সব কোকিল কালো নয়
রথীন্দ্রনাথ রায়ের একটা গান আছে—
‘কোকিলা কালো বলে গান শোনে না কে?’
গানটা আক্ষরিক অর্থে ভুল। কোকিলের গান সুন্দর, কোকিলার নয়। আবার কোকিলা কালোও নয়। তবে কোকিল অর্থাৎ পুরুষ কোকিল কালো। এখানেও ভুল করেছেন গীতিকার।
বসন্তকালে কোকিলের প্রজনন মৌসুম শুরু হয়। কোকিল যাযাবর পাখি। এরা ঘর বাঁধে না। অন্য পাখির বাসায় ডিম পাড়ে। কাক, শালিক বা ছাতারে পাখির ডিমগুলো খেয়ে স্ত্রী কোকিল সেই বাসায় ডিম পাড়ে।
কোকিল একাকী চরে বেড়ানো পাখি। কখনো পুরুষ আর স্ত্রী কোকিল জুটি বাঁধে না। সারা বছর স্ত্রী আর পুরুষে তেমন দেখাও হয় না। যেটুকু দেখা, সেটা ওই বসন্তকালে ঘর বাঁধার মৌসুমেই।
কোকিল খুব লাজুক পাখি। মানুষকে এড়িয়ে চলে। লোকালয়ে এলেও এদের দেখা পাওয়া কঠিন। বড় বড় গাছের ঘন পাতার আড়ালে লুকিয়ে থাকে। বসন্তকালে ঘন পাতার আড়াল থেকেই ‘কুউউ…কুউউউ!’ স্বরে ডাকে। চারপাশে অসংখ্য পুরুষ কোকিলের ডাক শোনা যায়। যার কণ্ঠ যত সুন্দর, স্ত্রী কোকিল তার কাছেই ছুটে যায়। তারপর প্রজননের পর আবার দুজনের গন্তব্য দুদিকে।
কোকিলের গান যেটাকে বলি, এটা মোটেও এদের আসল ডাক নয়। এটা প্রজননকালীন স্ত্রী-ভোলানো গান। স্ত্রী পাখিই–বা গান শুনে ভুলবে কেন? চারপাশে অসংখ্য পুরুষ গান গায়। এই গানের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর আর সবচেয়ে জোরালোটাই স্ত্রী পাখি পছন্দ করে। আরও একটা ব্যাপার লুকিয়ে থাকে গানের মধ্যে। স্ত্রীকে আকর্ষণের পাশাপাশি প্রতিদ্বন্দ্বী পুরুষদেরও ধমকে দেয় এই গানের মাধ্যমে।
কোকিলের স্বাভাবিক ডাক বেশ কর্কশ। ‘কাউপ, কাউপ…’ স্বরে এরা ডাকে, ঝগড়া করে।
অর্থাৎ কোকিলের যে গান, সেটা শুধু পুরুষ কোকিলই গাইতে পারে। স্ত্রী কোকিল নয়।
আবার রং আর চেহারাতেও বিস্তর ফারাক। পুরুষ কোকিল মিশমিশে কালো। দেখতে সুন্দর। স্ত্রী কোকিলের গায়ের রং কালচে বাদামি, তার ওপর অসংখ্য সাদা ফুটকি। লেজ ও পেটের দিকে সাদা ডোরা। সুতরাং স্ত্রী কোকিল কালো নয়।
আবার কোকিল গোত্রের আরও পাখি আছে। যেমন পান্না কোকিল। এদের গায়ের রং পান্না সবুজ।
আবার মালকোয়া নামের আরেক ধরনের কোকিল আছে। গভীর অরণ্যে দেখা যায়। সাদাটে-ধূসর এদের গায়ের রং। বউ কথা কও, চোখগেলসহ সব রকম পাপিয়া কোকিল গোত্রের পাখি। এদের বেশির ভাগের গায়ের রং ধূসর।
শুধু এশীয় কোকিল বা দেশি কোকিলের পুরুষের গায়ের রং কালো। স্ত্রী কোকিল পুরোপুরি কালো নয়। মোটকথা কোকিলা কালো নয়, আবার সব কোকিল কালো নয়।