গাড়ির ছাদের শার্ক ফিনের আসল কাজ কী

গাড়ির ছাদের শার্ক ফিন

গাড়ির ছাদে হাঙরের পাখনার মতো দেখতে ছোট্ট একটা জিনিস থাকে। দেখতে আকর্ষণীয় লাগলেও, এটি কিন্তু শুধু গাড়ি সুন্দর করার জন্য বসিয়ে রাখা হয়নি। রাস্তাঘাটে চলাচলের সময় আমাদের চোখে পড়লেও, সাধারণত এটা আসলে কী কাজ করে, তা নিয়ে কেউই খুব একটা মাথা ঘামাই না। গাড়ির পেছনের এই অংশটিকে অটোমোবাইল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ভাষায় বলা হয় শার্ক ফিন অ্যানটেনা (Shark Fin Antenna)। চলো তাহলে জেনে নেওয়া যাক এর কাজ কী।

গাড়ির ছাদে হাঙরের পাখনার কাজ কী?

গাড়ির ছাদে হাঙরের পাখনার মতো দেখতে এই জিনিসটিকে বলা হয় ‘শার্ক ফিন অ্যানটেনা’। আগেকার দিনে গাড়ির সামনে বা পেছনে যে লম্বা লোহার অ্যানটেনাগুলো দেখা যেত। এটি মূলত সেগুলোরই একটি আধুনিক রূপ। আগের দিনের লম্বা অ্যানটেনাগুলো দিয়ে শুধু এএম বা এফএম রেডিও শোনা যেত। কিন্তু বর্তমানের এই শার্ক ফিনের ভেতরে স্যাটেলাইট রেডিও, জিপিএস বা ম্যাপ নেভিগেশন, ব্লুটুথ এবং এমনকি গাড়ির নিজস্ব ওয়াই-ফাই নেটওয়ার্কের মতো অনেকগুলো অত্যাধুনিক প্রযুক্তি একসঙ্গে আছে।

গাড়ির একেবারে ওপরের ছাদে বসানোর কারণে এ অ্যানটেনাটি খুব সহজেই সরাসরি আকাশের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতে পারে, যা স্যাটেলাইট থেকে নিখুঁত সংকেত বা সিগন্যাল পাওয়ার জন্য অত্যন্ত জরুরি। হয়তো অনেকেই খেয়াল করেছ, গাড়ি যখন কোনো বড় ওভারপাস বা ফ্লাইওভারের নিচ দিয়ে যায়, তখন স্যাটেলাইট রেডিওর সংযোগ হঠাৎ কেটে যায়। এর কারণ হলো, ফ্লাইওভারের নিচে চলে যাওয়ায় শার্ক ফিন অ্যানটেনাটি সাময়িকভাবে আকাশকে আর দেখতে পায় না, ফলে সিগন্যাল সাময়িক বন্ধ হয়ে যায়।

আরও পড়ুন

শার্ক ফিনের আকৃতি হাঙরের পাখনার মতো কেন

গাড়ির ছাদের এই ছোট পাখনাটি দেখতে যেমন মসৃণ, তেমনি দারুণ আকর্ষণীয়। তবে এই বিশেষ আকৃতিটি কিন্তু শুধু গাড়িকে স্টাইলিশ দেখানোর জন্য তৈরি করা হয়নি। এর পেছনে রয়েছে বিজ্ঞানের অ্যারোডায়নামিকসের কারসাজি।

অটোমোটিভ বিশেষজ্ঞরা জানান, গাড়ি নির্মাতারা সব সময় চান গাড়ির বাইরের নকশা যেন যতটা সম্ভব সুবিন্যস্ত বা মসৃণ হয়। কারণ, গাড়ির বডি যদি বাতাসকে সহজে কেটে এগিয়ে যেতে না পারে, তবে বাতাসে একধরনের বাধার সৃষ্টি হয়। যাকে বলা হয় ‘ড্র্যাগ’। এই বাধা যত বেশি হবে, গাড়িকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য ইঞ্জিনকে তত বেশি খাটতে হবে। আর গাড়িও তত বেশি জ্বালানি বা তেল পোড়াবে।

শার্ক ফিনের এই বাঁকানো এবং নিচু আকৃতিটি বাতাসকে গাড়ির ওপর দিয়ে খুব সহজে ও মসৃণভাবে বয়ে যেতে সাহায্য করে। ফলে গাড়ির পেছনে বাতাসের কোনো টার্বুলেন্স তৈরি হয় না। এটা না হলে গাড়ির মাইলেজ কমিয়ে দিতে পারত। আগের দিনের লম্বা ও সোজা ধাতব অ্যানটেনাগুলো পতাকাদণ্ডের মতো দাঁড়িয়ে থেকে বাতাসকে কেটে যেত, যা গাড়ির গতিতে বাধা তৈরি করত। হাইওয়েতে যখন গাড়ি খুব দ্রুতগতিতে চলে, তখন এই ছোট্ট নকশাটিই ইঞ্জিনের ওপর চাপ কমিয়ে গাড়ির জ্বালানি সাশ্রয় করতে ভূমিকা রাখে।

আরও পড়ুন
গাড়ির ছাদে হাঙরের পাখনার মতো দেখতে এই জিনিসটিকে বলা হয় ‘শার্ক ফিন অ্যানটেনা’

শার্ক ফিনের ভেতরে আসলে কী থাকে

গাড়ির ব্র্যান্ড ও মডেলের ওপর নির্ভর করে এই শার্ক ফিনের ভেতরে নানা ধরনের আধুনিক ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি থাকে। কিছু ফিনের ভেতরে জিপিএস ট্র্যাকিং, স্যাটেলাইট রেডিও, এমনকি গাড়ির উন্নত ড্রাইভার সহায়তা সিস্টেমের (এডিএএস) মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিও বসানো থাকে। সহজ কথায়, আমরা বাইরে থেকে যে পাখনাটি দেখি তা আসলে একটি প্লাস্টিকের ঢাকনা। আর এর ভেতরে আসল কী কী প্রযুক্তি থাকবে, তা একেক গাড়ি নির্মাতা কোম্পানি একেকভাবে নির্ধারণ করে।

মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, দামি গাড়ির শার্ক ফিন কি তবে সাধারণ গাড়ির চেয়ে বেশি ভালো সিগন্যাল দেয়? উত্তর হলো, একদমই তা নয়। বাইরের ডিজাইনটি কেবল একটি সুরক্ষার দেয়াল মাত্র। আসল কাজের কাজ করে এর ভেতরের মূল প্রযুক্তিটি, যা গাড়ির নিজস্ব সফটওয়্যার ও যোগাযোগব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে কাজ করে। এই কারণেই একটি বিএমডব্লিউ ও একটি টয়োটা দুটি গাড়ির ছাদেই দেখতে একই রকম শার্ক ফিন থাকলেও, সেগুলোর ভেতরের কাজ করার ক্ষমতা ও প্রযুক্তির মান সম্পূর্ণ আলাদা।

আরও পড়ুন
এরপর ১৯৭০-এর দশকে গাড়ি নির্মাতারা গাড়িকে আরও সুন্দর দেখাতে উইন্ডশিল্ড বা সামনের কাচের সঙ্গে অ্যানটেনা জুড়ে দিতে শুরু করে

গাড়িতে এই পাখনার ব্যবহার শুরু হলো কবে থেকে

গাড়ির অ্যানটেনার ইতিহাস কিন্তু বেশ লম্বা এবং পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে। ১৯৩০ সালের দিকে গাড়ির অ্যানটেনা আলাদা কোনো অংশ ছিল না। বরং তা সরাসরি রেডিওর ভেতরেই বসানো থাকত। ১৯৪০ সালে প্রথম বাজারে আসে লম্বা লোহার দণ্ড বা ‘হুইপ অ্যানটেনা’। রেডিওর এএম/এফএম সিগন্যাল ঠিকমতো পাওয়ার জন্য এগুলোকে হাত দিয়ে টেনে লম্বা করতে হতো।

এরপর ১৯৭০-এর দশকে গাড়ি নির্মাতারা গাড়িকে আরও সুন্দর দেখাতে উইন্ডশিল্ড বা সামনের কাচের সঙ্গে অ্যানটেনা জুড়ে দিতে শুরু করে। তবে এগুলো কোনো কারণে ভেঙে গেলে তা বদলে নেওয়া ছিল বেশ ব্যয়বহুল। ১৯৯০ ও ২০০০ সালে বিএমডব্লিউ বা মার্সিডিজের মতো দামি ও বিলাসবহুল গাড়িগুলোতে প্রথম এই শার্ক ফিন অ্যানটেনার ব্যবহার শুরু হয়, যা পরে সব সাধারণ গাড়িতেও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

শার্ক ফিনও কি সামনে বদলে যাবে

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি যেভাবে প্রতিনিয়ত পাল্টাচ্ছে, তাতে এই শার্ক ফিন হয়তো আর বেশি দিন গাড়ির ছাদে থাকবে না। প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে গাড়ি তৈরির পদ্ধতিতেও প্রতিনিয়ত নতুন ছোঁয়া লাগছে। ভবিষ্যতে গাড়ির প্রযুক্তিতে ঠিক কী আসতে চলেছে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা কঠিন। একসময় পেছনের জানালার অ্যানটেনার ব্যবহার ছিল, যা আজ বদলে শার্ক ফিনে রূপ নিয়েছে। পরের পরিবর্তনটি এমন হতে পারে, যেখানে এটা থাকবে না। যেমনটা করেছেন ইলন মাস্কের টেসলা গাড়ি। এখনকার টেসলাতে শার্ক ফিন অ্যানটেনা সিস্টেমটি গাড়ির বডির মধ্যে থাকে, যা বাইরে থেকে দেখা যায় না।

সূত্র: রিডার্স ডাইজেস্ট

আরও পড়ুন