বেলের খোসা এত শক্ত কেন
দুপুরবেলা গাছ থেকে একটা বেল পড়ল, শব্দটা পাথর ছুড়ে মারার শব্দের মতো। ধুপ করে একটা শব্দ হলো। বেলটা হাতে তুলে নিলে ভারী লাগে। প্রথম মাথায় এল, এটা আদৌ ফল? নাকি নারকেলের কোনো আত্মীয় ভুল করে এই গাছে ঝুলে পড়েছে। এত শক্ত যে ভাঙতে মনে হয় হাতুড়ি লাগবে। অথচ ভেতরটা অন্য রকম। নরম আর মিষ্টি গন্ধে ভরা।
বেলের জন্মভূমি খুঁজতে গেলে রাজস্থানের শুকনা টিলা বা মধ্যপ্রদেশের পাথুরে জমিতে পৌঁছাতে হয়। বৃষ্টি কম পড়ে ওখানে। রোদ পোড়ায়। এমন জায়গায় একটা ফলকে দুই দিক সামলাতে হয় একসঙ্গে। রোদ সেখানে পানি শুকিয়ে ফেলে। প্রাণীরা সেখানে ফলটাকে আগেই খেয়ে ফেলতে চায়। তাই বেল একরকম দুর্গ হয়ে উঠেছে। এই দুই প্রভাবের ফলে এভাবেই লাখো বছরে বেল শক্ত হয়ে তৈরি হয়েছে টিকে থাকার জন্য।
লিগনিন নামের একটা উপাদান জমে থাকে খোসার ভেতর। গাছের কাণ্ডকে লিগনিন শক্ত রাখে। ঠিক এটাই থাকে বেলে। সিলিকা আর ক্যালসিয়াম অক্সালেটের কণাগুলো কোষপ্রাচীরের ফাঁকফোকরে বসে যায় একসময়। কোষ একটার সঙ্গে আরেকটা এমন শক্ত করে জোড়া লাগে যে চাপ পড়লে ফাটল আর ছড়াতে পারে না বেশি দূরে।
নারকেলও শক্ত, কিন্তু এই শক্ত হওয়ার পেছনের কারণ আলাদা। নারকেল পানিতে ভাসতে চায়, দূরে কোথাও গিয়ে অঙ্কুরিত হওয়ার জন্য। এ কারণে খোসাটা বেশ হালকা থাকে। বেল সে পথে যায়নি। মাটিতে পড়ে থাকতে চায় সে, রোদে পুড়তে চায়, তবু বীজটাকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। তাই নারকেলে তন্তুর হালকা আস্তরণ, বেলে নিরেট দেয়াল।
নরম খোসা হলে একটা চড়ুই পাখিও ঠোকর মেরে বীজ অবধি পৌঁছে যেত। বেলের বর্ম সেই ছোটখাটো আক্রমণ ঠেকিয়ে দেয়। হাতির মতো বড় প্রাণী, যাদের দাঁত আর পায়ের চাপ যথেষ্ট বেশি, তারাই কেবল ভাঙতে পারে বেলের খোসা। হাতি খায় বেলের ভেতরের মজ্জা। তারপর মল দিয়ে বীজ ছড়িয়ে দেয় দূরে। এই ধরনের ফলকে মেগাফনাল ফল বলে। সমস্যা একটাই, সেই বিশাল প্রাণীদের বেশির ভাগ এখন আর নেই।
শুকনা মৌসুমে অন্য ফল পচে যায় রোদে। বেল তখনো গাছে ঝুলে থাকে। মাসের পর মাস, কখনো বছর পেরিয়েও। খোসাটা জলীয় বাষ্প আটকে রাখে ভেতরে। জীবাণু ঢুকতেও দেয় না সহজে। গ্রামের মানুষ এই জিনিসটা টের পেয়েছিল বহু আগে। বেল পেড়ে ঘরে রাখলে মাস পেরিয়ে গেলেও তেমন নষ্ট হয় না।
আমরা এখন হাতুড়ি দিয়ে ভাঙি, বা জোরে ছুড়ে মারি দেয়ালে। অনেকেই রোদে আরও কদিন ফেলে রাখে খোসাটা একটু ভঙ্গুর হওয়া পর্যন্ত।
ভাঙার পরও খোসাটার জীবন শেষ হয় না পুরোপুরি। শক্ত অর্ধেক খোলটা গ্রামে অনেক সময় ছোট বাটির মতো ব্যবহার হয়, বা রোদে শুকিয়ে রাখা হয় পরে কোনো কাজে লাগবে বলে। কেউ কেউ এটা দিয়ে ছোট পাত্র বানায়, ধূপ রাখার জন্য। তাক সাজানোর জন্য রাখে অনেকে। আয়ুর্বেদিক চর্চায় শুকনা খোসার গুঁড়া ব্যবহারের কথাও শোনা যায়। যে বর্মটা একসময় বীজ বাঁচানোর কাজ করত, ভাঙার পরও সে যেন সহজে বাতিল হতে চায় না।
বাংলাদেশের গ্রামে পুরোনো বাড়ির উঠানে এই গাছ প্রায়ই দেখা যায়। ডালপালা ছড়ানো, কাণ্ড বয়সের ভারে একটু হেলে থাকে। যে বিশাল প্রাণীদের জন্য এই বর্ম তৈরি হয়েছিল, তারা আর নেই অনেক দিন। খোসাটা তবু কঠিন রয়ে গেছে ঠিক আগের মতো। গাছের নিচে পড়ে থাকা একেকটা বেল যেন সেই পুরোনো হিসাবটা এখনো বয়ে বেড়াচ্ছে।
সূত্র: সায়েন্স ডিরেক্ট, লামস