তৈরি হচ্ছে নতুন মহাকাশ স্টেশন, থাকা যাবে আরও বেশি সময়
সায়েন্স ফিকশন মুভিতে যেমন গোল চাকার মতো মহাকাশ স্টেশন ঘুরতে দেখা যায়, বাস্তবেও ঠিক তেমন স্টেশন বানানোর কাজ শুরু হয়েছে। খুব শিগগিরই কৃত্রিম মাধ্যাকর্ষণ বল থাকা এই মহাকাশ স্টেশনগুলো মহাকাশচারীদের সৌরজগতের অনেক গভীরে ভ্রমণের সুযোগ করে দেবে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রাইভেট কোম্পানি ভাস্ট (Vast) মহাকাশে থাকার জন্য একটি বিশাল বাসস্থান তৈরি করছে। এই স্টেশনটি মহাকাশে লাটিমের মতো বনবন করে ঘুরবে। বিজ্ঞানের নিয়মে, কোনো গোল জিনিস যখন জোরে ঘোরে, তখন তার ভেতরের জিনিস বাইরের দিকে ছিটকে যেতে চায়। একে বলে কেন্দ্রমুখী বল। এই ঘোরার শক্তিকে কাজে লাগিয়েই মহাকাশে পৃথিবীর মতো নকল টান বা মাধ্যাকর্ষণ তৈরি করা হবে।
মহাকাশে ভেসে থাকার দৃশ্য দেখতে খুব মজার হলেও, দীর্ঘদিন শূন্য মাধ্যাকর্ষণে ভেসে থাকলে মানুষের শরীরের ভীষণ ক্ষতি হয়। পৃথিবীতে আমাদের শরীরে যে বল কাজ করে, মহাকাশে তা না থাকায় মানুষের হাড় নরম হয়ে যায় আর মাংসপেশি দুর্বল হয়ে পড়ে। কিন্তু এই নতুন স্টেশনে কৃত্রিম মাধ্যাকর্ষণ থাকায় মহাকাশচারীরা পৃথিবীর মতোই স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে চলতে পারবেন। ফলে শরীরের ক্ষতি না করে তারা মহাকাশে বছরের পর বছর কাটাতে পারবেন, যা ভবিষ্যতে মঙ্গল গ্রহে যাওয়ার পথ সহজ করে দেবে।
ভাস্ট কোম্পানির কর্মকর্তা টম শেলি জানান, এই কৃত্রিম মাধ্যাকর্ষণ সুবিধার কারণেই মানুষ মহাকাশের আরও নতুন নতুন জায়গায় পৌঁছাতে পারবে। যেহেতু সেখানে হাড় ও মাংসপেশি ক্ষয়ের ভয় থাকবে না, তাই মানুষ নিশ্চিন্তে মহাকাশে দীর্ঘ সময় কাটিয়ে নতুন সব আবিষ্কার করতে পারবে। তাদের এই প্রজেক্টের আসল উদ্দেশ্যই হলো মহাকাশের কঠিন পরিবেশে মানুষকে সুস্থভাবে দীর্ঘদিন বাঁচিয়ে রাখা।
ঘূর্ণমান কৃত্রিম মাধ্যাকর্ষণযুক্ত মহাকাশ স্টেশনের ধারণাটি প্রথম দিয়েছিলেন রাশিয়ার রকেট বিজ্ঞানী কনস্টানটিন সিওলকোভস্কি। পরবর্তী সময়ে জার্মান-আমেরিকান মহাকাশবিজ্ঞানী ওয়ার্নার ভন ব্রাউন এ ধারণাটি নিয়ে আরও কাজ করেন। এ স্টেশনটির কাজের পদ্ধতি বেশ সহজ। মহাকাশ স্টেশনটি যখন মহাকাশে ঘুরতে থাকবে, তখন একটি বহির্মুখী বল সৃষ্টি হবে। এই শক্তিটি মহাকাশচারীদের স্টেশনের মেঝের দিকে ঠেলে দেবে। স্টেশনটি যদি একদম সঠিক গতিতে ঘোরে, তবে এই বলটিকে পৃথিবীর স্বাভাবিক মাধ্যাকর্ষণ বলের মতোই মনে হবে।
বর্তমানে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে থাকা নভোচারীরা মাইক্রোগ্র্যাভিটি অনুভব করে মহাকাশযানে ভেসে থাকেন। এর কারণ হলো, মহাকাশযানটি পৃথিবীর চারপাশে অনবরত মুক্তভাবে পড়তে থাকে। অন্যদিকে, চাঁদে ভ্রমণের মতো মহাকাশ অভিযানের সময় মহাকাশচারীরা পুরোপুরি শূন্য মাধ্যাকর্ষণ অনুভব করেন।
মাধ্যাকর্ষণ ছাড়া দীর্ঘদিন বেঁচে থাকা মানুষের শরীরের জন্য খুবই ক্ষতিকর। এর ফলে মানুষের হাড় ও মাংসপেশি ক্ষয় হয়, হৃৎপিণ্ড দুর্বল হয়ে পড়ে, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বদলে যায় এবং দৃষ্টিশক্তি ও চিন্তাভাবনা করার ক্ষেত্রে সমস্যা দেখা দেয়। এই স্বাস্থ্যগত সমস্যাগুলো দূর করতে বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে স্টেশন ঘুরিয়ে কৃত্রিম মাধ্যাকর্ষণ তৈরির চেষ্টা করছেন। এতকাল এই প্রযুক্তিটি কেবল ‘২০০১: এ স্পেস ওডিসি’র মতো সায়েন্স ফিকশন মুভিতে দেখা যেত।
তবে বর্তমানে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এই কৃত্রিম মাধ্যাকর্ষণ ব্যবস্থা নিয়ে বাস্তবে কাজ শুরু করেছে। রাশিয়ার রকেট কোম্পানি এনার্জিয়া একটি মহাকাশ ঘাঁটির পরিকল্পনা জমা দিয়েছে, যা প্রতি মিনিটে পাঁচবার ঘুরবে। এর ফলে সেখানে পৃথিবীর প্রায় ৫০ শতাংশ মাধ্যাকর্ষণ বল তৈরি হবে।
এই লক্ষ্যে আগামী বছর তাদের প্রথম মহাকাশ বাসস্থান মডিউল ‘হ্যাভেন-১’ উৎক্ষেপণের বড় পরিকল্পনা রয়েছে। এরপর ২০৩০ সালের মধ্যে তারা একটি পূর্ণাঙ্গ মহাকাশ স্টেশন ‘হ্যাভেন-২’ চালু করতে চায়। এই প্রাথমিক ধাপগুলো শেষ হওয়ার পর তারা তাদের মূল কৃত্রিম মাধ্যাকর্ষণ স্টেশন তৈরির কাজ শুরু করবে, যা পুরোপুরি শেষ হতে আরও এক দশক বা তার বেশি সময় লাগতে পারে।
নতুন এই মহাকাশ স্টেশনটিতে একসঙ্গে ৪০ জন কর্মী থাকতে পারবেন। এটি প্রতি মিনিটে ৩ দশমিক ৫ বার করে ঘুরবে। আর এই ঘূর্ণনের ফলে সেখানে কৃত্রিম মাধ্যাকর্ষণ তৈরি হবে। ভাস্টের কর্মকর্তা টম শেলি এই মিশনটিকে মাউন্ট এভারেস্ট জয়ের মতোই এক রোমাঞ্চকর অভিযান বলে মনে করেন।
এই স্টেশনে মূলত স্টেম সেল ও প্রোটিন ক্রিস্টাল তৈরির মতো গুরুত্বপূর্ণ জৈব বৈজ্ঞানিক গবেষণা করা হবে। এখানে আসা সাধারণ মানুষেরাও এই গবেষণায় অবদান রাখতে পারবেন। মহাকাশচারীরা তাঁদের শরীর পরীক্ষা করিয়ে বিভিন্ন নমুনা এবং বায়োমেট্রিক ডেটা একটি বড় তথ্যভান্ডারে জমা দিতে পারবেন। এর ফলে বিজ্ঞানীরা বিস্তারিতভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন যে মহাকাশের বিশেষ পরিবেশে বিভিন্ন ধরনের মানুষের শরীর ঠিক কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়।
মহাকাশ স্টেশন ঘুরিয়ে মাধ্যাকর্ষণ তৈরি করার এই ধারণাটি কিন্তু বেশ পুরোনো। ১৯৭৫ সালে নাসা ও স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় মিলে স্ট্যানফোর্ড টোরাস নামে এক মাইলেরও বেশি ব্যাসের একটি বলয়াকার বা ডোনাট আকৃতির স্টেশনের নকশা করেছিল, যেখানে ১০ হাজার মানুষের স্থায়ীভাবে বসবাসের পরিকল্পনা ছিল। পরবর্তী সময়ে ২০১১ সালেও নাসা নটিলাস-এক্স নামের একটি ঘূর্ণমান চাকা আকৃতির মহাকাশ স্টেশন তৈরির কাজ শুরু করে। তবে পর্যাপ্ত বাজেট বা তহবিলের অভাবে শেষ পর্যন্ত নাসার সেই প্রকল্পটি বাতিল হয়ে যায়।