড়তে পারে। দীর্ঘ সময় আকাশে থাকতে পারে। এমন সব জায়গায় ঢুকতে পারে, যেখানে যান্ত্রিক ড্রোন পৌঁছাতে পারে না।

প্রযুক্তির ভেতরের গল্পটাও বেশ চমকপ্রদ। কবুতরের মাথার খুলি ভেদ করে সূক্ষ্ম ইলেকট্রোড বসানো হয়েছে, যা একটি উদ্দীপ্তকারী যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত থাকে। এই যন্ত্রের মাধ্যমে দূরে বসে থাকা অপারেটর কবুতরের মস্তিষ্কে সংকেত পাঠাতে পারেন। ডানে বা বাঁয়ে ঘোরার নির্দেশ দিতে পারেন। কবুতরের পিঠে থাকে সৌরশক্তিচালিত একটি ছোট ব্যাগ, যেখানে ফ্লাইট নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা থাকে এবং বুকের ক্যামেরার সঙ্গে সংযোগ থাকে। এর ফলে পাখিটি কোথায় যাচ্ছে, কী দেখছে—সবকিছু সরাসরি দেখা সম্ভব হয়।

আরও পড়ুন

নেইরি গ্রুপের দাবি, এই কবুতরগুলো দিনে ৩০০ মাইলের বেশি পথ অতিক্রম করতে পারে। এদের ব্যবহার করা হতে পারে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো পর্যবেক্ষণ, শিল্পকারখানা পরিদর্শন, সীমাবদ্ধ আকাশসীমায় কাজ করা কিংবা উদ্ধার অভিযানে সহায়তা করতে।

তবে এই প্রযুক্তি নিয়ে প্রশ্ন আছে। প্রতিষ্ঠানটি একে বেসামরিক কাজে ব্যবহারের কথা বললেও বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, এটি সহজেই সামরিক কাজে ব্যবহার করা হতে পারে। বিশেষ করে গোপন নজরদারি বা যুদ্ধক্ষেত্রে এর ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

ভবিষ্যতে বড় পাখির ওপরও এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হতে পারে। যেমন কাক, সামুদ্রিক পাখি কিংবা আরও বড় আকারের পাখির ক্ষেত্রে। যেন বেশি ওজন বহন করা যায় এবং ভিন্ন পরিবেশে সহজে মিশে যাওয়া সম্ভব হয়। উপকূলীয় স্থাপনা পর্যবেক্ষণে একধরনের পাখি, সমুদ্রের গভীরে নজরদারিতে অন্য ধরনের পাখি ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

এই জীব-ড্রোন প্রযুক্তি এরই মধ্যে রাশিয়া, দুবাই ও ভারতের আগ্রহের জায়গা হয়ে উঠেছে। এমনকি বিদ্যুৎ লাইনের ওপর নজরদারির জন্যও এটি ব্যবহারের প্রস্তাব এসেছে।

আরও পড়ুন

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির স্নায়ুবিজ্ঞান বিভাগের এক অধ্যাপক এবং প্রতিরক্ষা পরামর্শক জেমস জিওর্দানো মনে করেন, তাত্ত্বিকভাবে এই ধরনের জীব-ড্রোন শত্রু অঞ্চলে রোগ ছড়ানোর কাজেও ব্যবহার করা যেতে পারে, যা আরও বড় উদ্বেগের কারণ।

এই প্রযুক্তি শুধু পাখির ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হচ্ছে, এমন নয়। ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়া এরই মধ্যে প্রশিক্ষিত ডলফিন ব্যবহার করছে সমুদ্রঘাঁটি রক্ষায়। এমনকি ঘোড়ার পিঠে বসানো ইন্টারনেট যন্ত্রের মাধ্যমেও যুদ্ধক্ষেত্রে যোগাযোগ বিস্তারের চেষ্টা হয়েছে।

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে নেইরি দাবি করে, তারা বিশ্বের প্রথম এমন একটি ইঁদুর তৈরি করেছে, যার মস্তিষ্ক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে যুক্ত
ছবি: পেক্সেলস

নেইরি গ্রুপের অর্থায়ন নিয়েও সন্দেহ আছে। একটি স্বাধীন অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটি প্রায় এক বিলিয়ন রুবল অর্থ পেয়েছে, যার বড় অংশ এসেছে ক্রেমলিন-সংযুক্ত উৎস থেকে। এই অর্থের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এসেছে ‘ন্যাশনাল টেকনোলজি ইনিশিয়েটিভ’ নামের একটি কর্মসূচি থেকে, যা ২০১৪ সালে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন চালু করেছিলেন। এ ছাড়া রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ তহবিলের সঙ্গে যুক্ত বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান থেকেও অর্থ এসেছে বলে ধারণা করা হয়।

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে নেইরি দাবি করে, তারা বিশ্বের প্রথম এমন একটি ইঁদুর তৈরি করেছে, যার মস্তিষ্ক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে যুক্ত। এই ইঁদুর নাকি অনলাইন তথ্য ব্যবহার করে কি–বোর্ডের মাধ্যমে প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে। এর আগে তারা গরুর মস্তিষ্কে পরিবর্তন এনে দুধ উৎপাদন বাড়ানোর পরীক্ষার কথাও জানিয়েছিল।

যদি এই গবেষণা সফল হয়, তবে রাশিয়া হবে বিশ্বের অল্প কয়েকটি দেশের একটি, যারা কার্যকর জীব-ড্রোন প্রযুক্তি তৈরি করতে পেরেছে। গত বছর চীনের বিজ্ঞানীরাও অত্যন্ত হালকা মস্তিষ্ক নিয়ন্ত্রণযন্ত্র ব্যবহার করে মৌমাছির ওড়া নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়েছেন।

তবে নেইরি গ্রুপ নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করে বলেছে, তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে যেন এই প্রযুক্তি শুধু বেসামরিক কাজে ব্যবহার করা হয় এবং কোনো গোপন বা দ্বিতীয় উদ্দেশ্যে যেন ব্যবহৃত না হয়।

সূত্র: দ্য টেলিগ্রাফ

আরও পড়ুন