রাজকীয় পাখি ‘লেডি আর্মহার্স্টস ফেজেন্ট’
আমরা সাধারণত কাক, শালিক, দোয়েল কিংবা চড়াই নিয়েই বেশি ভাবি। কিন্তু পৃথিবীতে এমন কিছু পাখি আছে, যা দেখলে মনে হয় যেন প্রকৃতি একটু বাড়াবাড়িই করে ফেলেছে। লেডি আর্মহার্স্টের ফেজেন্ট ঠিক তেমনই এক পাখি। প্রথম দেখায় মনে হতে পারে, কেউ যেন রং দিয়ে আঁকা কোনো রাজকীয় চরিত্রকে হঠাৎ জীবন্ত করে দিয়েছে।
এই পাখির পুরুষটাকে দেখলে সত্যিই চোখধাঁধিয়ে যায়। গাঢ় সবুজ পালকে আলো পড়লে কোথাও কোথাও নীলচে ঝিলিক দেখা যায়। মাথার ওপর লাল আর হলুদের ছোপ, যেন ছোট্ট একটা মুকুট। ঘাড়ের চারপাশে সাদা-কালো ডোরাকাটা কলারের মতো পালক, যা প্রজনন মৌসুমে আরও ফুলে ওঠে। আর এর লেজ বেশ দীর্ঘ। অনেক সময় ৮০ সেন্টিমিটারেরও বেশি। হাঁটার সময় লেজটা মাটির ওপর দুলতে থাকে, যেন ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে কোনো রাজদরবারের নর্তক।
সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, একই প্রজাতির স্ত্রী পাখিটিকে দেখলে মনে হবে সে যেন সম্পূর্ণ অন্য কেউ। তার গায়ে নেই সেই রঙের বিস্ফোরণ। বাদামি আর ধূসর মিশ্রিত পালক, শরীরে হালকা কালো দাগ। বনজঙ্গলের শুকনা পাতার সঙ্গে এমনভাবে মিশে যায় যে খুঁজে পাওয়াই কঠিন। প্রকৃতি এখানে দুই রকম কাজ করেছে—একজনকে দিয়েছে প্রদর্শনের সৌন্দর্য, অন্যজনকে দিয়েছে অদৃশ্য হয়ে থাকার ক্ষমতা।
এই পাখির সঙ্গে জড়িয়ে আছেন একজন বাস্তব মানুষ—সারা আর্মহার্স্ট। উনিশ শতকের শুরুর দিকে তিনি ভারতে এসেছিলেন তার স্বামী উইলিয়াম পিট আর্মহার্স্টের সঙ্গে। তখন ব্রিটিশ শাসনের সময়। তার স্বামী ছিলেন ভারতের গভর্নর-জেনারেল।
সারা আর্মহার্স্ট প্রকৃতিকে সত্যি সত্যিই ভালোবাসতেন। সে সময়ের বহু ইউরোপীয় ভ্রমণকারীর মতো শুধু দূর থেকে গাছপালা দেখে মুগ্ধ হয়ে থেমে থাকেননি। তিনি নোট রাখতেন, নমুনা সংগ্রহ করতেন, বিভিন্ন উদ্ভিদ নিয়ে লিখতেন। ভারতের বোটানিক্যাল গার্ডেন, পাহাড়ি অঞ্চল, বন—এসব জায়গায় ঘুরে ঘুরে তিনি শত শত উদ্ভিদের নমুনা সংগ্রহ করেছিলেন। ইংল্যান্ডে ফেরার সময় তার সঙ্গে ছিল প্রায় পাঁচ শ ধরনের উদ্ভিদের সংগ্রহ।
ফেজেন্টগুলোর গল্পও সেখান থেকেই শুরু
বার্মার আভা রাজ্যের রাজা তাঁকে উপহার দিয়েছিলেন এই বিরল পাখি। পরে সেই পাখিগুলো খুব যত্ন করে ইংল্যান্ডে পাঠানো হয়। ধারণা করা হয়, ইউরোপে এই প্রজাতির প্রথম আগমন তখনই।
লন্ডনে পাখিগুলো পৌঁছানোর পর ছোটখাটো আলোড়ন পড়ে যায়। সে সময় ইউরোপে বিদেশি পাখি আর প্রাণী নিয়ে প্রবল আগ্রহ ছিল। কিন্তু এই ফেজেন্টকে দেখে অনেকেই বিস্মিত হয়ে গিয়েছিল। এত লম্বা লেজ, এত অদ্ভুত রঙের মিশ্রণ—এটা যেন পরিচিত কোনো পাখির মতোই নয়। প্রকৃতিবিদ, সংগ্রাহক, অভিজাত সমাজ—সবাই এই পাখি নিয়ে কথা বলতে শুরু করল।
শেষ পর্যন্ত পাখিটার নাম রাখা হলো ‘লেডি আর্মহার্স্টস ফেজেন্ট’। এক অর্থে, এটা ছিল সারার প্রতি সম্মান জানানো। কারণ, তার মাধ্যমেই ইউরোপ প্রথম এই পাখির সঙ্গে পরিচিত হয়েছিল।
আজও এই পাখির মূল আবাস চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পাহাড়ি বন। বিশেষ করে যুনান আর সিচুয়ান অঞ্চলে। বাঁশঝাড় আর ঘন জঙ্গলে তারা থাকতে পছন্দ করে। দিনের বেশিরভাগ সময় মাটিতে খাবার খোঁজে—বীজ, ছোট পোকামাকড়, কচি পাতা। কিন্তু সন্ধ্যা নামলে তারা গাছের উঁচু ডালে উঠে যায়। নিচের অন্ধকার বনে শিকারির অভাব নেই।
অদ্ভুত ব্যাপার হলো, এত রঙিন হওয়ার পরও বনের ভেতরে তাদের খুঁজে পাওয়া সহজ নয়। আলো-ছায়ার ভেতর তাদের পালকের রং অদ্ভুতভাবে ভেঙে যায়। দূর থেকে চোখ এড়িয়ে যায় সহজেই। উপরন্তু, তারা বেশ লাজুক স্বভাবের। মানুষ দেখলে দ্রুত সরে যায়।
এই সুন্দর পাখিটিও আজ নিরাপদ নয়। বনভূমি কমে যাচ্ছে। পাহাড়ি অঞ্চলে মানুষের বসতি বাড়ছে। কোথাও কোথাও শিকারও বড় সমস্যা। ফলে বনে এদের সংখ্যা আগের তুলনায় কমে গেছে।
তবে সবটাই হতাশার নয়। পৃথিবীর বিভিন্ন চিড়িয়াখানায় এবং সংরক্ষণ কেন্দ্রে এই পাখিকে নিয়ে কাজ হচ্ছে। প্রজনন কর্মসূচিও চালু আছে। চিনের কিছু এলাকায় তাদের আবাসস্থল রক্ষার চেষ্টাও চলছে।