চোর ধরে ল্যাম্পপোস্টে বাঁধছেন মেক্সিকান ব্যাটম্যান

ল্যাম্পপোস্টের সঙ্গে টেপ দিয়ে পেঁচিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে কয়েকজনকে। চিৎকার করতে যাতে না পারে, সে জন্য মুখটাও বাঁধা। আর তাদের সামনে রাখা মোটরসাইকেল। এমন কিছু ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ ভাইরাল হয়। কিন্তু কে করছে এমন কাজ? আর কেন দিচ্ছে এমন অদ্ভুত শাস্তি?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সেসব ছবি ও ভিডিও মেক্সিকোর জালিস্কো রাজ্যের। সেখানে এক রহস্যময় ব্যক্তি নিজে থেকেই অপরাধীদের শাস্তি দিচ্ছেন। তিনি মোটরসাইকেলচোরদের ধরে ল্যাম্পপোস্ট সঙ্গে ডাক্ট টেপ দিয়ে বেঁধে রাখছেন। এই অদ্ভুত কাজের জন্য মেক্সিকোর মানুষ স্প্যানিশে তাঁকে ‘লাগোস দে মোরেনোর ব্যাটম্যান’ নামে ডাকতে শুরু করেছে, যার মানে মেক্সিকান ব্যাটম্যান।

দেশটির পশ্চিমাঞ্চলীয় জালিস্কো রাজ্যের পুলিশ এখন এই রহস্যময় ব্যক্তিকে খুঁজছে। কারণ, ইতিমধ্যে অন্তত পাঁচজনকে এভাবে ল্যাম্পপোস্টের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছে। শুধু বেঁধে রাখাই নয়, চোরদের কপালে স্প্যানিশ ভাষায় ‘রাতেরো’ লিখে দেওয়া হয়েছে, যার বাংলা অর্থ চোর। অপরাধীদের শাস্তি দেওয়ার ধরনটি ছিল বেশ অদ্ভুত। কারও কারও মুখে বিড়ালের মতো গোঁফ ও দাড়ি এঁকে দেওয়া হয়।

এখানেই শেষ নয়; বেঁধে রাখা এই চোরদের পাশে একটি করে সতর্কবার্তা লিখে রাখা হয়েছিল। আর তারা যে সাইকেলগুলো চুরি করার চেষ্টা করছিল, সেগুলোকেও প্রমাণ হিসেবে তাদের ঠিক কাছাকাছি ফেলে রাখা হয়েছিল।

আরও পড়ুন

এই অদ্ভুত ঘটনার শুরু হয় গত ১৩ জুন লাগোস দে মোরেনো শহরে। সেদিন প্রথম এক ব্যক্তিকে ল্যাম্পপোস্টের সঙ্গে বাঁধা অবস্থায় পাওয়া যায়। তার বুকের ওপর ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল একটি কার্ডবোর্ডের সাইনবোর্ড, যাতে লেখা ছিল, সে একজন চোর। এরপরের দিনগুলোয় ঠিক একইভাবে আরও চারজন লোককে শহরের বিভিন্ন জায়গায় খুঁটির সঙ্গে বাঁধা অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।

দেখে মনে হচ্ছিল, ল্যাম্পপোস্টে বাঁধার আগে তাদের বেশ মারধর করা হয়েছে। কারণ, উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের শরীরে কাটার দাগ, কালশিটে ও মুখে রক্ত লেগে ছিল। এ ঘটনার পেছনে থাকা রহস্যময় ব্যক্তিকে মেক্সিকোর নামকরা সাংবাদিক লুইস কার্দেনেস প্রথম ‘লাগোস দে মোরেনোর ব্যাটম্যান’ নাম দেন। এর পর থেকেই নামটি সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে।

স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানায়, এই ব্যক্তির আসল পরিচয় এখনো জানা যায়নি। তবে শহরের দুর্বল আইনব্যবস্থা ও পুলিশের নিষ্ক্রিয়তায় হতাশ হয়েই তিনি কমিক বইয়ের চরিত্রের মতো নিজে অপরাধীদের শাস্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ছবিতে দেখা যায়, দুজন লোককে একটি খুঁটির সঙ্গে পিঠাপিঠি করে ডাক্ট টেপ দিয়ে শক্ত করে বেঁধে রাখা হয়েছে। তাদের মাথার ওপরে ঝুলছে একটি গোলাপি রঙের সতর্কবার্তা এবং সামনে প্রমাণ হিসেবে রাখা আছে একটি বাইক।

মেক্সিকোর ওই রাজ্যের নিরাপত্তাসচিব হুয়ান পাবলো হার্নান্দেজ জানিয়েছেন, পুলিশ এখন পর্যন্ত এ ধরনের পাঁচটি ঘটনা নথিবদ্ধ করেছে। এই কাজগুলো যারা করেছে, পুলিশ এখন তাদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে। গোয়েন্দারা পুরো বিষয় খতিয়ে দেখছেন। যেসব তরুণকে মোটরসাইকেল ও বাইসাইকেল চুরির অপবাদে সতর্কবার্তাসহ খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছিল, সেই ঘটনাগুলো নিয়েই মূলত তদন্ত চলছে।

আরও পড়ুন

কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বেঁধে রাখা লোকদের বিরুদ্ধে চুরির যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তা তারা তদন্ত করে দেখছে। তবে সরকারি আইনজীবীরা পরিষ্কার করে বলেছেন, আইনের চোখে এই মুহূর্তে তারা হামলার শিকার বা ভুক্তভোগী। কারণ, অপরাধ প্রমাণ হওয়ার আগেই তাদের ওপর বেআইনিভাবে হামলা করা হয়েছে ও আটকে রাখা হয়েছে।

খবর পেয়ে জরুরি উদ্ধারকর্মীরা এসে ওই লোকদের বাঁধন কেটে মুক্ত করেন। আর তাদের শরীরে থাকা আঘাতের চিকিৎসা করেন। তবে কথিত চুরির অপরাধে তাদের বিরুদ্ধে পুলিশ আলাদা কোনো তদন্ত শুরু করেছে কি না, তা এখনো জানা যায়নি। এ ঘটনায় জড়িত অভিযোগে পুলিশ এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। তবে পুলিশ জানিয়েছে, তারা দুটি গাড়ি শনাক্ত করেছে, যেগুলো এই চোরদের ধরে বেঁধে রাখার ঘটনার সঙ্গে জড়িত বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।

মেক্সিকোয় অপরাধের হার অনেক বেশি। শুধু ২০২৩ সালেই সেখানে ৩৬ হাজারের বেশি গাড়ি ছিনতাই হয়েছে। দেশটিতে মোটরবাইক ও সাইকেল চুরি এখন নিত্যদিনের ঘটনা। সরকারি হিসাবমতে, মেক্সিকোর প্রায় ৭০ শতাংশ অপরাধের সঙ্গেই কোনো না কোনো মোটরবাইক জড়িত থাকে। চোরেরা এই বাইকগুলো ব্যবহার করে পরে আরও বড় অপরাধ করে।

যে জালিস্কো রাজ্যে চোরদের ল্যাম্পপোস্টে বেঁধে রাখা হচ্ছে, সেটি মেক্সিকোর অন্যতম প্রধান চুরির এলাকা। পাশের মেক্সিকো রাজ্য আর এই জালিস্কো শুধু এই দুটি রাজ্যেই দেশের অর্ধেকের বেশি চুরির ঘটনা ঘটে।

সূত্র: ইয়াহু নিউজ, স্ট্রেইটস টাইমস
আরও পড়ুন