তুরস্কের উপকূলে পাওয়া গেল জাহাজের প্রাচীনতম ধ্বংসাবশেষ

জাহাজটির খোঁজ মিলেছে তুরস্কের আনতালিয়া উপকূলের কাছে কেকোভা দ্বীপের পাশেছবি: বিবিসি

কল্পনা করো, সমুদ্রের তলদেশে হাজার হাজার বছর ধরে পড়ে আছে একটি জাহাজ। একসময় এ জাহাজে করেই দূরদেশে পণ্য নিয়ে যেত ব্যবসায়ীরা। ঝড়, ঢেউ আর স্রোতের সঙ্গে লড়াই করে চলত তাদের যাত্রা। তারপর কোনো একদিন জাহাজটি ডুবে গেল। হারিয়ে গেল সমুদ্রের অতলে। কেটে গেল হাজার হাজার বছর। অবশেষে সেই জাহাজের খোঁজ মিলল প্রত্নতাত্ত্বিকদের হাতে!

তুরস্কের উপকূলে এমনই একটি জাহাজের ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পেয়েছেন প্রত্নতাত্ত্বিকেরা। তাঁদের ধারণা, এটি এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত বিশ্বের প্রাচীনতম জাহাজের ধ্বংসাবশেষ। প্রায় ৪ হাজার ৪০০ থেকে ৪ হাজার ৭০০ বছর আগে ডুবে গিয়েছিল জাহাজটি। সময়টা ছিল ব্রোঞ্জযুগের শুরুর দিক। তখন মিসরে তৈরি হচ্ছিল বিখ্যাত গ্রেট পিরামিড বা মহাপিরামিড।

সমুদ্রের নিচে মাটির পাত্র

জাহাজটির খোঁজ মিলেছে তুরস্কের আনতালিয়া উপকূলের কাছে কেকোভা দ্বীপের পাশে। সমুদ্রের প্রায় ৩০ মিটার গভীরে ঢালু তলদেশে ছড়িয়ে ছিল জাহাজটির বহন করা নানা জিনিস। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে পাথরের তৈরি তিনটি নোঙর এবং ৩০টির বেশি বড় মাটির পাত্র। প্রাচীনকালে এসব পাত্রে বিভিন্ন পণ্য ভরে জাহাজে করে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নেওয়া হতো। এ ধরনের পাত্রকে বলা হয় অ্যাম্ফোরা।

জাহাজটির কাঠের কোনো অংশ অবশ্য টিকে নেই। এত দীর্ঘ সময় সমুদ্রের পানির নিচে থাকার ফলে কাঠ নষ্ট হয়ে গেছে। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে মাটির পাত্রগুলো রয়ে গেছে। এমনকি কয়েকটি পাত্রের ভেতরে এখনো আঠালো পদার্থের চিহ্ন পাওয়া গেছে। অর্থাৎ হাজার হাজার বছর আগে পাত্রগুলোয় কী রাখা হয়েছিল, তার কিছুটা প্রমাণ এখনো রয়েছে!

ভূমধ্যসাগরীয় প্রত্নতত্ত্ব সমিতির একটি অভিযানের নেতৃত্ব দিয়েছেন তুরস্কের আকদেনিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হাকান ওনিজ। তাঁর ধারণা, জাহাজটি প্রায় ১০ মিটার লম্বা ছিল। পণ্য পরিবহনের জন্য ব্যবহার করা হতো এটি।

ওনিজের ভাষায়, ‘সমুদ্রের তলদেশে এই জাহাজের ধ্বংসাবশেষ যেন একটি টাইম ক্যাপসুল।’ টাইম ক্যাপসুল হলো এমন কিছু, যেখানে অতীতের নানা নিদর্শন ভবিষ্যতের মানুষের জন্য সংরক্ষিত থাকে। এই জাহাজও যেন প্রাচীন মানুষের জীবন ও বাণিজ্যের গল্প জমিয়ে রেখেছে।

আরও পড়ুন

বয়স জানার উপায় কী

প্রাচীন কোনো বস্তু কত বছরের পুরোনো, তা জানার একটি পরিচিত পদ্ধতি হলো কার্বন ডেটিং। জৈব পদার্থে থাকা কার্বনের একটি বিশেষ ধরন বিশ্লেষণ করে এর বয়স অনুমান করা যায়। কিন্তু এই জাহাজের কাঠই যখন আর অবশিষ্ট নেই, তখন সেই পদ্ধতি কাজে লাগানোর সুযোগ ছিল না।

তাই প্রত্নতাত্ত্বিকেরা বয়স নির্ধারণের জন্য মাটির পাত্রগুলোর আকৃতি ও নকশা পরীক্ষা করেন। কারণ, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মাটির পাত্র তৈরির ধরন বদলে যায়। নির্দিষ্ট সময়ের পাত্রে বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। সেসব বৈশিষ্ট্য দেখে পাত্রগুলো কোন যুগের, তা বোঝা সম্ভব।

কেকোভার পাত্রগুলোর দুটি হাতল, মাঝখানে একটি উঁচু রেখা এবং সমতল তলা রয়েছে। এসব বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মিসর ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানে পাওয়া প্রাচীন পাত্রের মিল রয়েছে। সেসব পাত্রের বয়স প্রায় ৪ হাজার ৪০০ থেকে ৪ হাজার ৭০০ বছর বলে জানা গেছে।

পাত্রগুলোর নকশা ও সাজানোর ধরন তুলনা করে অধ্যাপক ওনিজ নিশ্চিত হয়েছেন, জাহাজটি ব্রোঞ্জযুগের শুরুর দিকের। এভাবেই কাঠের কোনো অংশ না পেয়েও পাত্রগুলোর সাহায্যে জাহাজটির বয়স সম্পর্কে ধারণা পেয়েছেন গবেষকেরা।

অস্ট্রেলিয়ার ম্যাককুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ববিদ কারিন সোয়াদা পাত্রগুলো পরীক্ষা করেছেন
ছবি: বিবিসি

পাত্রের ভেতরে কী ছিল

সমুদ্রের নিচ থেকে পাত্রগুলো তুলে আনার পর শুরু হয়েছে সেগুলো সংরক্ষণের কাজ। দীর্ঘদিন পানির নিচে থাকার কারণে এগুলো বেশ নাজুক হয়ে পড়েছে। তাই প্রত্নতাত্ত্বিকেরা খুব সতর্কভাবে পাত্রগুলোর গায়ে জমে থাকা আস্তরণ পরিষ্কার করছেন।

অস্ট্রেলিয়ার ম্যাককুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ববিদ কারিন সোয়াদা পাত্রগুলো পরীক্ষা করেছেন। কয়েকটি পাত্রের ভেতরে আঠালো, চকচকে পদার্থের অবশিষ্টাংশ দেখে তিনি বিস্মিত হন। এত বছর পরও যে এতটা পদার্থ রয়ে যেতে পারে, তা তিনি ভাবতে পারেননি।

কিন্তু পদার্থগুলো আসলে কী? গবেষকেরা এখনো নিশ্চিত নন। এগুলো জলপাইয়ের তেল, মদ কিংবা গাছ থেকে পাওয়া কোনো রজন হতে পারে। রজন হলো গাছ থেকে নিঃসৃত আঠালো পদার্থ।

আরেকটি সম্ভাবনাও আছে। পাত্রগুলো হয়তো একবার ব্যবহার করেই ফেলে দেওয়া হতো না। পণ্য গন্তব্যে পৌঁছানোর পর পাত্র খালি করে আবার ব্যবহার করা হতো। ফলে ভেতরে পাওয়া পদার্থ আগের কোনো পণ্যের অবশিষ্টাংশও হতে পারে। গবেষকেরা পরীক্ষা করে এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করছেন।

আরও পড়ুন
সেসব পাত্রের বয়স প্রায় ৪ হাজার ৪০০ থেকে ৪ হাজার ৭০০ বছর বলে জানা গেছে
ছবি: বিবিসি

কোথা থেকে কোথায় যাচ্ছিল জাহাজটি

এই আবিষ্কার শুধু একটি পুরোনো জাহাজের গল্প নয়, প্রাচীন মানুষের বাণিজ্য সম্পর্কেও নতুন তথ্য দিচ্ছে।

প্রত্নতাত্ত্বিকদের ধারণা, জাহাজটি ভূমধ্যসাগরের পূর্ব উপকূলের কোনো জায়গা থেকে যাত্রা শুরু করেছিল। এরপর পণ্য নিয়ে যাচ্ছিল প্রাচীন নগরী ট্রয় কিংবা গ্রিসের ক্রিট দ্বীপে বসবাসকারী মিনোয়ান জনগোষ্ঠীর কাছে। তবে জাহাজটির প্রকৃত গন্তব্য এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

সে সময় সমুদ্রপথে বাণিজ্য করা মোটেও সহজ ছিল না। কেকোভা দ্বীপের আশপাশে প্রবল স্রোত ও বাতাসের কারণে অনেক জাহাজ ডুবে গেছে। এ অঞ্চলে শত শত জাহাজের ধ্বংসাবশেষ রয়েছে। তাই বহুদিন ধরেই প্রত্নতাত্ত্বিকদের কাছে জায়গাটি গুরুত্বপূর্ণ।

জাহাজের ধ্বংসাবশেষ খুঁজে বের করার পাশাপাশি গবেষকেরা ভাবছেন, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর কথা। কারা জাহাজটি তৈরি করেছিলেন? কারা মাটির পাত্রগুলো বানিয়েছিলেন? কারা সেগুলো কাঁধে করে জাহাজে তুলেছিলেন? আর যেসব নাবিক পণ্য নিয়ে সমুদ্রযাত্রায় বেরিয়েছিলেন, তাঁদের জন্য ঘরে অপেক্ষা করছিলেন কারা?

অধ্যাপক ওনিজের কাছে এই প্রশ্নগুলোও গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, প্রায় পাঁচ হাজার বছর পর এই বস্তুগুলো প্রথমবারের মতো মানুষের স্পর্শ পাচ্ছে। অথচ এগুলো একসময় ছিল মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ।

সমুদ্রের ৩০ মিটার গভীরে কাজ করাও বেশ কঠিন। সেখানে ডুবুরিরা একবারে মাত্র ৩০ মিনিটের মতো অনুসন্ধান করতে পারেন। এরপর তাঁদের নিরাপদে ওপরে উঠে আসতে হয়।

এই আবিষ্কারের আগে বিশ্বের প্রাচীনতম জাহাজের ধ্বংসাবশেষ হিসেবে পরিচিত ছিল গ্রিসের দক্ষিণে ডোকোস দ্বীপের কাছে পাওয়া একটি জাহাজ, যার বয়স প্রায় ৪ হাজার ২০০ বছর। আর কাঠের কিছু অংশ এখনো টিকে আছে, এমন প্রাচীন জাহাজের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে বুলগেরিয়ার উপকূলের কাছে কৃষ্ণসাগরে। সেটির বয়স প্রায় ২ হাজার ৪০০ বছর।

সূত্র: বিবিসি
আরও পড়ুন