বেতন পান না কোচ, নিজেরাই খাবার কিনে খাচ্ছেন সেনেগাল দলের খেলোয়াড়েরা

ইরাকের জালে পাঁচ গোল করে উদ্‌যাপন সেনেগালের খেলোয়াড়দের। ইরাকের বিপক্ষে ম্যাচটি ৫–০ গোলে জেতে সেনেগালরয়টার্স

খেলোয়াড়দের জন্য বরাদ্দ পর্যাপ্ত টাকা নেই, চুক্তি নেই দলের কোচের। এমনকি খাবারও নিজেদের কিনে খেতে হচ্ছে। ফুটবল বিশ্বকাপের মতো এত বড় আসরে কোনো দলের এমন দশা হতে পারে? আফ্রিকার অন্যতম সেরা দল সেনেগাল এখন এমন এক সংকটের মুখোমুখি।

এত সব ঝামেলা থাকার পরও ঠিকই গ্রুপ পর্ব পেরিয়েছে সেনেগাল। ফ্রান্স, নরওয়ের মতো শক্তিশালী দলের সঙ্গে হেরেও সেরা ৩২ দলের মধ্যে জায়গা করে নিয়েছে সেনেগাল। অভাব অনটন আর মানসিক চাপের মধ্যে দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন সেনেগালের খেলোয়াড়েরা। কিন্তু কেন তাঁদের এমন অবস্থা?

বিশ্বকাপের শুরু থেকেই সেনেগাল দলের ভেতরে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। দলটির প্রধান কোচ পাপে থিয়াও বেশ কয়েক মাস ধরে কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি ছাড়াই দলের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।

এখানেই শেষ নয়। জানা গেছে, সেনেগাল দলের খেলোয়াড়েরা ফেডারেশন থেকে বরাদ্দ খাবারের মান নিয়ে ক্রমাগত অভিযোগ করছেন। বাধ্য হয়ে তাঁরা বাইরে থেকে খাবার আনিয়ে খাচ্ছেন। পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার বড় কারণ হলো, নিজেদের পেশাদার শেফ ছাড়াই দলটি বিশ্বকাপে অংশ নিতে এসেছে।

আরও পড়ুন

এর আগে মরক্কোয় অনুষ্ঠিত আফ্রিকা কাপ অব নেশনস চলাকালীনও সেনেগালের কোচ ও সে দেশের ফুটবল ফেডারেশনের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ উঠেছিল। সেই ঘটনার কয়েক মাস পার হতে না হতেই আবারও একই ধরনের প্রশাসনিক সংকট তৈরি হয়েছে।

বিশ্বকাপ মিশনে সেনেগাল দল
সেনেগাল ফুটবল

আফ্রিকান ফুটবল কনফেডারেশন অবশ্য মরক্কোর সেই টুর্নামেন্টকে ইতিহাসের সেরা আয়োজন বলে দাবি করেছিল। কিন্তু আয়োজক দেশের তীব্র সমালোচনা করে সেনেগাল দল বলেছিল, সেখানে খেলোয়াড়দের সুরক্ষার জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা ছিল না।

যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বকাপ খেলতে এসে সেনেগাল দল ও তাদের কোচ থিয়াও বেশ কিছু অব্যবস্থাপনার মুখোমুখি হয়েছেন। আমেরিকার বিমানবন্দরে নামার পর থেকেই একের পর এক সমস্যার সম্মুখীন হন তাঁরা। বিমানবন্দরে খুব কড়াভাবে তল্লাশি করা হয় সেনেগালের খেলোয়াড়দের। আন্তর্জাতিক ফুটবলারদের জন্য এই অভিজ্ঞতা ছিল বেশ অস্বস্তিকর।

বিশ্বমানের এই খেলোয়াড়দের সুরক্ষার জন্য যে ধরনের কড়া নিরাপত্তা দরকার ছিল, তা দেওয়া হয়নি। তাদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা ছিল খুবই সাধারণ। পাশাপাশি দলের হোটেল, যাতায়াত ও অফিশিয়াল নানা বিষয় নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। মাঠের খেলার বাইরের এসব ঝামেলা ও অব্যবস্থাপনা সেনেগাল দলের খেলোয়াড়দের মানসিক প্রস্তুতিকে বেশ কঠিন করে তুলেছে।

কাতারের বিপক্ষে ম্যাচের আগে এভাবেই ধরা পড়লেন জাতীয় পতাকায় নিজেকে সাজিয়ে আনা এক সেনেগাল সমর্থক
ছবি: রয়টার্স

স্পোর্ট নিউজ আফ্রিকা জানিয়েছে, বিশ্বকাপে দলের পেছনে খরচ কমানোর জন্য কঠোর নিয়ম তৈরি করেছে সেনেগালের ফুটবল ফেডারেশন। আর এই খরচ বাঁচানোর চক্করে পড়ে দলটি কোনো শেফ ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্রে এসেছে। তবে শেফ না থাকার অভাবটি সরাসরি টের পাচ্ছেন খেলোয়াড়েরা। হোটেলের যে খাবার দেওয়া হচ্ছে, তা আন্তর্জাতিক মানের তো নয়ই, বরং খুবই সাধারণ। বিশ্বমঞ্চে খেলার জন্য খেলোয়াড়দের শরীরে যে পুষ্টি প্রয়োজন, এই খাবারে তা সম্ভব নয়। তাই বাধ্য হয়ে অনেক খেলোয়াড় হোটেল থেকে খাবার আনিয়ে খাচ্ছেন।

আরও পড়ুন

খেলোয়াড়দের এই কষ্টের পেছনে ফেডারেশনের চরম বৈষম্যকে দায়ী করেছে অনেক খেলোয়াড়। যেখানে দেশের হয়ে খেলতে যাওয়া ফুটবলাররা হোটেলের নিম্নমানের খাবার খেয়ে দিন কাটাচ্ছেন, সেখানে যুক্তরাষ্ট্রে রাজকীয় জীবন যাপন করছেন সেনেগাল ফুটবল ফেডারেশনের কিছু কর্মকর্তা।

পাঁচ ম্যাচ নিষিদ্ধ হয়েছেন সেনেগালের কোচ পাপে থিয়াও
এএফপি

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ফুটবল ফেডারেশনের এই বড় কর্মকর্তারা নিজেদের পরিবার আর আত্মীয়স্বজনকে নিয়ে গিয়েছেন। আর তাঁদের আমেরিকা ঘোরার সব খরচ দেওয়া হচ্ছে ফেডারেশনের তহবিল থেকে। ফলে কোনো কারণ ছাড়াই ফুটবল ফান্ডের বিপুল পরিমাণ টাকা অপচয় হচ্ছে। ’১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপেও ফেডারেশনের কর্মকর্তারা ঠিক একইভাবে টাকার অপচয় করেছিলেন।

শুধু খাবারের সমস্যাই নয়, প্রধান কোচ পাপে থিয়াওয়ের কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তিও নেই। সঙ্গে তিনি গত পাঁচ মাস ধরে কোনো বেতনও পাননি। কোচের আগের চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতির একটুও উন্নতি হয়নি। সেনেগালের রাষ্ট্রপতি নিজে এ সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দেওয়া সত্ত্বেও ফুটবল ফেডারেশন কোচের নতুন চুক্তিতে সই করতে এখনো অস্বীকৃতি জানাচ্ছে।

একমাত্র গোলে জিতেছিল সেনেগাল
এএফপি

অবশ্য কোচ থিয়াও নিজেও কয়েক মাস আগে মরক্কোয় অনুষ্ঠিত আফকনের ফাইনালে এক চরম বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ম্যাচ চলাকালীন বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির অজুহাত তুলে তিনি দল নিয়ে মাঠ থেকে ওয়াক অফ করেন। সেদিন থিয়াও দল নিয়ে মাঠ ছেড়ে দেওয়ায় সেনেগালের সমর্থকেরা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। তাঁরা গ্যালারি থেকে মাঠে ঢোকার চেষ্টা করেন, নিরাপত্তারক্ষীদের ওপর হামলা চালান এবং স্টেডিয়ামের বিভিন্ন জিনিসপত্র ভাঙচুর করেন।

এ ঘটনার পর গত মার্চ মাসে ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা ‘সিএএফ’ নিয়ম অনুযায়ী মরক্কোকে জয়ী ঘোষণা করে। কারণ, সেনেগাল দল খেলার মাঝপথে মাঠ ছেড়ে নিয়ম অমান্য করেছিল। সেনেগাল অবশ্য সিএএফের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করেছে ও ক্রীড়া আদালত ‘সিএএস’-এর হস্তক্ষেপ চেয়েছে।

সূত্র: ইয়াহু স্পোর্টস
আরও পড়ুন