বিদেশি ভাষা বুঝি, কিন্তু মুখে ভালো বলতে পারি না কেন
ইংরেজি বা অন্য কোনো বিদেশি ভাষায় মুভি দেখে প্রতিটি শব্দ তুমি খুব পরিষ্কার বুঝতে পারো। এমনকি কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে তোমার মাথার ভেতর সেই ভাষার একটি চমৎকার উত্তরও তৈরি হয়ে যায়! কিন্তু বাস্তবে যখন মুখ ফুটে কথাটা বলতে যাও, তখনই যেন সব শব্দ হারিয়ে যায়। হয়তো ভদ্রতা করে মাথা নেড়ে একটু লাজুক হেসে চুপচাপ বসে থাকো।
কিন্তু কেন এমন হয়? শব্দগুলো তো তোমার মগজেই ছিল, তবে ঠোঁট গলে বাইরে এল না কেন?
আমরা অনেকেই ভাবি, আমাদের শব্দভান্ডার দুর্বল কিংবা আমার হয়তো ইংরেজি গ্রামারটা ঠিকমতো শেখা হয়নি। কিন্তু আসল সত্যিটা হলো, এর পেছনে তোমার মেধা বা যোগ্যতার কোনো ঘাটতি নেই। পুরো ব্যাপারটা লুকিয়ে আছে মনোবিজ্ঞানের দারুণ এক খেলায়। চলো, সেই নীরবতার পেছনের বিজ্ঞান এবং তা থেকে বের হয়ে আসার জাদুকরি উপায়গুলো জেনে নিই।
ভুল করার ভয়ে তুমি যত বেশি চুপ করে থাকবে, নীরবতা তোমার কাছে ততটাই সহজ মনে হতে থাকবে। একসময় এই নীরবতাই তোমার একটা বাজে অভ্যাসে পরিণত হবে। তুমি নিজেকেই বোঝাতে শুরু করবে, ‘আমি আসলে একটু লাজুক স্বভাবের, আমি কথা বলার চেয়ে অন্যের কথা শুনতেই বেশি পছন্দ করি।’
কথাগুলো হয়তো কিছুটা সত্যি। মানুষের স্বভাব এখানে একটু প্রভাব ফেলেই। কিন্তু এটাই পুরো গল্প নয়। মনোবিজ্ঞান ও ভাষাবিজ্ঞানে একটি চমৎকার ধারণা আছে, যাকে বলা হয় উইলিংনেস টু কমিউনিকেট। অর্থাৎ যোগাযোগের সদিচ্ছা। অন্য ভাষায় কথা বলতে পারার মূল চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে এখানেই।
দোকানে গিয়ে কিছু কেনা, রিকশাওয়ালা মামাকে কিছু বলা বা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের সঙ্গে কথা বলা দিয়ে শুরু করতে পারো।
কিন্তু উইলিংনেস টু কমিউনিকেট কী জিনিস? সহজ কথায় বলতে গেলে, তুমি একটি ভাষার কতগুলো শব্দ জানো, তার ওপর তোমার কথা বলা নির্ভর করে না, বরং সুযোগ পেলে তুমি সেই ভাষায় কথা বলার সিদ্ধান্ত নিচ্ছ কি না, তার ওপর নির্ভর করে। অনেকেই যোগাযোগের সদিচ্ছাকে নার্ভাসনেস বা উদ্বেগের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেন। কিন্তু দুটি জিনিস একেবারেই আলাদা।
কথা বলার আগে বুক ধড়ফড় করা, গলা শুকিয়ে যাওয়া বা মাথা ফাঁকা হয়ে যাওয়া হলো নার্ভাসনেস। এগুলো আমাদের শরীরের প্রাচীন অ্যালার্ম সিস্টেম, যা আমাদের জানান দেয়, ‘সাবধান! তুমি কিন্তু এখন ভুল করতে পারো। সবাই তোমাকে নিয়ে হাসাহাসি করতে পারে!’
অন্যদিকে যোগাযোগের সদিচ্ছা হলো একটি ঐচ্ছিক সিদ্ধান্ত। অ্যালার্ম বাজার পরও, নার্ভাসনেস থাকার পরও তুমি যখন ঝুঁকি নিয়ে মুখ ফুটে কথা বলার সিদ্ধান্ত নাও, সেটাই হলো উইলিংনেস টু কমিউনিকেট।
মাতৃভাষায় কথা বলার সময় আমাদের এই সদিচ্ছা সাধারণত স্থায়ী থাকে। কিন্তু ভিনদেশি ভাষার ক্ষেত্রে এটি পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে বারবার বদলায়। হয়তো খুব কাছের কোনো বন্ধুর সঙ্গে তুমি ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে দারুণ আড্ডা দিতে পারো, কিন্তু স্কুলের শিক্ষকের সামনে গেলেই বোবা হয়ে যাও! কারণ, তখন তোমার মনের ভেতর নেতিবাচক মূল্যায়নের ভয় কাজ করে।
দ্য ম্যাট্রিক্স মুভিটার কথা মনে আছে? সেখানে প্রধান চরিত্র নিওকে দুটি বড়ি দেওয়া হয়েছিল। নীল বড়িটি খেলে সে তার পরিচিত, নিরাপদ কিন্তু মিথ্যা এক জগতেই রয়ে যাবে। আর লাল বড়িটি খেলে সে এক অজানা, অস্বস্তিকর কিন্তু বাস্তব জগতে প্রবেশ করবে।
অন্য ভাষায় কথা বলার ক্ষেত্রেও তোমার মনের ভেতর ঠিক এই ঘটনাটিই ঘটে। নীল বড়ি হলো তোমার নীরবতা। তুমি মাথা নাড়বে, হাসবে এবং নিজের সম্মান বাঁচিয়ে চুপচাপ থাকবে। এটি নিরাপদ ঠিকই, কিন্তু এতে কোনো উন্নতি নেই।
ভাষার পেছনের সংস্কৃতির প্রতি যখন তোমার ভালোবাসা জন্মাবে, তখন ভেতর থেকেই কথা বলার তাগিদ আসবে।
আর লাল বড়ি হলো তোমার সাহস। তুমি হয়তো ভুল ব্যাকরণে কথা বলবে, মানুষ হয়তো হাসবে, কিন্তু তুমি ভাষার আসল জগতে প্রবেশ করবে। জুলিয়াস সিজার যেমন রোমের আইন ভেঙে রুবিকন নদী পার হয়ে বলেছিলেন, ‘দ্য ডাই ইজ কাস্ট’ (যা হওয়ার হবে, ফিরে যাওয়ার কোনো পথ নেই!), ঠিক তেমনি অন্য ভাষায় কথা বলতে চাইলে তোমাকেও সাহসের সঙ্গে নিজের নীরবতার রুবিকন নদীটি পার হতেই হবে।
তবে যোগাযোগের এই সদিচ্ছাকে চাইলেই রাতারাতি বদলানো যায় না। এটি নির্ভর করে তোমার আত্মবিশ্বাস, পরিবেশ এবং অভ্যাসের ওপর। তবে বিজ্ঞানভিত্তিক এই ১০টি ছোট ছোট কৌশল অনুসরণ করলে তুমি খুব সহজেই নিজের ভেতরের এই ভয়কে জয় করতে পারবে:
১. ছোট ছোট জয়ে আত্মবিশ্বাস বাড়াও
প্রথম দিনেই বিশাল কোনো প্রেজেন্টেশন দেওয়ার দরকার নেই। প্রতিদিন অন্তত একটি বা দুটি বাক্য নির্দিষ্ট ভাষায় বলার চেষ্টা করো। দোকানে গিয়ে কিছু কেনা, রিকশাওয়ালা মামাকে কিছু বলা বা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের সঙ্গে কথা বলা দিয়ে শুরু করতে পারো। এই ছোট ছোট সফল কথোপকথনগুলো তোমার মস্তিষ্ককে বোঝাবে, ‘ভুল ভাষায় কথা বললে দুনিয়া ধ্বংস হয়ে যায় না!’
২. শরীরকে শান্ত করতে শেখাও
ভয় বা উদ্বেগ হলো একধরনের আদিম শারীরিক প্রতিক্রিয়া। কথা বলার আগে যদি বুক ধড়ফড় করে, তবে লম্বা করে শ্বাস নাও এবং কাঁধ রিলাক্স করো। শরীরকে বোঝাও, তুমি কোনো বিপদে নেই। ধীরে ধীরে পরিচিত মানুষদের সঙ্গে কথা বলে এই নার্ভাসনেস কাটানোর অভ্যাস করো।
৩. ভুল মানেই অপমান নয়
আমরা আসলে ভুল করতে ভয় পাই না, আমরা ভয় পাই মানুষের হাসাহাসি ও অপমানকে। কিন্তু মনে রাখবে, ভাষা হলো যোগাযোগের মাধ্যম, কোনো পারফরম্যান্স নয়। কেউ যদি তোমার ভুল ধরিয়ে দেয়, তবে হাসিমুখে তাকে ধন্যবাদ দিয়ো। ভুলগুলোকেই তোমার শেখার হাতিয়ার বানিয়ে নাও।
প্রতিদিন অন্তত ১০ মিনিট বা কোনো একটি নির্দিষ্ট জায়গায় জোর করে ওই বিদেশি ভাষায় কথা বলার চেষ্টা করতে হবে। মস্তিষ্ককে জানান দাও যে এটাই তোমার নতুন স্বাভাবিক ভাষা।
৪. সংস্কৃতি ও আবেগের সঙ্গে যুক্ত হও
শুধু গ্রামার বই পড়ে ভাষা শেখা যায় না। যে ভাষা শিখতে চাও, সেই ভাষার মানুষের গল্প, গান, মুভি বা মিমস দেখো। ভাষার পেছনের সংস্কৃতির প্রতি যখন তোমার ভালোবাসা জন্মাবে, তখন ভেতর থেকেই কথা বলার তাগিদ আসবে।
৫. নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রাখো
সব শব্দ তোমার জানা থাকবে না, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু অজানা পরিস্থিতিতে পড়লে কীভাবে তা সামাল দিতে হয়, তা শিখে নাও। যেমন ‘Could you repeat that?’ (কথাটা কি আরেকবার বলবেন?) বা ‘How do you say...?’ (এটাকে আপনারা কীভাবে বলেন?)। এই ছোট ছোট বাক্য তোমার জন্য ‘লাইফবোট’ হিসেবে কাজ করবে।
৬. নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করো
এমন মানুষের সঙ্গে কথা বলার চর্চা করো, যারা তোমার ভুল নিয়ে হাসবে না, বরং তোমাকে উৎসাহ দেবে। ল্যাঙ্গুয়েজ ক্লাব বা এমন কোনো গ্রুপে যোগ দাও, যেখানে সবাই তোমার মতোই শিখতে এসেছে। ভয়হীন পরিবেশেই ভাষার সবচেয়ে ভালো বিকাশ ঘটে।
৭. সহজ ভাষার ফাঁদ থেকে বের হও
আমরা প্রায়ই একটু আটকে গেলেই মাতৃভাষায় বা নিজের ‘কমফোর্ট জোন’-এর ভাষায় ফিরে যাই। এই অভ্যাসটা বাদ দিতে হবে। প্রতিদিন অন্তত ১০ মিনিট বা কোনো একটি নির্দিষ্ট জায়গায় জোর করে ওই বিদেশি ভাষায় কথা বলার চেষ্টা করতে হবে। মস্তিষ্ককে জানান দাও যে এটাই তোমার নতুন স্বাভাবিক ভাষা।
এক মাস পর যখন তুমি সেই ডায়েরি খুলে দেখবে, তখন নিজের ছোট ছোট জয়গুলো দেখে তোমার আত্মবিশ্বাস এমনিতেই বেড়ে যাবে!
৮. কল্পনায় নিজেকে কথা বলতে দেখো
মস্তিষ্ক কল্পনা এবং বাস্তবের মধ্যে খুব একটা পার্থক্য করতে পারে না। চোখ বন্ধ করে কল্পনা করো, তুমি খুব সাবলীলভাবে, হাসিমুখে এবং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সেই ভাষায় কথা বলছ। এই মানসিক মহড়া তোমার বাস্তব জীবনের আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।
৯. পরিচিত বিষয় দিয়ে শুরু করো
শুরুতেই জলবায়ু পরিবর্তন বা দেশের অর্থনীতি নিয়ে ইংরেজিতে তর্ক করতে যাবে না! তোমার দৈনন্দিন জীবন, শখ, প্রিয় খাবার বা প্রিয় মুভি নিয়ে কথা বলো। চেনা বিষয় নিয়ে কথা বলতে গেলে মস্তিষ্কের ওপর চাপ কম পড়ে এবং কথা অনেক সহজেই মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে।
১০. নিজের উন্নতির হিসাব রাখো
ফোনের নোটপ্যাডে বা ডায়েরিতে লিখে রাখো, তুমি আজ কার সঙ্গে সেই বিদেশি ভাষায় কথা বলেছ এবং তোমার কেমন লেগেছে। এক মাস পর যখন তুমি সেই ডায়েরি খুলে দেখবে, তখন নিজের ছোট ছোট জয়গুলো দেখে তোমার আত্মবিশ্বাস এমনিতেই বেড়ে যাবে!
শেষ কথা
অন্য ভাষায় কথা বলতে পারার সদিচ্ছা কোনো জন্মগত প্রতিভা নয়। এটি তোমার প্রতিদিনের ছোট ছোট সাহসের গল্প। প্রথম দিকে বুক ধড়ফড় করবে, হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসবে, তা আসুক। তারপরও কথা বলো। ভুল হোক, মানুষ হাসুক, তারপরও কথা বলো। এভাবেই একদিন দেখবে, ভয় জিনিসটা তোমার নাম ভুলে গেছে। আর তুমি সম্পূর্ণ নতুন এক আত্মবিশ্বাসী মানুষ হিসেবে নতুন এক ভাষায় নিজের কথাগুলো পৃথিবীর বুকে ছড়িয়ে দিচ্ছ!