গ্যাসের চুলার আগুন নীল না হয়ে কমলা হলে সাবধান
কিছু মানুষ প্রায় সব সময় গ্যাসের চুলা জ্বালিয়ে রাখেন। এটা ঠিক নয়; কারণ, গ্যাসের অপচয় হয়। তা ছাড়া সব সময় জ্বালিয়ে রাখা এই আগুন থেকে হতে পারে ভয়ংকর বিপদ। ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ অ্যান্ড পাবলিক হেলথ সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে শিশুদের হাঁপানির প্রায় ১৩ শতাংশই সরাসরি এই গ্যাসের চুলার কারণে হয়। এমনকি একদম নিখুঁতভাবে কাজ করা চুলা থেকেও অদৃশ্য ধোঁয়া বের হয়। তবে চুলার আগুনের রঙের দিকে একটু নজর দিলেই বড় ধরনের বিপদ থেকে বাঁচতে পারো।
চুলার আগুনের আসল রং কী হওয়া উচিত
সাধারণত গ্যাসের চুলার শিখা নীল রঙের হয়। প্রাকৃতিক গ্যাস পুড়লে নীল শিখার মাথায় হালকা সাদা আভা থাকাটা স্বাভাবিক। আবার লিকুইড প্রোপেন গ্যাস ব্যবহার করলে নীল শিখার মাথায় একটু হলুদ আভা থাকতে পারে।
নীল রঙের কারণ হলো, প্রাকৃতিক গ্যাসের সম্পূর্ণ দহন হচ্ছে এবং পুরো জ্বালানি সুন্দরভাবে পুড়ে তাপ, জলীয় বাষ্প ও কার্বন ডাই-অক্সাইডে পরিণত হচ্ছে। এই পরিষ্কার নীল শিখার আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য ছোট হয়। তাপমাত্রা হতে পারে ৩ হাজার ৫০০ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা প্রায় ১ হাজার ৯২৭ সেলসিয়াস পর্যন্ত। কাঠ পোড়ালে যেমন কালি ও কণা তৈরি হয় এবং ক্যাম্পফায়ারের মতো কমলা-লাল আগুন জ্বলে, তোমার গ্যাসে এমনটা হওয়া মোটেও উচিত নয়।
শিখার রং কমলা বা হলুদ হওয়ার মানে কী
চুলার আগুন যদি নীল না হয়ে কমলা বা হলুদ হয়ে যায়, তবে বুঝতে হবে কিছু সমস্যা আছে। একটানা হলুদ বা কমলা শিখার মানে, গ্যাসের অসম্পূর্ণ দহন হচ্ছে। চুলার বার্নার নোংরা হলে, ছিদ্র ব্লক থাকলে বা গ্যাস ও বাতাসের মিশ্রণ ঠিকমতো না হলে এমনটা হয়। এর ফলে মিথেন গ্যাস পুরোপুরি কার্বন ডাই-অক্সাইড ও জলীয় বাষ্পে পরিণত না হয়ে বাতাসের সঙ্গে মিশে যায়, যা মোটেও ভালো কথা নয়। বাতাসে থাকা ধুলোবালি বা ক্যালসিয়ামের মতো খনিজ পদার্থ পুড়লে মাঝেমধ্যে অল্প কমলা বা হলুদ শিখা দেখা যেতে পারে। কিন্তু শিখার বেশির ভাগ অংশই এমন রঙের হলে দ্রুত অভিজ্ঞ কাউকে দেখানো উচিত।
কমলা ও হলুদ আগুন এত বিপজ্জনক কেন
একটানা কমলা বা হলুদ শিখার কারণে কার্বন মনোক্সাইড তৈরি হতে পারে। ঠিকঠাক কাজ করা চুলার আশেপাশে ৫ থেকে ১৫ পিপিএম কার্বন মনোক্সাইড থাকে। কিন্তু নষ্ট চুলায় তা ৩০ পিপিএম বা তার বেশি হতে পারে। বর্ণহীন ও গন্ধহীন এই গ্যাস প্রতিবছর শত শত মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয় এবং এক লাখ মানুষকে হাসপাতালে পাঠায়। শিশু, বয়স্ক এবং শ্বাসকষ্টের রোগীদের জন্য এটি সবচেয়ে বিপজ্জনক। কমলা শিখা মানে তোমার গ্যাস ঠিকমতো পুড়ছে না, বরং অপচয় হচ্ছে। ফলে একই পরিমাণ তাপ পেতে তোমার বেশি গ্যাস লাগবে আর মাসের শেষে গ্যাসের বিল দেখে তোমার চোখ কপালে উঠবে।
এখানেই শেষ নয়। নষ্ট চুলা থেকে মিথেন, নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড, বেনজিন এবং অন্যান্য উদ্বায়ী জৈব যৌগ বেশি পরিমাণে বের হয়, যা ঘরের বাতাসকে বিষাক্ত করে তোলে। শিখার রং কমলা হওয়া মানে চুলার তাপ সব জায়গায় সমানভাবে লাগছে না। এতে রান্নার মান খারাপ হতে পারে।
অন্যান্য অদ্ভুত রং দেখলে কী বুঝবে
চুলার আগুন যদি লাল রঙের হয়, তবে বুঝতে হবে গ্যাসের কোয়ালিটিতে ঝামেলা আছে। আর শিখা যদি গোলাপি বা বেগুনি হয়, তার জন্য দায়ী হতে পারে তোমার ঘরের হিউমিডিফায়ার! হিউমিডিফায়ার থেকে বের হওয়া জলীয় বাষ্পে পটাশিয়াম থাকলে এমন বেগুনি শিখা দেখা যায়। এটি বিপজ্জনক না হলেও হিউমিডিফায়ারে ডিস্টিলড ওয়াটার ব্যবহার করলে এই রঙের খেলা বন্ধ হবে।
আগুন ঠিক করতে তোমার করণীয় কী
শুরুতেই সাধারণ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজে হাত দাও। প্রথমেই চুলার সব নব বন্ধ করো এবং বার্নারের ক্যাপ ও হেড খুলে নাও। এরপর বার্নারের ছিদ্রগুলো পরিষ্কার করতে একটা পেপার ক্লিপ ব্যবহার করো। ভুলেও কাঠের টুথপিক ব্যবহার করবে না; কারণ, সেটা ভেঙে ছিদ্রের ভেতর আটকে গিয়ে গ্যাস উল্টোপথে আসার মতো বিপদ ঘটতে পারে।
বার্নারের অংশগুলো ধোয়ার সময় পানিতে ভিজিয়ে রাখবে না বা বেশি ভেজা বা সাবান মাখানো কাপড় ব্যবহার করবে না। কারণ, স্পার্ক সুইচে অতিরিক্ত আর্দ্রতা গেলে অযথাই স্পার্ক হতে পারে। হালকা স্যাঁতসেঁতে কাপড় দিয়ে পরিষ্কার করার পর সব অংশ পুরোপুরি শুকিয়ে তবেই আবার জায়গায় বসাবে। অবশ্যই এসব কাজে বড়দের সাহায্য নাও।
এতকিছুর পরও যদি আগুনের রং হলুদ বা কমলা থাকে, বা গ্যাসের কোনো গন্ধ পাও, তবে চুলা ব্যবহার করা বন্ধ করো। এই অবস্থায় দ্রুত একজন টেকনিশিয়ানকে ডাকা উচিত; কারণ, নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তার চেয়ে জরুরি আর কিছুই নেই!