জাকারবার্গের মেটাভার্স এখন কোথায়

ম্যাকডোনাল্ডসের সুযোগ হাতছাড়া করায় খুব একটা ক্ষতি হয়নি মার্ক জাকারবার্গেরফেসবুক

২০২১ সালে মার্ক জাকারবার্গ যখন ঘোষণা দিলেন পৃথিবী বদলাবে, তখন ব্যাপারটা অনেকটা সিনেমার ট্রেলারের মতো লেগেছিল। ভার্চ্যুয়াল অফিস, ডিজিটাল জমি, অ্যাভাটার বানিয়ে কনসার্টে যাওয়ার মতো ব্যাপারগুলো শুনতে দারুণ লেগেছিল। টেক–দুনিয়া সরব হয়ে উঠেছিল এসব আলোচনায়। তখন বিনিয়োগকারীরা ছুটলেন মেটায় বিনিয়োগ করার জন্য। সাধারণ মানুষ ভাবল, এবার বোধ হয় সত্যিই কিছু হতে যাচ্ছে। কফিশপে বসে মানুষ তর্ক করছিল। ইউটিউবে ভিডিও বানানো হচ্ছিল। পত্রিকায় কলাম লেখা হচ্ছিল। একটা গুঞ্জন উঠেছিল, ইন্টারনেটের পরের অধ্যায় শুরু হচ্ছে। মনে হচ্ছিল, আর কয়েক বছরের মধ্যেই হয়তো স্কুলের ক্লাস হবে ভার্চ্যুয়াল ক্লাসরুমে, বন্ধুরা আড্ডা দেবে ডিজিটাল ক্যাফেতে। কিন্তু সেসবের ‘কিছুই’ আর হলো না।

৪৬ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ ব্যর্থ হলো

ফেসবুকের নাম বদলে মেটা হওয়ার পর থেকে কোম্পানিটা মেটাভার্সে ঢেলেছে প্রায় ৪৬ বিলিয়ন ডলার। সংখ্যাটা বেশ বড়। সহজ করে বললে, এটা বাংলাদেশের একটা বড় বার্ষিক বাজেটের কাছাকাছি। এত টাকা ঢেলে মেটা কী পেল? তৈরি হয়েছিল হরাইজন ওয়ার্ল্ডস। এটা একটা প্ল্যাটফর্ম, যেখানে মানুষের ভার্চ্যুয়াল প্রতিলিপি বা অ্যাভাটার থাকে। কিন্তু এই অ্যাভাটারের পা নেই। দেহটা আছে। কোমর থেকে নিচে কিছু নেই। কোম্পানির কর্মীরাই বলেছিল, এই ভার্চ্যুয়াল জায়গাটা থাকার মতো নয়। থাকতে বিরক্তিকর লাগে। বাইরে থেকে যতটা চকচকে দেখাচ্ছিল, ভেতরে ততটাই ফাঁকা।

এ বছরের শুরুতে মেটা নিজেদের রিয়েলিটি ল্যাবস থেকে হাজারের বেশি কর্মী ছাঁটাই করেছে। মার্ক জাকারবার্গ এখন এআই নিয়ে ব্যস্ত। মেটাভার্স এখন একটা অস্বস্তিকর অধ্যায়। যেটা নিয়ে কেউ বেশি কথা বলতে চায় না।

আরও পড়ুন
মেটাভার্স দুনিয়ায় জাকারবার্গ
মেটা

মেটাভার্স এখন ফাঁকা, ভুতুড়ে শহর

মেটাভার্সের আরেকটা দিক হলো ডিসেন্ট্রাল্যান্ড। ব্লকচেইনভিত্তিক ভার্চ্যুয়াল দুনিয়া। মানুষ এতে লাখ টাকা দিয়ে ডিজিটাল জমি কিনেছে। ধারণাটা রোমাঞ্চকর ছিল। কিন্তু ২০২৫ সালে একজন সাংবাদিক সেখানে ঢুকে লিখলেন, এটা ভূতের শহর। রাস্তা আছে, দোকান আছে, মানুষ নেই। এমন একটা শপিং মলের কথা ভাবো, দোকানগুলো খোলা, আলো জ্বলছে, কিন্তু কেউ আসে না। সন্ধ্যা হয়, রাত হয়, কেউ আসে না। এনএফটি দিয়ে কেনা সেই জমির দাম এখন তলানিতে। যারা বিনিয়োগ করেছিল, তারা এখন চুপ।

প্রযুক্তিটা সঠিক ছিল না। সমস্যা ছিল সময়ের। আর গল্পটা বাস্তবতার চেয়ে অনেক বড় করে বলা হয়েছিল। হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের আগে চিকিৎসকেরা এখন ভিআরে প্র্যাকটিস করেন। কারখানায় নতুন কর্মীদের ট্রেনিং হচ্ছে ভার্চ্যুয়াল পরিবেশে। রোবলক্সে প্রতিদিন সাত কোটির বেশি মানুষ ঢোকে। এদের বেশির ভাগই তোমার বয়সী। এটাও একধরনের মেটাভার্স, শুধু নামটা আলাদা। মেটাভার্সে শুধু হাইপটা নেই।

আরও পড়ুন
মেটাভার্স
রয়টার্স

চাহিদা ছাড়াই চলে এসেছে প্রযুক্তি

স্মার্টফোন এসেছিল তখন, যখন মানুষ ছবি তুলতে আর বার্তা পাঠাতে চাইছিল। একটা চাহিদার কারণে স্মার্টফোন তৈরি হয়েছে। মেটাভার্স এসেছিল উল্টো পথে। আগে মঞ্চ বানাও, পরে দেখা যাবে মানুষ কেন আসবে। ভিআর হেডসেট এখনো ভারী, দামি, বেশিক্ষণ পরলে মাথা ধরে। অ্যাপলের ভিশন প্রো দেখতে চমৎকার, কিন্তু দাম তিন হাজার ডলার। বাংলাদেশি টাকায় তিন লাখের বেশি। ঢাকায় বসে সেটার কথা ভাবা বিলাসিতা অনেকের জন্য।

মানুষ আসলে ভার্চ্যুয়াল দুনিয়া চায়নি। চেয়েছিল যোগাযোগ, বিনোদন, সহজ কিছু। সেটা টিকটক দিয়েছে, ইউটিউব দিয়েছে, হোয়াটসঅ্যাপ দিয়েছে। মেটাভার্সের অ্যাভাটার দিয়ে নয়।

মেটাভার্স এখনো বন্ধ হয়ে যায়নি। কিন্তু যা বলা হয়েছিল, তা হয়নি। এআর চশমা আসছে ধীরে ধীরে। এআই মিলিয়ে ভার্চ্যুয়াল পরিবেশ আরও স্বাভাবিক হচ্ছে। হয়তো কয়েক বছর পর পেছন ফিরে বলা যাবে, ওটাই শুরু ছিল, শুধু সময়মতো পারেনি। ২০২১ সালে বড় গল্পটা এত জোরে বলা হয়েছিল যে বাস্তবতা পাল্লা দিয়ে এগোতে পারেনি।

সূত্র: লাইভ সায়েন্স, পিসিম্যাগ
আরও পড়ুন