প্রায় ভুলে যাওয়া এক ফলের নাম পুতিজাম
পুতিজাম এখন আর তেমন পাওয়া যায় না। এক প্রজন্ম আগেই যেটা ছিল নাগালে, এখন সেটা প্রায় অচেনা এক ফলে পরিণত হয়েছে। এটা দূর দেশের কোনো ফল নয়। বাংলাদেশের বিল-জলাভূমির ধারেই এর বাড়ি ছিল। ছিল সবার হাতের নাগালে।
ফলটা আসলে বিরল কিছু নয়। হিজল, করচ, জারুল, কদম, চালতার পাশাপাশি পুতিজামও লাগানো হতো নিচু জমিতে, যেখানে বছরের কিছুটা সময় পানি জমে থাকত। কারণ একটাই, এই গাছগুলোর শিকড় পানিতে ডুবে থাকলেও মরে না। সব গাছ এই কষ্ট সহ্য করতে পারে না।
তো ফলটা গেল কোথায়? উত্তর খুঁজতে গিয়ে ফলের দিকে তাকানোর দরকার নেই আসলে, তাকাতে হবে বিলের দিকে। গত চার দশকে দেশের অনেক বিল একে একে ভরাট হয়ে গেছে। কোথাও বাড়ি উঠেছে, কোথাও রাস্তা। ঢাকার আশপাশের বেলাই, শালদহ, লবণধলার মতো বড় বিলও বাদ যায়নি এই পরিবর্তনের হাত থেকে। জলাভূমি কমে গেলে পাখি বা মাছ তো বাসা হারায়ই, সঙ্গে হারিয়ে যায় হিজল-করচ-পুতিজামের মতো গাছগুলোও। এদের টিকে থাকাটাই নির্ভর করত সেই ভেজা মাটির ওপর।
বাঘ হারিয়ে গেলে আমরা খবর পাই, প্রতিবাদ হয়, প্রচারণা চলে। একটা ফলের নাম মুখ থেকে হারিয়ে গেলে কেউ টের পায় না। কোনো লাল তালিকায় এটা ওঠে না। পুতিজাম তেমন। বইয়ের পাতায় নেই, পুরোনো মানুষদের মুখেও আর তেমন শোনা যায় না। এখন এর নামটাও কারও মুখে আর নেই।
এই ফলের আরেকটা নাম বুটিজাম। বাংলাদেশের বুনো ফলের জগতে এমন উদাহরণ অনেক। টিপাফলকে কোনো এলাকায় বলে লুকলুকি, কোথাও পেলাগোটা, কোথাও পায়েলা। এক ফল, কয়েক গ্রাম পার হতেই অন্য নাম। এই বৈচিত্র্যটাই গ্রামবাংলার এক রকম পরিচয় ছিল, প্রতিটা এলাকার মানুষ প্রকৃতিকে চিনত তার নিজের ভাষায়।
আসলে এই নাম-বৈচিত্র্যের পেছনে একটা বিজ্ঞানসম্মত হিসাবও আছে। পুতিজামের বৈজ্ঞানিক নাম Syzygium fruticosum, আর এই গণের সবচেয়ে পরিচিত সদস্য হলো জাম, যার নাম Syzygium cumini। মানে পুতিজাম জামের একদম জাতভাই, একই Myrtaceae পরিবারের সন্তান, খালি প্রজাতিতে আলাদা। গাছটা বেশি বড় হয় না, ১০ থেকে ১২ মিটারের মতো, পাতাগুলো লম্বাটে আর চকচকে। ফুল ফোটে চৈত্র-বৈশাখে, ছোট আর সাদা, তেমন নজর কাড়ে না। ফল আসে জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ়ে, মটর দানার মতো ছোট, পাকলে কালো বা বেগুনি হয়ে যায়। নামটাও কিন্তু একেক জাতিগোষ্ঠীর কাছে একেক রকম, চাকমা ভাষায় একে বলে ‘পত্তি জাম’, মারমা ভাষায় আবার সম্পূর্ণ ভিন্ন শব্দ। যেন একটাই গাছ, অথচ দেশের ভেতরেই তার নাম বদলে যায় বারবার। অনেকটা নদীর মতো। এক জায়গায় এক রং।
গুগলে এখন ‘পুতিজাম’ লিখে সার্চ দিলে খুব বেশি কিছু পাবে না, ছবি কম, লেখাও কম। অথচ এই ফল কয়েক দশক আগে এত সাধারণ ছিল যে আলাদা করে লিখে রাখার কথা কারও মাথায় আসেনি।
গল্পটা পুরো দুঃখের নয় যদিও। বিল-জলাভূমি বাঁচানোর কথা এখন আবার উঠছে, পরিবেশকর্মীরাও সরব হচ্ছেন একটু একটু করে। বিল বাঁচলে মাছ-পাখি বাঁচবে, আর সুযোগ পাবে হিজল-করচ-পুতিজামের মতো গাছগুলোও।
বাড়িতে আজ একবার জিজ্ঞেস করে দেখো। মা বা বাবা, যিনি গ্রামে বড় হয়েছেন, তাঁকে নামটা বলো। প্রথমে হয়তো কিছুক্ষণ ভেবে নেবেন। তারপর হুট করে মনে পড়বে, কোন বিলের ধারে গাছটা ছিল, কীভাবে স্কুল পালিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে গিয়ে পেড়ে খেতেন। কয়েক মিনিটের ওই কথাতেই ফলটা আবার বেঁচে উঠবে, অন্তত তাঁদের স্মৃতিতে।