বাসা চার-পাঁচতলায়, লিফট নেই, সিঁড়ি বেয়ে ওঠায় কী সুবিধা
স্কুল, কলেজ শেষে সারা দিন পর শরীর ক্লান্ত হয়ে পড়ে। তখন বাসায় ফিরে সিঁড়ির সামনে দাঁড়ালে খারাপ লাগা স্বাভাবিক। লিফট না থাকলে চার-পাঁচতলায় উঠতে দম বের হয়ে যায়। তবে প্রতিদিনের এই ওঠানামার একটি ভালো দিক আছে। আপাতদৃষ্টিতে কষ্ট মনে হলেও চার-পাঁচতলা সিঁড়ি বেয়ে ওঠা শরীর সুস্থ রাখার দারুণ উপায়। নিয়মিত সিঁড়ি ব্যবহার করলে শরীরের কী লাভ হয়?
সিঁড়ি নাকি লিফট?
যুক্তরাজ্যের একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় লিফটের বদলে সিঁড়ি ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। নরফোক অ্যান্ড নরউইচ ইউনিভার্সিটি হাসপাতাল ও ইউনিভার্সিটি অব ইস্ট অ্যাংলিয়ার গবেষকেরা ৪ লাখ ৮০ হাজারের বেশি মানুষের তথ্য থেকে একটি গবেষণা করেন। গবেষণায় দেখা গেছে, যাঁরা নিয়মিত সিঁড়ি ব্যবহার করেন, তাঁদের হৃদ্রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেক কম। গবেষণাটি ‘আমেরিকান জার্নাল অব কার্ডিওভাসকুলার ড্রাগস’-এ প্রকাশিত হয়েছে।
যাঁরা নিয়মিত সিঁড়ি বেয়ে ওঠেন, তাঁদের হৃদ্রোগে মারা যাওয়ার ঝুঁকি ৩৯ শতাংশ কম। পাশাপাশি যেকোনো কারণে মৃত্যুর ঝুঁকি ২৪ শতাংশ কমে যায়। এ ছাড়া তাঁদের হার্ট ফেইলিউর, স্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাকের মতো স্বাস্থ্যঝুঁকিও তুলনামূলকভাবে কম থাকে।
গবেষকেরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য পৃথক ৯টি গবেষণার তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করেছেন। এই গবেষণায় ৩৫ থেকে ৮৪ বছর বয়সী ব্যক্তিদের গড় ১৪ বছর ধরে পর্যবেক্ষণ করা হয়। অংশগ্রহণকারীদের ৫৩ শতাংশই ছিলেন নারী। তাঁদের মধ্যে হৃদ্রোগে আক্রান্ত ও হৃদরোগমুক্ত উভয় ধরনের মানুষই ছিলেন।
তবে ঠিক কতবার সিঁড়ি ব্যবহার করা উচিত, তা জানতে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। অবশ্য একটি বড় গবেষণায় দেখা গেছে, দিনে অন্তত ছয়বার সিঁড়ি বেয়ে উঠলে হার্ট ভালো থাকে।
গবেষণার প্রধান লেখক সোফি প্যাডক জানান, যত বেশি সিঁড়ি বেয়ে ওঠা যায়, স্বাস্থ্যের জন্য তা তত বেশি উপকারী। তবে সিঁড়ি ব্যবহারের ছোট ছোট অভ্যাসেও শরীরে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।
ছোট ছোট সিঁড়ি বেয়ে ওঠার বড় উপকার
দিনে ছয়বার সিঁড়ি বেয়ে উঠতে না পারলেও অসুবিধা নেই। লিফটের বদলে সিঁড়ি ব্যবহার করলেই দারুণ কিছু উপকার পাওয়া যায়।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, অল্প সময়ের ব্যায়ামও শরীরের ওপর বেশ ভালো প্রভাব ফেলে। তাই প্রতিদিনের অভ্যাসে অল্প করে সিঁড়ি বেয়ে ওঠা–নামা করা খুব সহজ কাজ।
অল্প সময়ের এই ছোটখাটো ব্যায়ামকে গবেষকেরা বলেন ‘এক্সারসাইজ স্ন্যাকস’। এতে শরীরের শক্তি বাড়ে, হার্ট ভালো থাকে। এমনকি ঘুম আর মানসিক স্বাস্থ্যেরও দারুণ উন্নতি হয়।
তবে এই গবেষণার কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অংশ নেওয়া মানুষেরা কতবার সিঁড়ি ব্যবহার করেছেন, তা নিজেদের স্মৃতি থেকে জানিয়েছিলেন। ফলে তথ্যে কিছু ভুল থাকার সুযোগ থেকেই যায়, তা ছাড়া যাঁরা নিয়মিত সিঁড়ি বেয়ে ওঠা নামা করেন, তাঁরা হয়তো আগে থেকেই স্বাস্থ্যসচেতন। তাই শুধু সিঁড়ি ব্যবহারের কারণেই তাঁদের হার্টের ঝুঁকি কমেছে কি না, তা নিয়ে কিছুটা সন্দেহ থাকে।
গবেষক সোফি প্যাডকের মতে, যাঁরা নিয়মিত সিঁড়ি ব্যবহার করেন, তাঁরা এমনিতে বেশ চটপটে থাকেন। তাই অন্যদের চেয়ে তাঁদের ফিটনেস বেশি হওয়াটাই স্বাভাবিক।
ধীরে ধীরে যেভাবে সিঁড়ি ব্যবহার শুরু করা উচিত
কেউ যদি নিয়মিত সিঁড়ি ব্যবহারে অভ্যস্ত না হন, তবে একতলা উঠেই হাঁপিয়ে যাওয়া খুব স্বাভাবিক। তাই ধীরে ধীরে সিঁড়ি ব্যবহারের সক্ষমতা ও পেশিশক্তি বাড়াতে প্রতিদিন অল্প করে সিঁড়ি ব্যবহার করতে পারেন।
মেয়ো ক্লিনিক স্পোর্টস মেডিসিনের বিশেষজ্ঞ কার্ল এরিকসন জানান, শরীরের ওপর নতুন কাজের চাপ পড়লে শরীর এর সঙ্গে মানিয়ে নেয়। তাই নিয়মিত সিঁড়ি ব্যবহার করলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কাজের ক্ষমতা ও অভ্যাস দুটোই বাড়ে।
শুরুতেই চার-পাঁচতলা ওঠা হয়তো নিরাপদ না–ও হতে পারে। এর বদলে প্রথমে একতলা দিয়ে শুরু করে আস্তে আস্তে অভ্যাস বাড়ানো ভালো। মেট্রোতে চলন্ত সিঁড়ি বা এস্কেলেটর ব্যবহার না করে সাধারণ সিঁড়ি ব্যবহার করা যায়। কিংবা রাস্তা পার হওয়ার সময় ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার।
তবে সিওপিডি (COPD) বা ফুসফুসের জটিল কোনো রোগ থাকলে সিঁড়ি বেয়ে ওঠার শুরু করার আগে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
ইউনিভার্সিটি অব লুইসভিল হেলথের বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ক্যাথরিন পোলগিয়ার্স জানান, সিঁড়ি দিয়ে ওঠার পর বুকে ব্যথা, চোখে ঝাপসা দেখা কিংবা তীব্র মাথাব্যথা হলে সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তারের কাছে যেতে হবে।
সব মিলিয়ে সারা জীবন সক্রিয় থাকা হার্ট ভালো রাখতে এবং হাড় ও পেশি শক্তিশালী করতে দারুণ কাজ করে। চিকিৎসকেরা সারা দিন এক জায়গায় বসে থাকার বদলে চলাফেরা করার পরামর্শ দেন। এ ক্ষেত্রে লিফট বা এস্কেলেটর ছেড়ে সিঁড়ি ব্যবহার করা শারীরিক সক্রিয়তা বাড়ানোর অন্যতম সহজ উপায়।