রোদে রাখা প্লাস্টিক বোতলের পানি পান করা কেন ক্ষতিকর
বেশি রোদে প্লাস্টিকের বোতল রেখে দিলে কী হয়? অনেকে বলবে, রোদ লাগলে পানি শুধু একটু গরম হয়, এর বেশি কিছু না। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানী ও রসায়নবিদেরা বলছেন অন্য কথা। তাঁরা পরীক্ষা করে দেখেছেন, বেশি গরমে বা কড়া রোদে রাখলে প্লাস্টিকের বোতলে রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটে। প্লাস্টিক তৈরির সময় অ্যান্টিমনি নামের একটি ধাতু ব্যবহার করা হয়। দীর্ঘ সময় প্লাস্টিকের বোতল রোদে বা গরমে থাকলে এই অ্যান্টিমনি ও অন্যান্য ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ বোতলের পানির সঙ্গে মিশে যায়।
গবেষকেরা জানিয়েছেন, প্লাস্টিক বোতলের পানি গরম হলে প্লাস্টিক থেকে ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান পানিতে মিশে যায়। তাপমাত্রা যত বাড়ে, এই ক্ষতিকর উপাদানগুলো তত দ্রুত পানির সঙ্গে মিশতে থাকে। পরীক্ষা করে দেখা গেছে, বোতল বেশি গরম হলে বিসফেনল এ (বিপিএ) নামের একটি ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান পানিতে মিশে যায়। কিন্তু রোদে রাখলে প্লাস্টিকের ভেতর আসলে কী ঘটে এবং কেন এই পানি পান করা ক্ষতিকর?
প্লাস্টিকের পানির বোতল কী দিয়ে তৈরি হয়
সাধারণত যেসব প্লাস্টিকের পানির বোতল ব্যবহার করি, সেগুলো পলিইথিলিন টেরেফথালেট বা সংক্ষেপে পিইটি (PET) প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি। যেকোনো ঠান্ডা পানীয় বা তরল খাবার রাখার জন্য এই প্লাস্টিক সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। এই প্লাস্টিক গলিয়ে আবার নতুন বোতল বা পাত্র তৈরি করা যায়। তবে একবার ব্যবহারযোগ্য এই প্লাস্টিক যেমন পরিবেশের ক্ষতি করে, তেমনি শরীরের জন্যও ক্ষতিকর হতে পারে।
লন্ডনের ব্রুনেল ইউনিভার্সিটির পরিবেশ গবেষক এলেনি ইয়াকোভিডু বিষয়টা নিয়ে গবেষণা করছেন। তিনি জানান, প্লাস্টিকের বোতল শুধু প্লাস্টিক দিয়েই তৈরি হয় না। বোতলগুলোকে শক্ত ও নির্দিষ্ট আকৃতি দেওয়ার জন্য এর সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক উপাদান মেশানো হয়। ২০২২ সালের একটি গবেষণায় তিনি ও তাঁর দল জানার চেষ্টা করেন, বোতলের প্লাস্টিক থেকে কোনো রাসায়নিক উপাদান পানির সঙ্গে মিশে যায় কি না।
গবেষণায় দেখা গেছে, প্লাস্টিকের বোতলে থাকা বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান আসলেই পানির সঙ্গে মিশে যায়। তবে একেক বোতলে এর পরিমাণ একেক রকম থাকে। এই উপাদানগুলো শরীরের কী ধরনের ক্ষতি করে, তা নিয়ে এখনো গবেষণা চলছে। পৃথিবীর অনেক গরম দেশে ট্যাপের পানি পানের যোগ্য নয় বলে মানুষ বোতলের পানির ওপর নির্ভর করে। তাই তাদের স্বাস্থ্য নিরাপত্তার কথা ভেবেই বিজ্ঞানীরা এই পরীক্ষা করেছিলেন।
গবেষক ইয়াকোভিডু বলেন, পিইটি প্লাস্টিকের বোতলকে কোনোভাবেই কড়া রোদ বা বেশি গরমে রাখা উচিত নয়। কারণ, বেশি গরমে এই প্লাস্টিকের ভেতরের গঠন দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ক্ষতিকর রাসায়নিকগুলো দ্রুত পানিতে মিশে যায়।
গরম প্লাস্টিকের বোতলের পানি পানের স্বাস্থ্যগত প্রভাব কী
গবেষণায় দেখা গেছে, প্লাস্টিকের বোতল বা পাত্র থেকে বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান ভেতরের খাবার ও পানিতে মিশে যায়। এর মধ্যে থ্যালেট এস্টার নামের একটি উপাদান মানুষের শরীরের হরমোনব্যবস্থার ক্ষতি করে। তবে অন্য রাসায়নিকগুলো আমাদের শরীরের ঠিক কী কী ক্ষতি করে, তা পুরোপুরি জানতে বিজ্ঞানীরা এখনো কাজ করছেন। মানুষ প্রতিদিন আরও অনেক মাধ্যম থেকে রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসে বলে নির্দিষ্ট করে এর প্রভাব বোঝা কিছুটা কঠিন।
তাই বিশেষজ্ঞরা প্লাস্টিকের পাত্রে রাখা খাবার ও পানীয় কম ব্যবহারের পরামর্শ দেন। বিশেষ করে প্লাস্টিকের পাত্র গরম করা একদমই উচিত নয়। কারণ, তাপ লাগলে প্লাস্টিক থেকে ক্ষতিকর রাসায়নিক খুব দ্রুত খাবারে ছড়ায়। এ ছাড়া টকজাতীয় খাবার কিংবা ফলের রস এবং চর্বিজাতীয় খাবার প্লাস্টিকের সংস্পর্শে এলে এই রাসায়নিক ছড়ানোর হার আরও বেড়ে যায়।
পানির বোতল সংরক্ষণের সেরা উপায় কী
গবেষকেরা জানান, বোতলের পানি সব সময় ঠান্ডা ও অন্ধকার জায়গায় রাখা উচিত। এমনকি ঘরের আলমারি যদি বেশি গরম হয়, তবে সেখান থেকেও প্লাস্টিকের রাসায়নিক উপাদান পানিতে মিশে যেতে পারে।
আন্তর্জাতিক বোতলজাত পানি সংস্থা (আইবিডব্লিউএ) জানায়, বোতলের পানি ঘরের স্বাভাবিক বা এর চেয়ে কম তাপমাত্রায় রাখা ভালো। কোনোভাবেই এটি সরাসরি রোদে রাখা যাবে না।
বিজ্ঞানীদের পরীক্ষায় দেখা গেছে, তাপমাত্রা ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি গেলেই প্লাস্টিক থেকে রাসায়নিক উপাদান পানিতে মিশতে শুরু করে। আর তাপমাত্রা ৩০ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে উঠলে এই ক্ষতিকর উপাদানগুলো আরও দ্রুত পানিতে ছড়ায়। এই কারণে গবেষকেরা নিজেরা প্লাস্টিকের বোতল বাদ দিয়ে ধাতুর তৈরি বোতল ব্যবহার করেন।
তাই গরমের দিনে সুস্থ থাকতে প্লাস্টিকের বোতল বা পাত্র সরাসরি রোদে রাখা যাবে না। আর বোতলের পানি গরম হলে বা রোদে থাকলে সেখান থেকে পানি পান করা যাবে না।