চীন কেন কূটনৈতিক কাজে পান্ডা ব্যবহার করে
পৃথিবীর সবচেয়ে আদুরে প্রাণীদের মধ্যে একটি পান্ডা। এদের তুলতুলে চেহারা আর শান্ত স্বভাবের জন্যই এরা সবার কাছে এত প্রিয়। কিন্তু এই আদুরে ভাল্লুকগুলো শুধু চায়নার পাহাড় বা চিড়িয়াখানায় থাকে এমনটা নয়। বহুবছর ধরে চীন ‘পান্ডা কূটনীতি’ নামক আন্তর্জাতিক কৌশল ব্যবহার করে আসছে। যেখানে চীন এই প্রাণীটিকে বন্ধুত্বের প্রতীক হিসেবে এক দেশ থেকে আরেক দেশে উপহার পাঠায়। কীভাবে এই নিরীহ পান্ডাগুলো বিশ্ব রাজনীতিতে এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল?
প্রাচীনকাল থেকেই চীনের শাসকরা অন্য দেশের শাসকদের কাছে বন্ধুত্বের প্রতীক হিসেবে পান্ডা উপহার দিয়ে আসছেন। কেননা পান্ডা চীনের অন্যতম জাতীয় প্রতীক, যা কেবল চীনের বন্য পরিবেশেই পাওয়া যায়। আধুনিক যুগে পান্ডা কূটনীতি শুরু হয় ১৯৪৯ সাল থেকে। যখন গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠার হয়। তখন থেকে দেশটি আন্তর্জাতিকভাবে নিজেদের ভাবমূর্তি বাড়াতে পান্ডা কূটনীতি ব্যবহার করে আসছে। গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠার পর ১৯৫৭ সালে তৎকালীন চীনা নেতা মাও সেতুং সোভিয়েত ইউনিয়নকে ‘পিং পিং’ নামের একটি পান্ডা দেন। এরপর ১৯৫৯ সাল থেকে ১৯৮০ সালের মধ্যে উত্তর কোরিয়াসহ অন্যান্য সমাজতান্ত্রিক মিত্রদের কাছেও আরও কিছু পান্ডা পাঠায় চীন।
তবে এই কূটনীতি বিশ্বজুড়ে আলোচনায় আসে ১৯৭২ সালে। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের ঐতিহাসিক চীন সফরের পর। বেইজিং যুক্তরাষ্ট্রকে ‘লিং লিং’ এবং ‘হসিং হসিং’ নামে দুটি পান্ডা উপহার দেয়। তখন এই ঘটনাটি চীন-মার্কিন সম্পর্ক স্বাভাবিক করার এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হিসেবে আলোচিত হয়েছিল। এরপর থেকে জাপান, ফ্রান্স, ব্রিটেন, স্পেনসহ অন্যান্য দেশগুলোতেও পান্ডা দেওয়া হয়েছে। পরবর্তীতে যা চীনের পররাষ্ট্রনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই প্রথাটি আরও কৌশলগত হয়ে উঠেছে। ১৯৮৪ সাল থেকে পান্ডাদের সংখ্যা কমে যাওয়ার কারণে চীন পান্ডা উপহার দেওয়া বন্ধ করে দেয়। এর পরিবর্তে কোনো দেশকে পান্ডা পুরাপুরি দিয়ে দেয় না চীন। এরপর থেকে বিদেশি চিড়িয়াখানাগুলোকে পান্ডা ধার দেওয়া শুরু হয়। এই চুক্তির অধীনে সাধারণত এক জোড়া পান্ডাকে প্রায় ১০ বছরের জন্য দেওয়া হয়। এই চুক্তির আওতায় যে দেশে পান্ডা পাঠানো হয়, সেই দেশকে চীনকে মোটা অঙ্কের টাকাও দিতে হয়। সাধারণত একটি পান্ডার জন্য প্রতি বছরে প্রায় ১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার দিতে হয়। এই অর্থ সরাসরি চীনের পান্ডা সংরক্ষণ এবং প্রজনন কর্মসূচিতে ব্যবহৃত হয় বলে চীন দাবি করে।
চিড়িয়াখানার জন্য পান্ডা পালন করা খুবই ব্যয়বহুল। তবুও দর্শনার্থীদের কাছে এদের আকর্ষণ এত বেশি হওয়াই চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ পান্ডা রাখে। চুক্তির সময়সীমা শেষ হওয়ার পর পান্ডাগুলোকে সাধারণত চীনের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে ফিরিয়ে আনা হয়। বিদেশে জন্ম নেওয়া পান্ডা শাবকগুলোর মালিকানাও চীনেরই থাকে। বড় হওয়ার পর এদেরকেও চীনে ফেরত পাঠানো হয়।
পান্ডা কূটনীতি শুধু বন্ধুত্বের প্রতীক এমনটা নয়। বরং এটি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটি সূক্ষ্ম মাপকাঠি হিসেবে ব্যবহার করে চীন। তাদের ব্যবসায়িক অংশীদারদের পুরস্কৃত করতে বা রাজনৈতিক অসন্তোষ প্রকাশ করতে এই কৌশল ব্যবহার করে থাকে। যেমন, কোনো দেশের সঙ্গে বড় ধরনের বাণিজ্যিক চুক্তি হলে চীন সেখানে পান্ডা পাঠায়। যা একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে ধরা হয়। আবার, রাজনৈতিক মতবিরোধ দেখা দিলে তারা সেই দেশ থেকে পান্ডাদের ফিরিয়ে নেয়।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৩ সালের একটি জার্নালেও এই বিষয় উঠে এসেছে। সেখানে বলা হয় যখন কানাডা, ফ্রান্স এবং অস্ট্রেলিয়াকে পান্ডা পাঠিয়েছিল তখন সেই দেশগুলোর সঙ্গে চীনের ইউরেনিয়াম ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। একইভাবে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া এবং থাইল্যান্ডের মতো দেশগুলোর সঙ্গেও পান্ডা চুক্তিগুলো মুক্ত-বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। আবার ২০১০ সালে, তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা যখন দালাই লামার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন, তখন চীন প্রতিবাদ স্বরূপ যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া তাই শান এবং মেই ল্যান নামের দুটি পান্ডাকে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। কেননা চীন তিব্বত দখল করার পর থেকে তিব্বতের বৌদ্ধধর্মের প্রধান ধর্ম গুরু দালাই লামাকে চীন সরকার একজন বিপজ্জনক বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে দেখে।
যুক্তরাষ্ট্র-চীনের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অবনতির কারণে একটি পান্ডাকে ২০২৩ সালের চীনে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। ২০ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে ছিল সেই ইয়া ইয়া নামের পান্ডাটা। আগে পান্ডা ছিল বিপন্ন প্রাণীদের তালিকায়। সেখান থেকে চীন সরকারের সফল সংরক্ষণ কর্মসূচির কারণে পান্ডাদের অবস্থা এখন ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়ে এসেছে। ১৯৮০-এর দশকে বন্য অঞ্চলে পান্ডাদের সংখ্যা ছিল প্রায় ১ হাজার ১০০টি। ২০২৩ সালে যা বেড়ে ১ হাজার ৯০০ এ দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে চিড়িয়াখানা এবং প্রজনন কেন্দ্রগুলোতে মোট ৭২৮টি পান্ডা রয়েছে।
সূত্র: রয়টার্স, বিবিসি