মানুষের ভয়ের গন্ধ আছে, প্রাণীরা কীভাবে এই গন্ধ টের পায়
ঘোড়ায় চড়ার শখ তো অনেকেরই থাকে। তো ঘোড়ায় চড়া শেখার শুরুর দিকে অনেকেই ঘোড়াকে ভয় পায়। ঘোড়ার সামনে দাঁড়িয়ে অনেকেই মনে করে, ভয়টা মনে চেপে সাহস করে চেপে বসলেই হলো। ঘোড়া কিছু বুঝবে না। কিন্তু নতুন গবেষণা বলছে, মানুষের ভয় শুধু মুখে বা শরীরে থাকে না, গন্ধেও ছড়ায়। আর এই গন্ধ টের পায় ঘোড়া। এমনকি কেউ যদি একটি ভৌতিক সিনেমা দেখেও ভয় পায়, তার ছাপও থাকে শরীরের গন্ধে। এই গন্ধ পেয়ে ঘোড়া সতর্ক হয়ে যায়, অস্থিরতায় ভোগে, এমনকি ভয়ও পেতে পারে।
ফ্রান্সের ইউনিভার্সিটি অব ট্যুরসের গবেষক ড. লেয়া লঁসাদের নেতৃত্বে করা একাধিক পরীক্ষায় দেখা গেছে, ভয় পাওয়া মানুষের শরীরের গন্ধ পেলে ঘোড়া তুলনামূলকভাবে বেশি চমকে ওঠে। এদের হৃৎস্পন্দন বেড়ে যায়। তখন ঘোড়া সহিস বা মালিকের কাছে কম যেতে চায়। বিপরীতে আনন্দময় দৃশ্য দেখা মানুষের শরীরের গন্ধে ঘোড়া এমন প্রতিক্রিয়া দেখায় না।
আরও গবেষণার মাধ্যমে এই ফলাফল টিকে থাকলে নিশ্চিতভাবে বলা যাবে, মানুষ ও ঘোড়ার মধ্যে ভয় সংক্রামক হতে পারে। মানুষের ঘামের মধ্যে থাকা নানা উদ্বায়ী রাসায়নিক যৌগ ঘোড়ার কাছে একধরনের সতর্কবার্তা। চারপাশে কোনো বিপদ লুকিয়ে থাকলে সেটা ঘোড়া অনুমান করতে পারে।
ড. লঁসাদে বলেন, ‘মানুষ ও প্রাণীর সম্পর্ক কতটা ঘনিষ্ঠ, এই গবেষণা তার প্রমাণ। অনেক সময় আমরা নিজেরাও বুঝতে পারি না, কিন্তু আমাদের আবেগ প্রাণীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।’
গন্ধ হলো যোগাযোগের সবচেয়ে প্রাচীন ও মৌলিক ইন্দ্রিয়গুলোর একটি। তবে এতদিন গবেষণার বেশির ভাগই একই প্রজাতির ভেতর গন্ধের সংকেত আদান-প্রদানের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। যেমন সঙ্গী খোঁজার ক্ষেত্রে গন্ধকে প্রাণিজগতে খুব গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মানুষ ও প্রাণীর মতো ভিন্ন প্রজাতির মধ্যে গন্ধের মাধ্যমে আবেগ আদান-প্রদান তুলনামূলকভাবে খুব কম আলোচিত হয়েছে।
এই বিষয়টি খতিয়ে দেখতে গবেষকেরা মানুষের ঘামের মধ্যে থাকা ভয়-সংক্রান্ত গন্ধে ঘোড়া কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানায় তা পরীক্ষা করে দেখেছেন। পরীক্ষার আগে স্বেচ্ছাসেবীরা নিজের বাহুর নিচে তুলার প্যাড লাগিয়ে বিভিন্ন চলচ্চিত্রের দৃশ্য দেখেন। কেউ দেখেন ভৌতিক সিনেমা ‘সিনিস্টারের’ দৃশ্য, আবার কেউ দেখেন ‘সিংগিন ইন দ্য রেইনের’ মতো আনন্দদায়ক চলচ্চিত্র।
এরপর এই তুলোর প্যাডগুলো ঘোড়ার নাকের খুব কাছে, মুখের অংশে লাগানো হয়, যেন গন্ধ সরাসরি নাসারন্ধ্রে পৌঁছায়। তারপর দেখা হয়, ঘোড়া কতবার নিজের মালিকের কাছে যাচ্ছে বা স্পর্শ করছে। এরপর হঠাৎ খাবার খাওয়ার সময় সামনে একটি ছাতা খুলে দিলে এরা কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে, তা যাচাই করে দেখা হয়।
বৈজ্ঞানিক সাময়িকী ‘পিএলওএস ওয়ান’ জার্নালে প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়েছে, ভয় পাওয়া মানুষের ঘামের গন্ধে ঘোড়া বেশি চমকে ওঠে। তাদের হৃৎস্পন্দন সর্বোচ্চ পরিমাণে বেড়ে যায় এবং তারা সহিসের সঙ্গে কম যোগাযোগ করে। তবে একটি বিষয়ে পার্থক্য দেখা যায়নি, স্ট্রেস হরমোন কর্টিসলের মাত্রায় তেমন কোনো পরিবর্তন ধরা পড়েনি।
গবেষণার প্রধান লেখক ও ফ্রেঞ্চ হর্স অ্যান্ড রাইডিং ইনস্টিটিউটের গবেষক ড. প্লোটিন জারদা বলেন, মানুষ হয়তো নিজের শরীরের গন্ধ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, কিন্তু যারা ঘোড়ায় চড়েন বা ঘোড়ার যত্ন নেন, তাদের নিজেদের মানসিক অবস্থার ব্যাপারে সচেতন থাকা জরুরি। শান্ত ও ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে ঘোড়ার কাছে গেলে সম্পর্ক ভালো হয়। আর কেউ যদি নিজেই ভয়ে থাকে, ঘোড়াও সেই ভয় অনুভব করে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে।
ইতালির ইউনিভার্সিটি অব নেপলস ফেদেরিকো টু-এর অধ্যাপক বিআজিও দ’আনিয়েলো, যিনি আগে দেখিয়েছেন, ঘোড়া ও কুকুর দুটিই মানুষের ভয়ের গন্ধে চিনতে পারে। তিনি বলেন, ‘এই গবেষণা প্রমাণকে আরও সমৃদ্ধ করল। মানুষের আবেগ প্রজাতির সীমানা পেরিয়ে যেতে পারে, এই ধারণা এখন আর কল্পনা নয়।’
সূত্র: লাইভ সায়েন্স